সাভারে মাদ্রাসায় ছয় মাস ধরে বর্বরতা
শিশুটি যার কাছে গেছে সেই করেছে নিপীড়ন
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিজের আগ্রহেই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিল সাত বছরের শিশুটি। স্বপ্ন ছিল দ্বীনি শিক্ষা নিয়ে বড় হওয়ার। কিন্তু ভর্তি হওয়ার মাত্র ২১ দিনের মাথায় তার ওপর শুরু হয় পাশবিক নির্যাতন। অভিযোগ-একজনের কাছ থেকে আরেকজন জেনে যায় তার ওপর নির্যাতনের কথা। এরপর সুযোগ বুঝে অন্যরাও তাকে পাশবিক নির্যাতন করে। এভাবে ছয় মাসে মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্র ও শিক্ষক তাকে বারবার বলাৎকার করেছে। কাউকে জানালে গলা টিপে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। নির্যাতনে শিশুটির শরীরে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। বদলে গেছে তার আচরণও। এখন সে চিৎকার করে, কান্নাকাটি করে, কখনো উলঙ্গ হয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সাভারের পূর্ব শাহীবাগের মারকাযুল উলূম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসার পাঁচ ছাত্র, চার শিক্ষক ও পরিচালককে আসামি করে মামলা করেছে শিশুটির পরিবার। এরইমধ্যে দুই শিক্ষকসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার তিন কিশোরের বয়স ১২, ১৩ ও ১৫ বছর।
শনিবার সাভার মডেল থানায় সংবাদ ব্রিফিংয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) রাকিবুল হাসান ইশান জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাভার, আশুলিয়া ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে। বরগুনা, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, গাজীপুর ও ঢাকায়ও অভিযান চালানো হয়। তিনি জানান, গ্রেফতার কয়েকজন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার কথা স্বীকার করেছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
মামলায় বলা হয়, চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি শিশুটিকে মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। সপ্তাহে একদিন বাবা তার সঙ্গে দেখা করতেন এবং শুক্রবার তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর রাফি নামে একছাত্র তাকে আবার টয়লেটে নিয়ে বলাৎকার করে। কান্নাকাটি করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি জানতে পারে সায়েম। অভিযোগ-২৬ ফেব্রুয়ারি ভোরে সেও শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে একই কাজ করে। এরপর আবু সাঈদ ও মোহাম্মদ বিন মুক্তার বিষয়টি জানতে পারে। তারা শিশুটির পাশাপাশি ঘুমাতো। ১২ এপ্রিল রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে সাঈদ নির্যাতন করে। শিশুটি জেগে চিৎকার করলে রাফি ও সায়েম তাকে সহযোগিতা করে। দুইদিন পর মুক্তারও শিশুটিকে বলাৎকার করে। অভিযোগে আরও বলা হয়-২৫ এপ্রিল রাতে শিশুটিকে বিছানাসহ টয়লেটের কাছে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। বারবার নির্যাতনের কারণে তার পায়ুপথে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনা কাউকে জানালে তাকে মেরে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়।
শিক্ষকের কাছেও রেহাই নেই : শিশুটির ওপর নির্যাতনের বিষয়টি জানতে পারে মক্তব বিভাগের সহকারী শিক্ষক হাফেজ মাওলানা জাবের হোসেন। পরে কৌশলে শিশুটিকে নিজের পাশে শোয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। এরপর প্রায় প্রতি রাতে তাকে তিনি বলাৎকার করতেন। ৪ জুলাই রাতেও জাবের শিশুটিকে ধর্ষণ করেন। এ সময় তার গালে কামড় দেওয়া হয়। চিৎকার করলে মুখ চেপে ধরে মারধর করা হয়। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত শিশুটি পরদিন শিক্ষক সাব্বিরকে ঘটনাটি জানায়। সাব্বির তাকে সহযোগিতা না করে উলটো মারধর করেন ও হুমকি দেন। বিষয়টি জানতে পেরে পরিবারকে না জানানোর জন্য শিশুটিকে ভয় দেখান হাফেজ কামরুজ্জামান। ৬ জুলাই তাকে মারধর করা হয়।
মাকে জানায় শিশুটি : একপর্যায়ে মাদ্রাসায় শিশুটির ওপর নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ পেতে শুরু করে। অন্য এক শিশুকে জাবের বলাৎকার করলে তাকে বড় হুজুর মারধর করেন। কেন তাকে মারধর করা হয়েছে-তা নিয়ে পরিবারের মধ্যে আলোচনা হলে ১২ আগস্ট শিশুটি তার মাকে সব ঘটনা জানায়। পরে তার বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা বিষয়টি জানতে পারেন। শিশুটির বাবা মাদ্রাসার মক্তব বিভাগের প্রধান কারী রফিকুল ইসলামের কাছে বিচার চান। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। ১৫ আগস্ট রাতে শিশুটির বাবা মাদ্রাসার পরিচালক জিয়া ইবনে কাসেমকে বিষয়টি জানান। মামলার অভিযোগে বলা হয়-৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের হাতে অপরাধীদের তুলে দেওয়ার কথা তিনি (জিয়া ইবনে কাসেম) বললেও পুলিশ ও সাংবাদিকদের বিষয়টি জানাতে নিষেধ করেন। মামলায় জিয়া ইবনে কাসেমসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতার তালিকায় থাকা জাবের হোসেন ও কামরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ জানায়, তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে-তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
আদালতে শিশুর জবানবন্দি : ২৩ আগস্ট শিশুটির বাবা ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার আবেদন করেন। আদালত অভিযোগটি সাভার মডেল থানায় এজাহার হিসাবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। ২৭ আগস্ট এজাহার আদালতে পাঠানো হয়। পরে শিশুটি আদালতে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দি গ্রহণ শেষে তাকে বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়। শিশুটির বাবা বলেন, তিন সন্তান নিয়ে তার সংসার। দুই ছেলের মধ্যে এ শিশুটিই বড়। নিজের আগ্রহে তাকে মাদ্রাসায় দিয়েছিলেন। আশা ছিল-ছেলে দ্বীনের খেদমত করবে। এখন সে স্বাভাবিক নেই। তিনি বলেন, যারা তার ছেলের জীবন এভাবে নষ্ট করেছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। বাদীপক্ষের আইনজীবী আবুল কালাম বলেন, শিশুটির ওপর অত্যন্ত নৃশংস নির্যাতন চালানো হয়েছে। বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করা প্রয়োজন। সাভার মডেল থানার এসআই সামরুল হোসেন বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত চলছে। পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
