Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস আজ

মানব পাচারের ফাঁদে যৌন নির্যাতন ও শ্রমদাসত্ব

Advertisement

Icon

আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মানব পাচারের ফাঁদে যৌন নির্যাতন ও শ্রমদাসত্ব

Advertisement

বিদেশে গিয়ে ভাগ্যবদলের স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। সেই স্বপ্ন পূরণে কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ করে জোগাড় করেন লাখ লাখ টাকা। কিন্তু দালালদের প্রলোভনে বিদেশে গিয়ে অনেকের জীবনই পরিণত হয় দুঃস্বপ্নে। কাজের পরিবর্তে অমানবিক শ্রম, নির্যাতন, এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরছেন অনেকে। বিশ্ব মানব পাচার প্রতিরোধ দিবস আজ। দিবসটি সামনে রেখে উঠে এসেছে এমন অসংখ্য হৃদয়বিদারক বাস্তবতা। কেউ নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকেই হতাশা, সমাজিক অবহেলা ও আইনি জটিলতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

স্বপ্নভঙ্গের করুণ গল্প : খুলনার শিরোমনি এলাকার সোহেলী বেগম (ছদ্মনাম) দালালদের মাধমে ২৮ বছর বয়সে কারখানায় কাজের আশায় লিবিয়ায় যান। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাকে গৃহকর্মীর কাজে বাধ্য করা হয়। বাড়ির মালিকদের মারধর, না খেয়ে থাকা এবং প্রতিবাদের জেরে স্থানীয় দালালদের হাতে আটকে পড়েন তিনি। পরে তাকে বিক্রির জন্য নিলামে তোলা হলেও বিক্রি না হওয়ায় মাসের পর মাস একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। অন্য একজনের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কূটনৈতিক উদ্যোগে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

একই ধরনের অভিজ্ঞতা দৌলতপুরের আবু সালেহের। ২৫ বছর বয়সে দালাল ধরে জাহাজে কাজের আশ্বাসে দুবাইয়ের শারজাহ বন্দরে গেলেও সেখানে তাকে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৪৭ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে আটকে রাখা হয়। পরে গোয়েন্দা অভিযানের সময় মরুভূমিতে ভেড়া দেখাশোনার কাজে পাঠানো হয়। প্রায় তিন মাস খাবার পানি ছাড়া থাকার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে সরকারি উদ্যোগে দেশে ফিরলেও দালালরা আবার ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে তার পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে পালিয়ে যায়।

প্রতারণার শিকার হাজারো মানুষ : হাজারো মানুষ বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। হারিয়েছেন জীবনের সঞ্চয়, মূল্যবান সময় ও আত্মসম্মান। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে যাওয়া, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুতি এবং সামাজিক বৈষম্য মানব পাচারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্টেও অভ্যন্তরীণ শ্রম শোষণ, জোরপূর্বক নিয়োগ, যৌন হয়রানি ও শিশুশ্রম বৃদ্ধির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

নির্যাতন বেশি তিন দেশে : উইনরক ইন্টারন্যাশনাল, রূপান্তর ও কারিতাস সুইজারল্যান্ডের অর্থায়নে ‘আশ্বাস ফেজ-২’ প্রকল্পের আওতায় বিদেশফেরত ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে কাজ করছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার শিকার ৭০ শতাংশ মানুষ সৌদি আরব, ভারত ও জর্ডানে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে ৩৯, ভারতে ১৭ এবং জর্ডানে ১২ শতাংশ। বাকি ৩০ শতাংশ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাদের তথ্যে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ মানুষকে গৃহশ্রমে, ৮৩ শতাংশকে বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হয়েছে এবং ৩৭ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অনেকেই একাধিক ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন।

জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গড়ে ১০ শতাংশ মানুষ বিদেশে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রতারণার ২২২টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি এ দপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, বিদেশগমনেচ্ছুদের তথ্য সংরক্ষণে সরকার ‘ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম’ চালু করেছে। এতে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সহজ হবে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পাচারের নিরাপদ রুট : খুলনা ও সাতক্ষীরা সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এ অঞ্চলে মানব পাচারের ঝুঁকি বেশি। সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা, জলবায়ুর প্রভাব, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জীবিকার সংকট মানুষকে পাচারচক্রের ফাঁদে ফেলছে।

সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ সেলের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন কৈখালী, ভোমরা, লক্ষ্মীদাঁড়ি, কলারোয়ার বৈকারী ও কাকডাঙ্গা, যশোরের বেনাপোল, পুটখালী, গাতীপাড়া, সাদিপুর, দৌলতপুর, রুদ্রপুর এবং শার্শার শিকারপুর, গোগা, অগ্রভুলোট, পাঁচভুলোটসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা পাচারকারীদের সক্রিয় রুট। ঝিনাইদহের মহেশপুরের বাঘাডাঙ্গা, হুদাপাড়া, পলিয়ানপুর ও খোসালপুর সীমান্তঘেঁষা এ গ্রামগুলো দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে লোক পারাপার করা হয়।

খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত হওয়ায় পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিও পাচার প্রতিরোধে কাজ করছে। ফলে আগের তুলনায় পাচার অনেকটাই কমেছে।

মামলার জটিলতায় বিচার থেকে বঞ্চিত : বিদেশ থেকে ফিরে আসা অধিকাংশ ভুক্তভোগী আইনি লড়াইয়ে যেতে চান না। কয়রার রহিমা খাতুন (ছদ্মনাম) ২০১৮ সালে প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরে মামলা করলেও এখনো বিচার পাননি।

তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৯ শতাংশ ভুক্তভোগী বিচার থেকে বঞ্চিত হন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রভাবশালী আসামিদের চাপ, দীর্ঘসূত্রতা ও আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসার কারণে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায়। খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় মানবপাচার আইনে ৮৪১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৩৬টি। শুধু খুলনায় মামলার সংখ্যা ১২০।

উইনরক ইন্টারন্যাশনাল ৭৯০ জন প্রতারণার শিকার ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে মাত্র ৬০ জন আইনি সহায়তা নিয়েছেন এবং ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করেছেন মাত্র পাঁচজন। সংস্থাটির রিজিওনাল কো-অর্ডিনেটর এসকে মাসুদুল হাসান বলেন, বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, দেশে ফেরার পর বেশির ভাগ মানুষ নতুন করে ঝামেলায় জড়াতে চান না।

মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, মানব পাচার মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষার অভাব এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে অধিকাংশ অপরাধী শাস্তি এড়িয়ে যাচ্ছে। তার মতে, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি দালালচক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশফেরত ভুক্তভোগীদের আইনি ও আর্থিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করলে দারিদ্র্য ও বেকারত্বকে পুঁজি করে এ অপরাধচক্র আরও বিস্তৃত হবে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম