উপেক্ষিত নজরুল চর্চা
চার দশকেও ‘নজরুল অধ্যাপক’ পায়নি চবি
Advertisement
রেফায়েত উল্লাহ রূপক, চবি
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) বাংলা বিভাগে ‘নজরুল অধ্যাপক’ পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল ১৯৮৪ সালের আগে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সৃষ্ট এ পদটি ছিল অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের জন্য। তবে পদটি সৃষ্টির পর অধ্যাপক আহমদ শরীফ ছাড়া আর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। চার দশক ধরে পদটি কার্যত শূন্য পড়ে আছে। যোগ্য ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে তথ্য মিলেছে। অন্যদিকে, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত নজরুল গবেষণাকেন্দ্র থেকে একজনকে ‘নজরুল অধ্যাপক’ করার কথা থাকলেও ১৯৯২ সালের পরে আর কেউ নিয়োগ পাননি। তাছাড়া কেন্দ্রটিতে নজরুলকে নিয়ে নেই কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা। ২৫ বছরে মাত্র তিনটি গবেষণার তথ্য জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউজিসির সৃষ্ট নজরুল অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য একটি বিধি প্রণয়ন করা হয়। বিধি অনুযায়ী, কলা অনুষদের ডিন বাংলা বিভাগের দুজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের সঙ্গে পরামর্শ করে একজনকে এ পদে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানাবেন। ১৯৮৪ সালে ওই পদে যোগ দেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ। ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে দুটি ‘নজরুল বক্তৃতা’ দেন তিনি। এ দুটি বক্তব্য ১৯৯০ সালে ‘একালে নজরুল’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এরপর এ পদে আর কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
জানা যায়, নজরুল গবেষণাকেন্দ্রের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত হয় সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন অধ্যাপক ‘নজরুল অধ্যাপক’ হিসাবে গণ্য হবেন। পরে অধ্যাপক দিলওয়ার হোসেন ও অধ্যাপক আলাউদ্দিন আল আজাদ নিয়োগ পেয়েছিলেন পদটিতে। ১৯৯২ সালের পর আর কেউ এ পদে নিয়োগ পাননি। তবে ইউজিসির ‘নজরুল অধ্যাপক’ ও গবেষণাকেন্দ্রের ‘নজরুল অধ্যাপক’ পদটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নজরুল গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ১২ জন পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন। কেন্দ টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ‘নজরুল অধ্যাপক’ পদে নিয়োগ না দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল বিষয়ে গবেষণা, অধ্যাপনা ও গবেষণা তত্ত্বাবধানের সঙ্গে যুক্ত যোগ্য ব্যক্তি থাকলেও বিগত প্রশাসনগুলো এ পদে কাউকে নিয়োগ দেয়নি।
নজরুল গবেষকের আকাল : বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, নজরুল গবেষণাকেন্দে সাহিত্য, সংগীত, জীবনী, গ্রন্থাগার, প্রকাশনা ও সংগ্রহশালা এই ছয়টি বিভাগে গবেষণা পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সাহিত্য বিভাগে নজরুল সাহিত্য, সংগীত বিভাগে নজরুলের সংগীত এবং জীবনী বিভাগে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণার কথা রয়েছে। গ্রন্থাগারে নজরুল-রচনাবলি এবং নজরুল-সম্পর্কিত গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকা সংরক্ষণ; প্রকাশনা বিভাগে নজরুল গবেষণাকেন্দে র পত্রিকা ও গবেষণাকর্ম প্রকাশ এবং সংগ্রহশালা বা আর্কাইভে নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিকর্মের সঙ্গে জড়িত উপাদান সংরক্ষণের উদ্যোগ রয়েছে।
জানা যায়, প্রতি বছর কেন্দে র উদ্যোগে একটি নজরুলবিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধ গ্রন্থাকারে প্রকাশেরও ব্যবস্থা করা হয়। তবে এ পর্যন্ত ১৯৯১ এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও অক্টোবরে মাত্র তিনটি নজরুল গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
কেন্দে র প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে প্রথম তিনটি বিভাগের জন্য একজন করে গবেষণা কর্মকর্তা এবং পিএইচডি ও এমফিল বৃত্তির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় গবেষক থাকার কথা। কিন্তু গবেষণাকেন্দ্রে কোনো পিএইচডি বা এমফিল গবেষক নেই। পরিচালক ও তিনজন কর্মচারী দিয়ে চলছে কেন্দ টির কার্যক্রম। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই তাদের।
উদ্যোগ নিতে প্রস্তুত কর্তৃপক্ষ : নজরুল অধ্যাপক পদে নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি ড. মোহাম্মদ আনোয়ার সাঈদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীতিমালার আলোকে ব্যবস্থা নিতে বললে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। এ ব্যাপারে আমরা প্রস্তুত আছি।’
নজরুল গবেষণাকেন্দে র পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন বলেন, ‘বিগত সময়ে নজরুল অধ্যাপক হিসাবে কাউকেই নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এর কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। হয়তো তারা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেননি। না হয় এ পদের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শের কাউকে পাননি। এখন সময় এসেছে এ পদে যোগ্য কাউকে পদায়ন করার।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, ‘আমরা এ বিষয়ে তথ্য নিয়ে অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
