২৪ ঘণ্টায় ঝরল আরও ৮ প্রাণ
হামে শিশুমৃত্যু ৯০০ ছাড়াল
মৃতদের ৯০ শতাংশ হামের কোনো টিকা পায়নি-ডব্লিউএইচও * ৫১ শতাংশের এমআর টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি
হামের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। শনিবার রাজধানীর শিশু হাসপাতালে মুমূর্ষু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অসহায় মা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা) হামজনিত মৃত্যুর মিছিলে আরও আট শিশুর নাম যুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের পাঁচ মাসে হামে শিশুমৃত্যু নয়শর (৯০২) ঘর ছাড়িয়ে গেছে। সবশেষ মারা যাওয়া শিশুদের ছয়জন ঢাকায় এবং দুজন সিলেটের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। এ ছাড়া উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৯৮ শিশু। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানা গেছে।
চলতি বছর মার্চের শুরু থেকে দেশের কয়েকটি জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ৬৪ জেলায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের দাবি গত দুই দশকে বাংলাদেশে হামে এত মৃত্যু এবং এত রোগী দেখা যায়নি। হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার চলতি বছরের ৫ এপ্রিল থেকে জাতীয় টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে। শেষ হয় ২০ মে। বর্তমানে নিয়মিত কার্যক্রম চলছে। তবে টিকদানের পর শিশুদের শরীর হাম প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জন করছে কিনা বা কতটুকু ক্ষমতা অর্জন করেছে তা জানার চেষ্টা করছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কোন বয়সি মানুষ হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং বেশি মৃত্যু হচ্ছে, আক্রান্ত বা মৃতদের মধ্যে হামের টিকা নেওয়ার হার কেমন, টিকা নেওয়ার পরও হামের সংক্রমণ হয়েছে কিনা-এসব বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করছে না।
এমন বাস্তবতায় হাম পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেছে। ডব্লিউএইচওর সর্বশেষ সাপ্তাহিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে-দেশে হামে মৃতদের ৫১ শতাংশের হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ বলছে, হামে মৃতদের ৯০ শতাংশ এ রোগের কোনো টিকা পায়নি। মৃতদের ৭ দশমিক ৯ শতাংশ এক ডোজ টিকা পেয়েছে; আর ২ দশমিক ১৯ শতাংশ হামের দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও মারা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলছেন, টিকা দেওয়ার পরও হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। মূলত চারটি বড় ভুলের কারণে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হয়েছে। এগুলো হলো-২০২৪ সালে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি না করা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়মিত টিকাদানে গাফিলতি, চলতি বছরে ব্যাপক সংক্রমণের পরও হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা না করে গতানুগতিক পদ্ধতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সর্বশেষ বিশেষ গণটিকা কর্মসূচিতে প্রায় ৪০ লাখ শিশু বাদ পড়া।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সাবেক উপাচার্য (বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের সরাসরি হামের টিকা দেওয়ার সুযোগ নেই। এ বয়সে তাদের সুরক্ষার প্রধান মাধ্যম মায়ের কাছ থেকে পাওয়া ‘ম্যাটারনাল ইমিউনিটি’। কিন্তু মায়েরা শৈশবে টিকা না পেলে সন্তানও পর্যাপ্ত মাতৃ-প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় না। ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বেশি হলে ধরে নিতে হবে তারা পর্যাপ্ত ম্যাটারনাল ইমিউনিটি পাচ্ছে না। এ কারণে সন্তান ধারণের আগে যেসব নারী হামের টিকা পাননি, তাদের দুই ডোজ টিকা দেওয়া প্রয়োজন।
বিএমইউর শিশু বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক আতিয়ার রহমান বলেন, বর্তমানে যে টিকা দেওয়া হয়েছে, সেটির কার্যকারিতা ও পূর্ণ রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগবে। এর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এক দফা টিকাদানই যথেষ্ট নয়। বাদ পড়া বা ড্রপআউট শিশুদের খুঁজে বের করে আবারও টিকার আওতায় আনতে হবে। প্রয়োজনে সরকারকে পুনরায় গণটিকার আয়োজন করতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত বা হাম সন্দেহে থাকা রোগীকে দ্রুত শনাক্ত করে আইসোলেশনে রাখতে হবে। যাতে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।

