গুলিতে যুবদলকর্মী নিহত
রাউজানে রক্তের দাগ শুকাচ্ছে না
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের রাউজান আবারও রক্তাক্ত। এবার মোহাম্মদ করিম নামে এক যুবদল কর্মীকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে উপজেলার কেরানিহাটে এ ঘটনা ঘটে। শুধু করিম নয়, এ জনপদে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ উপজেলায় অন্তত ২৭ জন খুন হয়েছেন। কখনো রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক বিরোধ, কখনো আধিপত্য বিস্তার বা চাঁদার দাবিতে এসব নৃশংসতা ঘটছে। পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে দাবি করা হলেও রাউজানে যেন রক্তের দাগ শুকাচ্ছেই না।
বৃহস্পতিবার রাতে নিহত করিম উরকিরচর ইউনিয়নের হারপাড়া গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. শফীর ছেলে। তবে তিনি পরিবার নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চিকনদন্ডী ইউনিয়নের আমান বাজার এলাকায় থাকতেন। পরিবারে তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছেন।
পুলিশের ধারণা, করিম মাদক কারবারে জড়িত ছিলেন, যা নিয়ে বিরোধে তিনি খুন হয়ে থাকতে পারেন। ঘটনার পর তার স্ত্রী বিলকিস আক্তার হত্যা মামলা করেছেন। তবে মামলায় কারো নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ ঘটনায় পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, করিমকে বিএনপি নেতা ও স্থানীয় সংসদ-সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সভা-মিছিলে প্রায় দেখা যেত।
বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মোহাম্মদ করিম কেরানিহাটে যান। সেখান পৌঁছানোর পরপরই ৪ থেকে ৫টি মোটরসাইকেলে কয়েকজন এসে তাকে ঘিরে ফেলে। তাদের একজন কিরিচ দিয়ে করিমের ঘাড় ও মাথায় কোপ দেয়। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে কয়েকজন গুলি করে। ৩ থেকে ৫ মিনিটে তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে সন্ত্রাসীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরে লাশ উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায় পুলিশ।
রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের এএসপি মুহাম্মদ বেলায়াত হোসেন বলেন, আব্দুল করিমকে হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী ও এসপি মাসুদ আলম। শুক্রবার সকালে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে নির্দেশনা দিয়েছেন।
পুলিশ বলছে, করিমের শরীরে চারটি গুলি লেগেছে-একটি পেটে, একটি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বের হয়ে গেছে এবং বাকি দুটি গুলি উরু ও নিতম্বে বিদ্ধ হয়েছে।
স্বজনরা জানান, দীর্ঘদিন করিম সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশে ফেরেন। বিএনপি ও যুবদলে বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে সক্রিয় থাকলেও দলে তার পদ ছিল না। রায়হান উদ্দিন নামে এক স্থানীয় লোক জানান, নানা অপরাধে একাধিকবার জেলে গেছেন করিম। মাদক ও মাটি কাটার হিসাবের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের একটি গ্রুপের মধ্যে বিরোধ ছিল। এর জেরে এই হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকতে পারে।
দুই বছরে রাউজানে যত হত্যাকাণ্ড : করিমের আগে ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী বাজারের চৌমুহনী এলাকায় অস্ত্রধারীরা গুলি করে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে হত্যা করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাউজানে ২৭ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি ঘটনা রাজনৈতিক বিরোধে ঘটেছে। ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি উপজেলার নোয়াপাড়ায় জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন নগরীর খাতুনগঞ্জের আড়তদার জাহাঙ্গীর আলম (৫৫)। ওই বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি মুহাম্মদ হাসান নামে এক যুবলীগ কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ২১ মার্চ পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হোয়ারাপাড়া এলাকার মোবারক খালের পাড় থেকে রুবেল নামে এক তরুণের লাশ উদ্ধার করা হয়। ১৯ এপ্রিল রাতে খুন হন যুবদল কর্মী মানিক আব্দুল্লাহ। গত বছরের ২২ এপ্রিল রাউজান সদরের কাছে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাজিপাড়া গ্রামে খুন হন ইব্রাহিম নামে এক যুবদল কর্মী।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা : চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন আজাদ যুগান্তরকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসাবে চিহ্নিত। জেলার অন্য উপজেলার মতো টিলেঢালা ভাব নিয়ে এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এসব পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় অভিযান চালানোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
এএসপি মুহাম্মদ বেলায়াত হোসেন যুগান্তরকে জানান, বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনায় পুলিশ ও ডিবির একাধিক টিম মাঠে আছে। এছাড়া আগে ঘটনাগুলোর বেশির ভাগ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
