Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

রোগীর চাপে হিমশিম চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল

চিকিৎসার আশায় ফুটপাতে রাত

জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চিকিৎসার আশায় ফুটপাতে রাত

সোমবার রাত ২টা। রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনের ফুটপাতে বিছানা পেতে শুয়ে আছেন কিছু মানুষ। বৃষ্টি, মশা আর খোলা আকাশই তাদের সঙ্গী। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব রোগী ও স্বজনদের লক্ষ্য একটাই, ভোরে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করে চিকিৎসকের দেখা পাওয়া। হাসপাতালের বহির্বিভাগের গেট খোলে সকাল ৮টায়। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ভিড়, হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা। স্বল্পমূল্যের বিশেষায়িত চিকিৎসার আশায় প্রতিদিন এখানে ছুটে আসেন হাজারো মানুষ; কিন্তু রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, শয্যা ও জনবল কম থাকায় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

ফুটপাতে এক রোগীর স্বজন মালেকা বেগম যুগান্তরকে বলেন, গরিব মানুষ। চিকিৎসার টাকা নেই। কয়েকদিন ধরে কষ্ট করে ইনজেকশন নিয়েছি। আজ রাতে এসে কোথাও থাকার জায়গা পাইনি। সকালে রিপোর্ট নিয়ে ১২টার আগে ফাইল জমা দিতে না পারলে ডাক্তার দেখাতে পারব না। হাসপাতালের ভেতরে থাকতে দেয় না, তাই বাইরে রাত কাটাচ্ছি।

এদিকে মঙ্গলবার মধ্যরাতে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। তিনি বলেন, রোগীরা এভাবে কষ্ট পাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। দুর্ভোগ লাঘবে ই-টিকিটিং, অপেক্ষাগার সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ভোগান্তি কমানোর চেষ্টা করা হবে।

প্রতিদিন বহির্বিভাগে রোগী ৩-৪ হাজার : বুধবার দুপুরে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, টিকিট বিতরণ শেষ হলেও বিভিন্ন চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দীর্ঘ সারি। অনেক রোগী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৩ থেকে ৪ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় ১৮৩ জন চিকিৎসক কর্মরত। নার্সের অনুমোদিত পদ ২৫১টি হলেও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় ২১০ জন।

আশুলিয়া থেকে আসা নিতাই চন্দ্র যুগান্তরকে জানান, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নেওয়ার পর চিকিৎসকের কক্ষের সামনে আরও প্রায় ৪০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে। তৃতীয় তলায় অপারেশন থিয়েটারের সামনে অপেক্ষমাণ নাজিয়া আক্তার বলেন, ডায়াবেটিসজনিত চোখের জটিলতায় আক্রান্ত তার ভাইয়ের অপারেশনের জন্য সিরিয়াল পেতে চার মাস ধরে অপেক্ষা করতে হয়েছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৬৮০ জন। ওই বছর বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন ৬ লাখ ৭২ হাজার ৯২ জন এবং অস্ত্রোপচার হয় ২৪ হাজার ৪২৩টি। ২০২৫ সালে নানা কারণে কয়েক দফা সেবা ব্যাহত হওয়ায় বহির্বিভাগের রোগী কিছুটা কমে ৬ লাখ ৫৪ হাজার ৮১০ জনে দাঁড়ায়। তবে অস্ত্রোপচার বেড়ে হয় ২৭ হাজার ৮৬৩টি। শয্যা ব্যবহারের হার ছিল প্রায় শতভাগ।

অপেক্ষায় ১০ লাখ ছানি রোগী : চক্ষু বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানি অপারেশনের অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রতি ৮৩৩ জন অপেক্ষমাণ রোগীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন দক্ষ সার্জন। দেশে প্রায় ২ হাজার ২০০ জন চক্ষু বিশেষজ্ঞ থাকলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজন এর প্রায় চারগুণ। এছাড়া প্রায় ৪০ হাজার অন্ধ শিশুর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার শিশুর চিকিৎসাযোগ্য ছানি থাকলেও তারা এখনো অস্ত্রোপচারের সুযোগ পায়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন সার্জনের ওপর প্রায় এক হাজার রোগীর দায়িত্ব থাকলে অপেক্ষমাণ রোগীর চাপ কমানো সম্ভব নয়।

কেন বাড়ছে রোগীর ভিড় : হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক যুগান্তরকে বলেন, চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ এখানে ব্যয়বহুল চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। চোখের রেটিনার লেজার চিকিৎসা, ব্যয়বহুল ইনজেকশনসহ অনেক সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। বাইরে যেখানে একটি রেটিনা লেজার অপারেশনে প্রায় এক লাখ টাকা এবং প্রতিটি ইনজেকশনে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে সরকারি হাসপাতালে মাত্র ১০ টাকার টিকিটে এসব চিকিৎসা পাওয়া যায়।

সমাধান দেখছেন পরিচালক : জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. এএসএম ক্বাদির যুগান্তরকে বলেন, অনেক রোগীর সাধারণ চোখের সমস্যার চিকিৎসা জেলা ও উপজেলা পর্যায়েই সম্ভব। দেশে ২০০টি কমিউনিটি ভিশন সেন্টার ও ১৩টি বেজ সেন্টার থাকলেও কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা না থাকায় এসব রোগীও জাতীয় হাসপাতালে চলে আসছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী বাছাই করে কেবল জটিল রোগীদের জাতীয় হাসপাতালে পাঠানো গেলে বর্তমান চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। তিনি আরও বলেন, হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রকল্প চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে শুধু শয্যা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন অপেক্ষাকক্ষ সম্প্রসারণ, চিকিৎসক-নার্সসহ জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কার্যকর রোগী ব্যবস্থাপনা।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .