সংবাদ সম্মেলনে আইজি প্রিজন
এখনো পলাতক ৬৯০ বন্দি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পুরান ঢাকার বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ২ হাজার ২৪৭ বন্দির মধ্যে এখনো ৬৯০ জন পলাতক রয়েছেন। তাদের মধ্যে নরসিংদী কারাগার থেকে পালানো ১৬৬ জনের কোনো তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তাদের নথিপত্র আগুনে পুড়ে যাওয়ায় আদালত থেকে সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। মঙ্গলবার দুপুরে পুরান ঢাকার বকশীবাজারে কারা অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন।
কারাগারে মাদক প্রবেশ প্রসঙ্গে আইজি প্রিজন বলেন, বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার বন্দি মাদকসংক্রান্ত মামলায় কারাগারে আছেন। মাদক না পেলে তাদের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, কেউ সহিংস আচরণ করছেন, আবার কেউ কথা শুনছেন না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফেনী-২ ও কিশোরগঞ্জে দুটি ‘মাদক বিশেষ কারাগার’ চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি কাশিমপুরের একটি কারাগারকেও মাদক বিশেষ কারাগার হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কারাগারে মাদকসংক্রান্ত মামলার বন্দিদের জন্য শরীরচর্চা, কাউন্সেলিং, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলাসহ আলাদা রুটিন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইজি প্রিজন বলেন, গত এক বছরে বিভিন্ন কারাগার থেকে প্রায় ৩ হাজারের বেশি ফোন জব্দ করা হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে এক হাজারের বেশি কারারক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার বা বাসা থেকে খাবার কারাগারে যাওয়ার অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তা হচ্ছে না। প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ হাজার বন্দি এই ব্যবস্থার খাবার গ্রহণ করছে। ক্যান্টিনের লেনদেনে ক্যাশলেস ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। এতে বন্দি তার আরএফআইডি ও আঙুলের ছাপ ব্যবহার করে টাকা উত্তোলন ও কেনাকাটা করতে পারবেন। মুন্সীগঞ্জে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেও চালুর পরিকল্পনা আছে।
সংবেদনশীল বন্দিদের বিষয়ে আইজি প্রিজন বলেন, তাদের বিশেষায়িত জোনে রাখা হয়েছে। এসব এলাকায় ব্যাপক জ্যামিং ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো কারণে মোবাইল ফোন কারাগারে ঢুকলেও সেখানে তা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। কারাগার থেকে পলাতক ৯ জঙ্গির মধ্যে ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখনো ৩ জন পলাতক রয়েছেন। তৃতীয় লিঙ্গের বন্দিদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাদের সাধারণ ওয়ার্ডে না রেখে আলাদা জোন, সেল বা বিভিন্ন স্থানে রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড বা বিশেষ জোন তৈরির বিষয়টি ভাবতে হবে।
আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারে চিকিৎসকের অনুমোদিত ১৫১টি পদের বিপরীতে মাত্র দুজন পদায়িত আছেন। অন্য কারাগারগুলোতে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে সাময়িকভাবে চিকিৎসক পাওয়া যায়। বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে ১০১ জন চিকিৎসক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। চিকিৎসকের স্বল্পতার কারণে ফার্মাসিস্ট ও ডিপ্লোমা নার্সদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
আইজি প্রিজন জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে কারাগারে ১৮৬ বা ১৮৭ জনের এবং চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ১২২ জন বন্দি কারাগারের বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। গত সাত মাসে ৫৬ হাজার বন্দিকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের স্বল্পতার কারণে কখনো কখনো হাসপাতালে নেওয়ার পথেই বন্দির মৃত্যু ঘটে। এক্ষেত্রে তদন্ত করা হয়। প্রয়োজন হলে ফরেনসিক পরীক্ষা করে তা নথিবদ্ধ করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগার দুটি অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
আইজি প্রিজন বলেন, আগে প্রায় ৮০ হাজার বন্দি নিয়ে কারাগার পরিচালিত হলেও বর্তমানে ৯৮ হাজার বন্দি আছেন। সোমবার ২ হাজার ৭৯৬ জন বন্দি কারাগারে এসেছেন এবং ৩ হাজার ৪৯ জন বের হয়েছেন। তিনি বলেন, গত ১ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতে ২৬ হাজারের বেশি আসামি দণ্ডিত হয়ে কারাগারে এসেছেন। এক দিন থেকে শুরু করে পাঁচ দিন, সাত দিন, এক মাস বা তিন মাসের মতো অল্প মেয়াদের সাজা পাওয়া এসব বন্দি কারাগারে আসায় বন্দির সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ।
আইজি প্রিজন বলেন, ‘জামিন বাণিজ্য’ বা মুক্তি বাণিজ্যের পুরোনো অভিযোগের বিষয়েও কাজ চলছে। বেল বন্ড যাচাইসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কিছু প্রক্রিয়া থাকায় সময় লাগে। তবে অযাচিতভাবে কাউকে আটকে রাখা যাতে না হয়, সেটি নিয়েও কাজ চলছে। এ ধরনের অভিযোগ ধীরে ধীরে কমে এসেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৭৯ জন বিদেশি বন্দি আছেন। এর মধ্যে সাজা শেষ করে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন ১৭০ জন। গত দুই বছরে বিদেশি বন্দি মৃত্যুর পর ১৭টি লাশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বা দুটি ভারতে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে তিনটি লাশ বিভিন্ন হিমাগারে সংরক্ষিত আছে।
আইজি প্রিজন বলেন, গত পাঁচ বছরে প্রায় আড়াই লাখ বন্দিকে ৩৯টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে তাদের অনেকে সেলাই মেশিন, কম্পিউটার সরঞ্জাম, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জে দুটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং লাইন রয়েছে। ভবিষ্যতে কারেকশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক করা গেলে বন্দিদের দক্ষতাকে আরও কাজে লাগানো সম্ভব হবে। সরকার বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ স্কুলশিক্ষার্থীর পোশাক দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। কারাগারের গার্মেন্ট লাইনে এসব পোশাক তৈরি করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতে তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে।
আইজি প্রিজন বলেন, কারাগারের মূল দর্শনকে আরও সংশোধন ও পুনর্বাসনমুখী করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জেলের নাম পরিবর্তন করে ‘কাস্টডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস বাংলাদেশ’ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আইনের খসড়া প্রণয়ন করে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
