কিউওএস প্রতিবেদনে ভয়াবহ চিত্র
বেহাল মোবাইল সেবা
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোথাও মিলছে না সংযোগ, কোথাও বাড়ছে কলড্রপ। আবার ধীরগতির ইন্টারনেটেও ভুগছেন গ্রাহকরা। শহরে সেবার মান সন্তোষজনক দাবি করলেও মফস্বলে মোবাইল ফোন সেবার উলটো বাস্তবতা। জেলা-উপজেলায় যাচাই করতেই বেরিয়ে এসেছে গ্রাহকসেবার বড় ঘাটতি। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) যাচাইকৃত সেবার মান (কিউওএস) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন আশঙ্কাজনক চিত্র। বৃহত্তম নেটওয়ার্কের দাবি করা গ্রামীণফোনও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। রবির পারফরম্যান্সেও মিলেছে একাধিক ঘাটতি। টুজি ভয়েস কলে সবচেয়ে বেশি ড্রপ বাংলালিংকের। আর উচ্চগতির ইন্টারনেটের প্রচারের বিপরীতে বাস্তব মানদণ্ডে সবচেয়ে পিছিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি টেলিটক। মানহীনতা এবং তথ্যের অস্বচ্ছতার বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ গ্রাহকের ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন টেলিকম বিশেষজ্ঞরা।
মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবিলম্বে শুধু কাগজ-কলমে নজরদারি সীমিত না রেখে দৃশ্যমান জরিমানা ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে গ্রাহকের ওপর এই ডিজিটাল হয়রানি থামানো সম্ভব হবে না।
বিটিআরসির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, নতুন মেথোডোলজিতে গ্রাহকরাসেবার মানের প্রকৃত চিত্র জানতে পারছেন। আগে অপারেটরদের দেওয়া কিউওএস তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এনএমএস), টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) ও ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে নিজস্বভাবে সেবার মান যাচাই করছে বিটিআরসি। ফলে অপারেটরদের তথ্য গোপন বা লুকোচুরির সুযোগ নেই। তিনি বলেন, কোন অপারেটর কোথায় কেমন সেবা দিচ্ছে-তা এখন গ্রাহকের সামনে স্পষ্ট হবে। আর সেবার মান খারাপ হলে গ্রাহক স্বাভাবিকভাবে সেই অপারেটর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
বিটিআরসির জুলাই মাসের সেবা পর্যালোচনা প্রতিবেদনে গ্রামীণফোনের সেবার মানে চরম ঘাটতি ও তথ্যের বৈষম্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব দাবি ও বিটিআরসির স্বাধীন পর্যালোচনার মধ্যে বড় ব্যবধান পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ভিওএলটিই কলড্রপের ক্ষেত্রে অপারেটরটির নিজস্ব হিসাব ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণে প্রায় ৯ গুণের তফাত ধরা পড়ে। গ্রামীণফোন কলড্রপের হার ০.০৪২২ শতাংশ দাবি করলেও বিটিআরসির পরীক্ষায় তা দাঁড়ায় ০.৩৮১৪ শতাংশে। এই হার বিটিআরসির নির্ধারিত সর্বোচ্চ ০.৫০ শতাংশ সীমার মধ্যে থাকলেও প্রতিযোগীদের তুলনায় তা সবচেয়ে খারাপ। যেখানে বাংলালিংকের কলড্রপ ০.০৭৩২ শতাংশ এবং রবির ০.১৩৪৮ শতাংশ। এছাড়া প্রতিবেদনে নেটওয়ার্ক কাভারেজের মারাত্মক চিত্র প্রকাশ পায়। দেশের ৫টি উপজেলায় গ্রামীণফোনের কোনো নেটওয়ার্ক কাভারেজ নেই এবং ১টি উপজেলায় ফোরজি সেবা পৌঁছায়নি। গ্রাহকরা ফোরজির যুগেও শুধু টুজি সেবা পাচ্ছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই প্রতিবেদন গ্রামীণফোনের সেবার মান ও তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদনে হতশ্রী চিত্র ভেসে উঠেছে মোবাইল অপারেটর রবির সেবায়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংযোগ জটিলতা, অতিরিক্ত কলড্রপ এবং ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে গ্রাহক ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। জরিপ অনুযায়ী, নির্ধারিত ২৪টি উপজেলা ও ৩টি জেলায় টুজি কল সেটআপের ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে রবি। ফোরজি সেবায়ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশ পিছিয়ে অপারেটরটি। রবির গড় ডাউনলোড গতি যেখানে মাত্র ৬.৮৪৮ এমবিপিএস, সেখানে বাংলালিংকের ৮.৬০৭ এবং গ্রামীণফোনের ৮.২২৬ এমবিপিএস। শীর্ষস্থান দখল করা বাংলালিংকের তুলনায় রবির ইন্টারনেটের গতি প্রায় ২০.৪ শতাংশ কম। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ডেটা দিতে টালবাহানা করছে রবি। বিটিআরসি ৪১ হাজার ৮১৯টি সেলের প্রাথমিক ‘র ডেটা’ চেয়েও পায়নি। বাধ্য হয়ে রবির দেওয়া নিজস্ব প্রক্রিয়াজাত তথ্যের ওপর নির্ভর করেই প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হয়েছে কমিশনকে। কোনো স্বনামধন্য অপারেটরের তদারকি সংস্থাকে মূল ডেটা না দিয়ে তথ্য গোপন করার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
বিটিআরসির হালনাগাদ ড্রাইভ টেস্ট প্রতিবেদনে জাতীয় পর্যায়ে বাংলালিংকের ফোরজি ইন্টারনেটের উচ্চগতির প্রশংসা মিললেও নেটওয়ার্ক কাভারেজ ও সেবার মান নিয়ে উঠে এসেছে বড় সীমাবদ্ধতা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, পরিদর্শনের আওতাভুক্ত এলাকার বাইরে দেশের অন্তত ছয়টি উপজেলায় বাংলালিংকের কোনো ধরনের মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজ নেই। ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক গ্রাহক মৌলিক টেলিযোগাযোগ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে টুজি ভয়েস কলের মান বিচারে দেশের প্রধান তিন বেসরকারি অপারেটরের মধ্যে সর্বনিু অবস্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিটিআরসির মনিটরিং উপাত্ত অনুযায়ী, বাংলালিংকের কলড্রপের হার ০.৩৫৬৬ শতাংশ, যা গ্রামীণফোন (০.৩২৯৮) ও রবি (০.২৪০৫%)-এর তুলনায় সর্বোচ্চ। মূলত প্রত্যন্ত এলাকায় নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি ও ক্রমাগত কলড্রপের কারণে বাংলালিংকের সেবার গুণগত মান নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে গ্রাহকদের মধ্যে।
তথ্যের অস্বচ্ছতা ও কারিগরি দুর্বলতায় রাষ্ট্র্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সেবা এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে। এমনটাই বলছে বিটিআরিসি। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে মাত্র ১২টিতে বিটিআরসির নির্ধারিত মানদণ্ড ছুঁতে পেরেছে প্রতিষ্ঠানটি; বাকি ৫২ জেলাতেই সেবার মান অসন্তোষজনক। টেলিটকের নিজস্ব দাবি-তাদের গড় ফোরজি ডাউনলোড স্পিড ১১.২০ এমবিপিএস, যা কাগজ-কলমে তিন বেসরকারি অপারেটরের চেয়ে বেশি। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানায়, যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় বাইনারি ডেটা অসম্পূর্ণ থাকায় টেলিটকের এই দাবি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি। ফলে ‘দেশের দ্রুততম নেটওয়ার্ক’ হিসাবে তাদের স্বীকৃতি দেয়নি বিটিআরসি। এমনকি টেলিটকের নিজের দেওয়া তথ্যেও সেবা ব্যাহত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। বিটিআরসির নিয়ম অনুযায়ী ডেটা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার হার সর্বোচ্চ ০.৫০ শতাংশ হতে পারে, অথচ টেলিটকের ক্ষেত্রে তা ছিল ০.৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি ফোরজি ইন্টারনেটে কোনো বাধা ছাড়া যুক্ত থাকার ক্ষেত্রে যেখানে অন্তত ৯৯ শতাংশ সফলতা থাকা বাধ্যতামূলক, সেখানে টেলিটকের মান ছিল ৯৮.৪৯ শতাংশ। অসম্পূর্ণ তথ্যের কারণে টেলিটকের ফোরজি নেটওয়ার্ক কতটা শক্তিশালী বা তা গ্রাহকদের কাছে ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে খোদ বিটিআরসি সংশয় প্রকাশ করেছে।

