Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সাংগঠনিক সভা

চট্টগ্রামে দলের হাইব্রিডরা এগিয়ে, বঞ্চিত ত্যাগীরা

২৩ বার জেল খাটা যুবদল নেতা মোশাররফও অসহায়ের মতো বসে ছিলেন * পদ-পদবিবিহীন ফ্যাসিস্টের সহযোগীরাও কার্ড ঝুলিয়ে ঢুকেছেন বীরদর্পে * সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড়

Advertisement

Icon

আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামে দলের হাইব্রিডরা এগিয়ে, বঞ্চিত ত্যাগীরা

Advertisement

চট্টগ্রামে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সাংগঠনিক সভায় ডেলিগেট কার্ড বিতরণে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। কার্ডপ্রাপ্তিতে পিছিয়ে পড়েছেন দলের ত্যাগী নেতারা, এগিয়ে ছিলেন হাইব্রিডরা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোরগোল শুরু হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, বিএনপির হাইব্রিড নেতা কিংবা পদবিহীন লোকজন হাতিয়ে নিয়েছেন এই বিশেষ কার্ড। এমপির আত্মীয়স্বজন, এমনকি সন্তানরাও বাগিয়ে নিয়েছেন এই কার্ড। এ নিয়ে তৃণমূলে বিরাজ করছে ক্ষোভ আর হতাশা। অভিযোগ রয়েছে, যারা কোনো গ্রুপ ‘মেনটেইন’ করেননি, তাদের অনেককে কার্ড দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ছবি ছিল-এরকম হাইব্রিড বিএনপি নেতার ছবি পোস্ট করেও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ত্যাগীদের অনেকে। বলেছেন, ৫ আগস্টের পর বিএনপির অনেক নেতা আওয়ামী লীগের ব্যবসায় অংশীদার হয়েছেন। তাদের ব্যবসার পাহারার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই সুবাদে ফ্যাসিস্টের অনেকেও ডেলিগেট কার্ড গলায় ঝুলিয়ে বীরদর্পে ঢুকে পড়েছেন সাংগঠনিক সভায়। ৮৬ মামলার আসামি এবং ২৩ বার জেল খাটা নেতা ডাক না পেয়ে অসহায়ের মতো বসেছিলেন ভেন্যুর সামনে। এদিকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ডেলিগেট কার্ড নিয়ে সভায় উপস্থিত থাকায় চার ছাত্রদল নেতার পদ স্থগিত করেছে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদল।

বিএনপির চেয়ারম্যান রোববার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর একটি হোটেলে সাংগঠনিক সভায় অংশ নেন। এতে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা এবং অঙ্গসংগঠনের ৬শর মতো নেতা অংশ নেন। অনেক ত্যাগী নেতা ডেলিগেট কার্ড না পেয়ে হোটেলটির বাইরে বিক্ষোভ করেন। এই ৬শ নেতার নামে ডেলিগেট কার্ড ইস্যু করতে গিয়েই জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে।

জাবেদ আবছার চৌধুরী নামে একজন কার্ড পেয়েছেন, বিএনপিতে যার কোনো পদ-পদবি নেই। তিনি চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল পরিচালনা কমিটিতে ছিলেন। আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীসহ অনেকের সঙ্গেই তার ছিল দহরম-মহরম। কার্ড ঝুলিয়ে তিনি তারেক রহমানের সাংগঠনিক সভায় বীরদর্পে ঘুরেছেন। তাকে কে কার্ড দিল, তার বিচার দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট দেন ক্ষুব্ধ অনেকেই। আবুল মনসুর নামে বিএনপির পদ-পদবিহীন এক ব্যক্তিকে নিয়েও ছবি পোস্ট দেওয়া হয়। ষোলশহর এলাকার বাসিন্দা এই নেতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তার গলায়ও উঠেছে ডেলিগেট কার্ড। নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় অভিযুক্ত নুরুল আজমি রনির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল এমন এক যুবকের গলায়ও উঠেছে এই কার্ড। যার ছবি ঘুরছে ফেসবুকে। এভাবে পদবিহীন অনেকের হাতেই বিএনপির সুবিধাভোগী নেতারা কার্ড তুলে দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্মসম্পাদক মোশাররফ হোসাইন। বিগত ১৭ বছরে আন্দোলন করতে গিয়ে আসামি হয়েছেন ৮৬টি মামলার। জেলে গিয়েছেন ২৩ বার। তিনিও হোটেলের সামনে অসহায়ের মতো বসে ছিলেন। অপলকদৃষ্টিতে দেখছিলেন তার সামনে দিয়ে দলের চেয়ারম্যানের সাংগঠনিক সভায় ঢুকে যাচ্ছেন নাম না-জানা অনেক হাইব্রিড নেতা। মোশাররফ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমার কাছে এটা আশ্চর্য মনে হয়েছে। যে ক্রাইটেরিয়ায় কার্ড দেওয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী আমার কার্ড পাওয়ার কথা। কেন কার্ড পেলাম না, তা নিয়ে আমি যতটা না আশ্চর্য হয়েছি; তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য হয়েছেন দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা। দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা আমাকে এভাবে দেখার পর সন্ধ্যার দিকে একটি ব্ল্যাংক কার্ড পাঠিয়েছিলেন। সেটি শেষ পর্যন্ত আন্দোলনে এক চোখ হারানো কর্মী জুয়েলকে দিয়ে দিয়েছি।’ কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য এবং পাঁচলাইশ থানা যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব শেখ রাসেলও পাননি ডেলিগেট কার্ড। আন্দোলন-সংগ্রামে গিয়ে তিনি শিকার হয়েছেন জেল-জুলুমের। তার মামলার সংখ্যা ৫০টি। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘দুঃসময়ে আমাদের দরকার ছিল। এখন মনে হচ্ছে সুসময়ে আমাদের দরকার নেই। দলের দায়িত্বশীলরা যদি এমন আচরণ করেন তবে আমরা কোথায় যাব।’

নগর বিএনপির সাবেক যুগ্মসম্পাদক গাজী সিরাজ উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ‘এক এমপির দুই ছেলে, যারা রাজনীতি করেন না, তারা কোন ক্রাইটেরিয়ায় কার্ড পেয়েছেন আমার বুঝে আসছে না।’ চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক বাদশা নিজে কার্ড পেলেও তার সংগঠনের বেশির ভাগ নেতা কার্ড না পাওয়ায় তিনি সাংগঠনিক সভা বয়কট করেন।

নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আলী মুর্তজা ক্ষোভ প্রকাশ করে তার ফেসবুকে ভিডিও পোস্ট করে বলেছেন, ‘আমি দলের জন্য চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ মামলার আসামি হয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ কারাভোগ করেছিলাম। অথচ এই সাংগঠনিক সভায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পেলাম না।’ ভেন্যুর সামনে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহিলা দলের নেত্রী মনোয়ারা বেগম মনিসহ একাধিক নারী নেত্রীকেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কোতোয়ালি থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল হাসান সোনামানিক বলেন, ‘আজ আমরা একদিকে আনন্দিত, অন্যদিকে চাপা কষ্ট নিয়ে আছি। এতদিন আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় থেকে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন, টাকার জোরে তাদের অনেকেই সাংগঠনিক সভায় ডাক পেয়েছেন।’ নগর বিএনপির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-৮ আসনের এমপি এরশাদ উল্লাহ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় সমালোচনা দেখা যাচ্ছে। এটা আমাদেরও নজরে এসেছে। ফ্যাসিস্টকে কার্ড দেওয়ার অভিযোগও আছে। এটি সঠিক কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। তিনি বলেন, কিছু ভুলত্রুটি হতে পারে। দলে ত্যাগ থাকলেও বর্তমানে কোনো কমিটিতে নেই-এ কারণেও হয়তো অনেকেই কার্ড পাননি। এরপরও কার্ড প্রদানের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম