Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

পাহাড় ঝরনা সিলিকা বালুর মিতালী

প্রকৃতির সাজঘর কলমাকান্দা

মায়াবী টানে ছুটছেন পর্যটকরা

Icon

কামাল হোসাইন, নেত্রকোনা

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতির সাজঘর কলমাকান্দা

যত দূর চোখ যায়, ধনুকের মতো বাঁকা সবুজ পাহাড় মিশে গেছে মেঘমালায়। কলমাকান্দার পাতলাবন আর চন্দ্রডিঙা পাহাড়ের নিচে পাথর আঁকড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী বটবৃক্ষের (ইনসার্টে) এই রূপই টানছে পর্যটকদের -যুগান্তর

আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, সারিবদ্ধ পাহাড়-টিলা। জালের মতো ছড়িয়ে আছে মহাদেও, গণেশ্বরী, মঙ্গলেশ্বরী ও ফুলেশ্বরীর মতো নদ-নদী। এর সঙ্গে আছে ঝরনা, স্বচ্ছ জলধারা, পাথর আর সিলিকা বালু। সব মিলিয়ে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা উপজেলা যেন প্রকৃতির এক অপরূপ সাজে সেজে থাকা জনপদ। ভারতের মেঘালয় সীমান্তের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এ উপজেলার আয়তন ৩৭৬ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণে কলমাকান্দা হয়ে উঠেছে বৈচিত্র্যময় এক জনপদ।

উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী। এর মধ্যে রংছাতির চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন এলাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিশেষ পরিচিত। পাহাড়ের স্তরে স্তরে রংবেরঙের পাথর, ঝরনার মতো স্বচ্ছ জলধারা ও সিলিকা বালুর বিস্মৃতি এ এলাকাকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য।

পাহাড়ের টানে পর্যটক : চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন পাশাপাশি দুটি এলাকা। গ্রামের ঠিক উত্তরে সুউচ্চ মেঘালয় পাহাড়। পাহাড়ের কিছু অংশ বাংলাদেশে পড়লেও সীমান্তের যে কোনো প্রান্তে দাঁড়িয়ে ধনুকের মতো বাঁকা পাহাড়পুঞ্জের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এ সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিন শত শত পর্যটক এখানে আসেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পর্যটকদের চলাচলে কিছুটা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিজিবি ও বিএসএফের কড়া পাহারা রয়েছে। চন্দ্রডিঙা থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে হাতিবেড় এলাকায় বসানো হয়েছে বিজিবি চেকপোস্ট।

চন্দ্রডিঙা পাহাড় নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে একটি জনশ্রুতি রয়েছে। পঞ্চদশ শতকে রচিত মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যতম চরিত্র চাঁদ সওদাগরকে ঘিরে এ কাহিনী। স্থানীয়দের বিশ্বাস, বাণিজ্য করতে এসে সর্পদেবী মনসার অভিশাপে চাঁদ সওদাগরের ডিঙি বা নৌকা এখানে আটকে যায়। সেই থেকে নাম হয় চন্দ্রডিঙা। তবে এ কাহিনীর পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ বা ইতিহাস পাওয়া যায়নি।

পাহাড়ের মাঝখানে নৌকার মাস্তুলের মতো দেখতে বিশাল পাথরের একটি অংশ রয়েছে। সেখানে প্রতিবছর হাজং ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মনসাপূজা ও চাঁদ সওদাগরের পূজা করেন। প্রতি মঙ্গল ও শনিবার ধূপ ও প্রদীপ জ্বালানো হয়। শতবর্ষী একটি বটগাছ, ছড়া ও ঝরনা স্থানটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নেত্রকোনা-৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তৌহিদুল বারী বলেন, নিরাপত্তার কারণে সীমান্তের কিছু স্থানে প্রবেশে বিধিনিষেধ রয়েছে। ঝরনা ও ছড়ায় গোসল করতে গিয়ে অনেক পর্যটক ভুল করে শূন্যরেখায় চলে যান। ঝুঁকি এড়াতে চেকপোস্ট বসিয়ে তাদের সচেতন করা হচ্ছে। অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পর্যটকরা সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

স্বচ্ছ মহাদেও নদ : চন্দ্রডিঙা থেকে প্রায় ১৫ মিনিটের পথ পাতলাবন সীমান্ত।

সেখানে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝরনাধারার মতো নেমে এসেছে মহাদেও নদ। উত্তরে সবুজ অরণ্যে ঘেরা সুউচ্চ পাহাড়। যত দূর চোখ যায় ধনুকের মতো বাঁকা পাহাড়ের সারি মিশে গেছে মেঘমালার সঙ্গে।

কাচের মতো স্বচ্ছ পানির জন্য মহাদেও নদ বিশেষ পরিচিত। নদজুড়ে রয়েছে সমুদ্রের বালুরাশির মতো সিলিকা বালু। শুষ্ক মৌসুমে পর্যটকেরা গা ভেজানোর পাশাপাশি বালুর ওপর হাঁটতেও পারেন।

বর্ষায় পাহাড় থেকে নেমে আসা খরস্রোতার সঙ্গে শত শত বছর ধরে নদটি বয়ে আনছে বালু, নুড়ি পাথর ও কয়লা। এগুলো স্থানীয় মানুষের জীবিকার উৎস। নির্মাণশিল্পে ব্যবহৃত হয় নদটির বালু। তবে অপরিকল্পিতভাবে শত শত বাংলা ড্রেজার দিয়ে বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’ আদালতে রিট করলে বালু উত্তোলন বন্ধ রয়েছে।

পর্যটনের অপার সম্ভাবনা : পাতলাবন এলাকার বাসিন্দা ঝুমুর মারাক বলেন, পাতলাবন, বেতগড়া, চন্দ্রডিঙা, গোপালবাড়ির চেংগ্নী এলাকা এবং পাশের লেংগুরার ফুলবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের ‘সাত শহীদের’ মাজারসহ সবুজে আচ্ছাদিত ছোট-বড় পাহাড় পর্যটকদের চোখ জুড়ায়। চেংগ্নী পাহাড়ের হাজং সম্প্রদায়ের গোপালপুর মন্দিরে ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে দোলপূর্ণিমা উপলক্ষ্যে সাত দিনব্যাপী মেলা হয়ে আসছে। ওই সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের ভিড় বাড়ে।

নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, কলমাকান্দার চন্দ্রডিঙা ও পাতলাবন অন্যতম সুন্দর স্থান। পর্যটকদের যাতায়াত, নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-মোটেল বাড়ানো গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা আরও বাড়বে।

নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ-সদস্য ও জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, কলমাকান্দা সীমান্তের মনোরম সৌন্দর্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন। এখানে গত ১৬ বছরে কোনো উন্নয়ন হয়নি। পথঘাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ নেই বললেই চলে। এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশেষ কিছু পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। রাস্তাঘাট, কয়েকটি সেতুসহ কিছু অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে আরও বেশি দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসু মানুষ এই অঞ্চলে এসে আনন্দ পাবেন।

যেভাবে যাবেন : ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি কলমাকান্দায় যাওয়া যায়। সেখান থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ মোটরসাইকেল বা ইজিবাইকে পাড়ি দিয়ে এসব এলাকায় যাওয়া সম্ভব। এছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে আন্তঃনগর ‘হাওড় এক্সপ্রেস’ ও ‘মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস’ ট্রেনে নেত্রকোনা এসে বাস, অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে কলমাকান্দার এসব দর্শনীয় স্থানে যাওয়া যায়।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম