আক্রান্ত শিশুদের ডেঙ্গুতেও বাড়ছে ঝুঁকি
নিয়ন্ত্রণের বাইরে হাম, মৃত্যু হাজার ছুঁইছুঁই
হামে আক্রান্ত তিন বছরের রিহাদের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিচ্ছেন মমতাময়ী মা। শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না হামের প্রাদুর্ভাব। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা ও সিলেট বিভাগে হামে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হাজারের কাছাকাছি (৯৯১ জন) পৌঁছেছে, যার বেশির ভাগই শিশু। অন্যদিকে ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুজ্বর নিয়ে ৯৮৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর ডেঙ্গু রোগী ৪১ হাজার (৪১,০৩২) ছাড়িয়েছে। মারা গেছেন ১১৩ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে আউটব্রেক (প্রাদুর্ভাব) আকারে হাম ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ টিকা ক্যাম্পেইনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও অত্যন্ত সংক্রামিত রোগটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর মধ্যে দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণেও সমন্বিত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ফলে হামে আক্রান্ত কিংবা হাম থেকে মাত্র সেরে ওঠা শিশুরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তারা বেশি নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ছে। এতে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ছে।
সরকারি হিসাবে দেশজুড়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৯৯১ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত হামের টিকাবিষয়ক আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটির (আইসিসি) সভায় হামে আক্রান্তদের বয়স নিয়ে বলা হয়, আক্রান্ত রোগীর ১০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম। ৭৪ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৫৯ মাস। ৫ থেকে ১০ বছর বয়স ১৪ শতাংশের। বাকি ২ শতাংশের বয়স ১০ থেকে ১৪ বছর বা এর বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৮৪৩ জন। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৫ জনের হামের উপসর্গ থাকা রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। ২৪ ঘণ্টায় ৭৪ জনসহ এ পর্যন্ত হামে নিশ্চিত আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ হাজার ৬৪১ জন। ১৫ মার্চ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত হাম উপসর্গে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ২১৪ জন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯২১ জন। বর্তমানে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ৫ হাজার ২৯৩ রোগী ভর্তি রয়েছেন।
ডেঙ্গুর সংক্রমণও ঊর্ধ্বমুখী : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের শনিবার সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৩২ জনে। মারা গেছেন ১১৩ জন। চলতি সেপ্টম্বরের ৪ দিনে ডেঙ্গু নিয়ে ৫ হাজার ১৮৬ জন অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২৯৭ জন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর আগের মাসে আগস্টে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। এছাড়া জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন ভর্তি হন। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে হাসপাতালে ভর্তি রোগী বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। জুলাইয়ের আগে জুনে ভর্তি হন ২ হাজার ৯০৭, তার আগে মে মাসে ৭১৪, এপ্রিলে ৬৪০, মার্চে ৩৫৩, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ এবং জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ জন ভর্তি হন। ডেঙ্গু নিয়ে বর্তমানে ভর্তি আছেন ২ হাজার ৭৪০ জন।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, বৃষ্টিপাতের মৌসুমে অর্থাৎ জুলাই থেকেই ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক হাসপাতালে শয্যা খালি নেই, ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায়ও বিছানা পেতেছেন রোগী ও স্বজনরা। এ বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন। ডেঙ্গু নিয়ে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শও দিয়ে আসছিলেন।
এদিকে মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ায় সমালোচনা শুরু হয়। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য বিভাগ জরুরি ভিত্তিতে দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে বিশেষ গণটিকা শুরু করে। ছয় থেকে ৫৯ মাস বা পাঁচ বছর বয়সি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। ১২ এপ্রিল কার্যক্রম শুরু হয় চার সিটি করপোরেশন এলাকায়। ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগ, যা শেষ হয় ২০ মে। টিকাদানের ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে অ্যান্টিবডি তৈরি এবং হাম নিয়ন্ত্রণে আসার কথা থাকলেও সেটি হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছর ১ কোটি ৯৬ লাখ ৬১ হাজারের বেশি শিশু টিকা পেয়েছে। যদিও ক্যাম্পেইনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন। সেই হিসাবে টিকার কাভারেজ ১০৯ শতাংশ। ক্যাম্পেইনে দেশের শতভাগের বেশি শিশু হামের টিকা পেয়েছে বলে সরকার দাবি করলেও তাতে দ্বিমত প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও টিকার পরিকল্পনা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস যুগান্তরকে বলেন, জাতীয় হামের টিকা ক্যাম্পেইনের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পরও কিছু শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এ কারণে রুটিন টিকাদানের পাশাপাশি ‘মপআপ ও ক্যাচআপ’ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার বাইরে আরও টিকা দেওয়া হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, কোনো শিশুই যেন টিকার বাইরে না থাকে।
তিনি বলেন, ছয় মাসের কম এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুর মধ্যেও হাম শনাক্ত হচ্ছে। তাই আরও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে নতুন করে একটি স্বল্পমেয়াদি টিকা ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অতিরিক্ত টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। আশা করছি, দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে টিকা পাওয়া নিশ্চিত হলে দ্রুতই নতুন ক্যাম্পেইন শুরু করা সম্ভব হবে।

