ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলচর্চা
৩৮ বছরেও স্থায়ী দপ্তর হয়নি গবেষণাকেন্দ্রের
৭ বছর ধরে খালি নজরুল চেয়ার
সাদ আদনান রনি
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত ও জীবনদর্শনের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক প্রায় এক শতাব্দীর। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরেই তার জীবনের বহু স্মরণীয় অধ্যায় রচিত হয়েছে। সেই ঐতিহাসিক বন্ধনকে ভিত্তি করে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নজরুল গবেষণাকেন্দ্র। তবে প্রতিষ্ঠার প্রায় চার দশক পরও এর গবেষণা, প্রকাশনা ও স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে কেন্দ্রের কার্যক্রম এখনো অনেকটাই সভা-সেমিনারনির্ভর। অন্যদিকে ২০১৯ সালের পর থেকে ঢাবির বাংলা বিভাগে নজরুল চেয়ার পদটি খালি রয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলা বিভাগের পাঠ্যসূচিতেও জাতীয় কবিকে নিয়ে সে অর্থে পড়ানো হয় না। যদিও ২০২১ সালের পর থেকে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এ অবস্থায় ঢাবিতে নজরুলচর্চায় এমন অবহেলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং নজরুল অনুরাগীদের মধ্যে আক্ষেপ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রায় চার দশক পার হলেও এর নিজস্ব দপ্তর বা কক্ষ নেই। এমনকি পরিচালক ছাড়া স্থায়ী কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীও নেই। সম্প্রতি কেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর। তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রের দায়িত্ব পেলেও এর আগের পরিচালকদের কোনো নথিপত্র বা কার্যসূচি হাতে পাননি। এ পর্যন্ত সেমিনার আয়োজনের মধ্যেই মূলত কেন্দ্রের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের জন্য আলাদা দপ্তর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেন।
পরিচালক হিসাবে কী ধরনের উদ্যোগ নিতে চান, এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক তারিক মনজুর যুগান্তরকে বলেন, নজরুল নিয়ে এ পর্যন্ত যত বই প্রকাশিত হয়েছে, তার একটি তালিকাসূচি করতে চাই। এছাড়া নজরুল রচনাবলির ডিজিটালাইজড সংস্করণ করার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান।
তিনি বলেন, এটি নজরুল রচনার ডিজিটাল আর্কাইভ হবে এবং তা শিক্ষার্থী, গবেষক ও সর্বসাধারণের কাজে আসবে। তবে এক্ষেত্রে কেন্দ্রের পরিচালনা পরিষদের সম্মতি ও বাজেট প্রাপ্তির ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। নজরুলবিষয়ক একটি গবেষণা পত্রিকা চালু করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
২০১৯ সালের পর শূন্য নজরুল চেয়ার : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে উচ্চতর গবেষণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উদ্যোগে নজরুল চেয়ার চালু করা হয়। এই চেয়ারের প্রথম দায়িত্ব পালন করেন নজরুল গবেষক ও জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম। সর্বশেষ বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম লুৎফর রহমান এ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি নজরুল চেয়ারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর থেকে নজরুল চেয়ারে কোনো স্থায়ী অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব নিয়ে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক নজরুলচর্চায় গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ডাকসু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মোসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ যুগান্তরকে বলেন, ‘নজরুলবর্ষ’ উদ্যাপন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও তা এখনো শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক হয়ে ওঠেনি। নজরুলকে সামনে রেখে কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সীমিত প্রকাশনার উদ্যোগ দেখা যায়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা, পাঠচক্র গড়ে তোলা বা সৃজনশীল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো কর্মসূচি খুবই কম। ফলে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে না।
নজরুল গবেষণাকেন্দ্রের কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, কেন্দ্রটি সীমিত সামর্থ্যওে নিয়মিত সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করছে এবং সেখানে শিক্ষার্থীদের গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়। বরাদ্দ বাড়ানো গেলে এই কেন্দ্র থেকে আরও অনেক মানসম্মত গবেষণা ও প্রকাশনা বের করা সম্ভব। মোসাদ্দিকের মতে, নজরুলচর্চার পরিসর বাড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের আরও আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
গবেষণাকেন্দ্র সক্রিয় করার আশ্বাস : গবেষণাকেন্দ্র ও নজরুল চেয়ার সচল প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী যুগান্তরকে বলেন, নজরুল গবেষণাকেন্দ্র ও নজরুল চেয়ারসহ যেসব চেয়ার দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় বা শূন্য রয়েছে, সেগুলোতে দায়িত্ব প্রদান এবং নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমরা কাজ করছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এগুলোকে কীভাবে সক্রিয় করা যায় এবং নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করা যায় তা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি।
বাংলা বিভাগে নজরুল পাঠের বিবর্তন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাঠ ও পঠনসংক্রান্ত ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও বিবর্তিত। ২০১৩ সালের আগে ঢাবির বাংলা বিভাগে নজরুল পাঠের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ বা স্বতন্ত্র কোর্স ছিল না। ১৯২১ সালে যাত্রা শুরু করা বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন নজরুলচর্চা ও পাঠ একটি বড় সিলেবাসের অংশ হিসাবে অবহেলিত ছিল।
গ্র্যাজুয়েশনের মোট নম্বরের মধ্যে নজরুলের জন্য নামমাত্র নম্বর বরাদ্দ ছিল। ২০১৩ সালে বাংলা বিভাগে জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ ১০০ নম্বরের স্বতন্ত্র কোর্স চালু করা হয়। ফলে প্রথমবারের মতো বিভাগীয় পাঠ্যক্রমে নজরুল আলাদা একাডেমিক গুরুত্ব লাভ করেন। যদিও মাস্টার্স ও অনার্স মিলিয়ে মোট ২০০ নম্বরের কোর্স চালুর দাবি রয়েছে।
