Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

নেপালে দুর্যোগ

টানেলে আটকাদের উদ্ধারে চেষ্টা, নিহত ৮০০ ছুঁইছুঁই

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

টানেলে আটকাদের উদ্ধারে চেষ্টা, নিহত ৮০০ ছুঁইছুঁই

ফাইল ছবি

হিমালয় থেকে নেমে আসা হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপাল ও তিব্বতের বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকর্মীরা হাঁটু-ডোবা কাদা ঠেলে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে নেপালের কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে নজর সবার। সেখানে কয়েকশ’ মানুষ আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন-কেউ তা জানেন না। রোববারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালে নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা তিন হাজার ৪৮ জন। তাদের মধ্যে কয়েকশ’ বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। ৭৯৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপালের পুলিশ। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এমনও খবর আসছে-পানির স্রোতে ভেসে যাওয়া কিছু লাশ সম্ভবত ভারতে পৌঁছেছে।

ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের তথ্যমতে, বুধবার সকালে সীমান্ত এলাকায় আঘাত হানা এ দুর্যোগের কারণ ছিল হিমবাহ ধসে পড়া। ফলে পানির বিশাল তোড় ও ধ্বংসাবশেষ ভাটির দিকে ধেয়ে আসে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জলবায়ু সংকটকে এমন ঘটনার জন্য দায়ী করছেন। তিনি জলবায়ু নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, হিমালয় অঞ্চলের দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের এক অসম ও বড় ক্ষতির শিকার হচ্ছে। শনিবার শিশির খানাল বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে মাত্র দশমিক ১ শতাংশ অবদান থাকা সত্ত্বেও নেপালের জনগণ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক শিকার।

নেপালে হরপা বানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার চীনের কর্তৃপক্ষ তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু ও ৫৪৬ জনের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানায়। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যাদের মধ্যে নেপালের ১০৪ জন, ভারতের ৪৯ জন, লাটভিয়ার ৩৩ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ জন এবং ১৫ জন ব্রিটিশ নাগরিক অন্তর্ভুক্ত।

কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, রোববার উদ্ধারকাজে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়। নেপালের সেনাবাহিনী ‘ত্রিশূলী ৩এ’ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে পাইপ প্রবেশ করাতে সক্ষম হন। সেখানে শতাধিক শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভেতর থেকে কারও সাড়া পাওয়া যায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই সেই ছোট ছিদ্র দিয়ে বাতাস পাঠানো শুরু করেছি। এখন আমরা খননকাজ শুরু করব এবং উদ্ধারকারী দলকে ভেতরে পাঠাব।’

উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে সম্ভাব্য জীবিত শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোকে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন। মূলত তাদের উদ্ধার তৎপরতা ‘ত্রিশূলী ৩এ’ ও ‘৩বি’ প্রকল্প এলাকা কেন্দ্র করেই পরিচালিত হচ্ছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের তালিকায় থাকা ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী রয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকে বাড়ি ফিরছেন : নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি হলো ভোটেকোশি নদীর তীরবর্তী ধাদিং। সেখানকার কিছু মানুষ তাদের বিধ্বস্ত বাড়িতে ফিরে দেখতে শুরু করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ বাড়িই হয় ধসে গেছে, নয়তো কাদায় ডুবে গেছে। দুর্গত গ্রামগুলোর বাসিন্দারা জানান, বন্যার শুরু থেকেই তারা যে প্রায়-অবিরাম সতর্কবার্তা পাচ্ছেন, তার পরিস্থিতি বুঝে ওঠা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

নতুন বন্যার আতঙ্কের মধ্যেই লোকজন ফিরছেন। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে একটি নতুন হৃদ সৃষ্টি হওয়ায় আবার হড়পা বান আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে কিছু গণমাধ্যমে এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবু মানুষের মধ্যে রয়ে গেছে আতঙ্ক। সেই ট্রমা থেকে তারা বের হতে পারছেন না। গোবিন্দ শ্রেষ্ঠা নামের এক বাসিন্দা বার্তাসংস্থা এপিকে বলেন, ‘কখনো বলা হয় বন্যা আসছে, তখন আমাদের আবার উঁচু জায়গার দিকে ছুটতে হয়-এমনকি রাতের বেলায়ও। তার ওপর বৃষ্টিও হচ্ছে। পরিস্থিতি আমার জন্য সত্যিই খুব কঠিন।’ তিনি বলেন, ‘আমার ৭২ বছর বয়সি বাবা ও ৭০ বছর বয়সি মা আছেন। আমাকেই তাদের বহন করতে হয়। আমি এখন ক্লান্ত। যারা এখনো বেঁচে আছেন, তাদের সবার জন্যই পরিস্থিতিটা এভাবেই চলছে।’

প্রধান শিক্ষকের সিদ্ধান্তে বাঁচল ৯০০ শিক্ষার্থীর প্রাণ : বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন-ওই এলাকায় বন্যার ঝুঁকির বিষয়ে বেশ কয়েকটি সতর্কবার্তা পাওয়ার পরই তিনি প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নুয়াকোট জেলার ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি এ সিদ্ধান্ত নেন।

নুয়াকোট থেকে বিবিসির প্রতিনিধি জানান, স্কুলে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৬০০-এর বেশি। ওই শিক্ষক কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে চারটি সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। এসব সতর্কবার্তার মধ্যে এমন তথ্যও ছিল-নদীর উজানে বেত্রাবতী এলাকায় বন্যার পানি ইতোমধ্যেই ঢুকে পড়েছে। ঠিক তখনই তিনি সিদ্ধান্তটি নেন।

প্রধান শিক্ষক বলেন, ‘আমি ভাবলাম আর দেরি করা ঠিক হবে না। এমনকি যদি বন্যা নাও আসত, তবুও বিষয়টি ছিল মাত্র একদিনের ক্লাসের।’ শিক্ষার্থীদের নিয়ে উঁচু স্থানের দিকে সরে যাওয়ার সময় দাওয়াদি দেখতে পান, নদী থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে একটি হোস্টেল ভবন বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সিদ্ধান্তটি আরও ১০ মিনিট পরে নিতাম, তবে শিক্ষার্থীসহ আমরা কেউই আজ আপনাদের সঙ্গে কথা বলার অবস্থায় থাকতাম না।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম