‘বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলছে’
Advertisement
কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। চীনের গত চার দশকের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার রয়েছে। সোমবার রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে ‘কম্পিটেটিভ গভার্ন্যান্স ফোরাম-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বিআইআইএসএস এবং চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স (এসআইআরপিএ) যৌথভাবে চার
দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ফোরামের আয়োজন করে।
হুমায়ুন কবির বলেন, তুলনামূলক শাসনব্যবস্থা মানে কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করা নয়; বরং নিজস্ব বাস্তবতা ও জাতীয় প্রয়োজনের আলোকে অন্য দেশের সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। গত চার দশকে চীন বিশ্বের অন্যতম সফল উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছে। দেশটি প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে, ব্যাপক বাজার সংস্কার করেছে এবং বৈদ্যুতিক যান, সৌরশক্তি, উন্নত উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব সাফল্য গভীরভাবে অধ্যয়ন এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের।
উপদেষ্টা বলেন, আগামী দিনে দুই দেশের মধ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা নিয়ে আলোচনা, উৎপাদন খাতে সহযোগিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থানান্তর এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এখন একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি ঘোষিত ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সুশাসনের মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। বিআইআইএসএস ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ও নীতিগত সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসাবে উল্লেখ করেন।
একই আয়োজনে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবেই বদলাক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার থেকে চীন সরে আসবে না। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, চীন সব সময় বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসাবে পাশে থাকবে। ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গঠনের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক বিদ্যমান সহযোগিতার কাঠামো অতিক্রম করে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় পৌঁছেছে। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর ছিল দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। ওই সফরে দুই দেশের নেতা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে আরও উন্নীত করার পাশাপাশি ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গঠনের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনের অভিজ্ঞতা বিনিময় জোরদারে সম্মত হন।
ইয়াও ওয়েন বলেন, এই নতুন অধ্যায় আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের স্বর্ণালি ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করেছে। দুই দেশ উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় আরও জোরদারে একমত হয়েছে। তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর ও বাস্তবমুখী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। তবে রাজনৈতিক ঐক্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, একক শিল্পনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং আরও অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিবেশ সৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পাঠ্যসূচি সাজানো হয়েছে। এতে চীনের জাতীয় শাসনব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চীনা রাষ্ট্রদূত জানান, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ হিসাবে অংশগ্রহণকারীরা পদ্মা সেতু ও দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার পরিদর্শন করবেন, যাতে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার বাস্তব ফলাফল সরেজমিনে দেখতে পারেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা, শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ থাকবে।
বক্তব্যের শেষে ইয়াও ওয়েন বলেন, এই ফোরামে শিক্ষাবিদ, গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অংশ নিয়েছেন। তাদের পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতাকে আরও গভীর করবে এবং দুই দেশের জনগণের জন্য আনও সুফল বয়ে আনবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
