Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

ভরাট হচ্ছে যশোরের জলাশয়

সাঁকোর জনপদেই এখন পানির হাহাকার

শতাধিক পুকুর-দিঘি গিলে খেল বহুতল ভবন

ইন্দ্রজিৎ রায়

ইন্দ্রজিৎ রায়

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সাঁকোর জনপদেই এখন পানির হাহাকার

অস্তিত্ব সংকটে যশোর শহরের ঐতিহ্যবাহী লালদিঘি। এক পারে উন্মুক্ত মঞ্চ, অন্য পারে মার্কেট গড়ে দিঘির আয়তন গিলে খেয়েছে খোদ পৌর কর্তৃপক্ষই। সম্প্রতি তোলা। হাসফিকুর রহমান পরাগ

ফার্সি শব্দ ‘জসর’ থেকে যশোর, যার অর্থ সাঁকো। এক সময় যে জলাকীর্ণ জনপদে চলাচলের জন্য সাঁকোর প্রয়োজন হতো, সেই প্রাচীন যশোর শহরে এখন পানির উৎস সংকটে পড়েছে। কয়েক দশকে শহরের শতাধিক পুকুরসহ কয়েকটি দিঘি ভরাট করে বহুতল আবাসিক ভবন ও বিপণিবিতান নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে প্রাকৃতিক পানির উৎস কমেছে। বেড়েছে পরিবেশগত নানা ঝুঁকি।

জানা যায়, সাড়ে ১৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের যশোর শহরে প্রায় সাড়ে চার লাখ স্থায়ী বাসিন্দা রয়েছে। প্রতিদিন শহরে চলাচল করেন অন্তত ১০ লাখ মানুষ। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের শহরে কমছে প্রাকৃতিক পানির উৎস। ছোট বড় পুকুর ভরাট করে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল ভবন, বিপণিবিতান। নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বাড়ছে তাপমাত্রা। অগ্নিকাণ্ডের মতো বড় দুর্ঘটনায় প্রাকৃতিক পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে। বাড়ছে নানা পরিবেশগত ঝুঁকি। ২০১৭ সালের স্যাটেলাইট জরিপ অনুযায়ী, যশোর শহরে সাড়ে ৪৪ একরের ২৩২টি ডোবা ও ২২৮ একরের ৫৭২টি পুকুর ছিল। তবে বাস্তবে এ সংখ্যা এখন অনেক কম।

সরেজমিন দেখা গেছে, শহরের বড় জলাশয় আরবপুর দীঘি ও চোরমারা দিঘি ভরাট করা হয়েছে কয়েক বছর আগেই। সেখানে এখন আবাসিক এলাকা, গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। ফলে এ এলাকায় বর্ষায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে, কারণ পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। শহরের লালদিঘির একাংশ ভরাট করে খোদ পৌর কর্তৃপক্ষ বিপণিবিতান গড়ে তুলেছে। ঐতিহ্যবাহী দিঘি পরিণত হয়েছে মরা ডোবায়। এছাড়া শহরের সন্যাসদিঘিসহ শতাধিক পুকুর ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশ্যে পুকুর ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও দেখার যেন কেউ নেই। সরকারের তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা দায়সারা। পরিবেশ আইন ও জলাশয় সংরক্ষণ আইন কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই।

শহরের কারবালা এলাকার বাসিন্দা মাহমুদ হাসান বলেন, জমির দাম বৃদ্ধি ও আবাসন সমস্যার কারণে যশোর শহরের ঐতিহ্যবাহী ২০ বিঘা আয়তনের চোরমারা দিঘি, ২০ বিঘা আয়তনের সন্যাসদিঘি, ১০ বিঘা আয়নের আরবপুর ব্যারল দিঘি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শহরের বড় বড় জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন করা হয়েছে। জলাশয় ভরাট করায় পানির স্তর নেমে গেছে। প্রাকৃতিক পানির উৎস কমেছে। এতে বেড়েছে পরিবেশগত ঝুঁকি।

পরিবেশকর্মী বিথিকা সরকার বলেন, এক দশকে প্রায় শতাধিক প্রাকৃতিক জলাধার বিলুপ্ত হয়েছে। শ্রেণি পরিবর্তন করে সেখানে আবাসন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এতে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। বড় ধরনের কোনো অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাকৃতিক পানির উৎস পাওয়া যাবে না। এটা পরিবেশের বিপর্যয় ডেকে আনবে। অবৈধভাবে জলাশয় ভরাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদাসীন। এ বিষয়ে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ছোলজার রহমান বলেন, যারা জলাশয় ভরাট করছে, তারা রাতারাতি সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। নগরপরিকল্পনাবিদ কিংবা শাসক সবাই নির্বিকার। তারা ক্ষমতা বা আইনের প্রয়োগ করছেন না। ফলে বাস্তবে নগর অপরিকল্পিত থেকে যাচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তাই জলাশয় ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানান তিনি।

জানতে চাইলে যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, জলাশয় ভরাট বন্ধে পৌর কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২২ সাল থেকে পুকুর শ্রেণির কোনো জমিতে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এতে কিছুটা হলেও জলাশয় ভরাট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘আইনে বলা আছে জলাধার বা পুকুর কোনোভাবেই বাণিজ্যিক বা বসতভিটার জমিতে রূপান্তর করা যাবে না। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর কঠোর অবস্থানে রয়েছে।’ তার দাবি, ‘জলাশয় ভরাটের অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি কয়েকটি অভিযোগ পেয়ে তদন্ত টিম পাঠানো হয়েছে। পুকুর ভরাটের প্রমাণ মিললেই মামলা দিচ্ছি।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম