পুলিশের তদন্তে মিলছে অপরাধের তথ্য
কক্সবাজার সৈকত ঘিরে বিদেশি প্রতারকচক্রের আস্তানা
জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাইরে থেকে দেখলে পর্যটকদের থাকার সাধারণ রিসোর্ট, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে ভিন্ন চিত্র। একটি হলরুমে সারিসারি ডেস্ক কম্পিউটার ও মনিটর। পাশে থাকা কক্ষগুলো করা হয়েছে সাউন্ডপ্রুফ। শত শত আইফোনও রয়েছে সেখানে। নিরাপত্তা থেকে শুরু করে জনবল নিয়োগসহ ব্যবস্থাপনার বড় অংশও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ ও ইনানি এলাকায় তিনটি রিসোর্ট ও একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে এমন একটি গোপন আস্তানা গড়ে তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চীন ও তাইওয়ানের ২৫০ থেকে ৩০০ জন নাগরিক এই আস্তানা গড়ে তোলে। পুলিশের দীর্ঘ নজরদারিতে বিষয়গুলো সামনে এসেছে। শুধু এই চক্রটি নয়, বিভিন্ন রিসোর্টেই মিলছে কম্পিউটার ল্যাব ও সাউন্ডপ্রুফ থাকার তথ্য। এসব পরিচালনা করে বিদেশিরা।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মেরিন ড্রাইভ ও ইনানি এলাকায় অবস্থানকারী বিদেশিদের ব্যাপারে প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে। অনলাইনে আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গত মার্চে বিভিন্ন সময়ে এসব বিদেশি বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এপ্রিল থেকে মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, অর্কিড ব্লু রিসোর্ট ও ইলিয়াস ব্রাদার্স আবাসিক ভবন ভাড়া নেওয়া হয়। এরপর স্থাপনাগুলোর পুরোনো সেটআপ বদলে নতুন করে সাজানো হয়। নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্ন জনবলও নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়।
পুলিশের বিশেষ শাখার একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকেই বিদেশিদের কর্মকাণ্ড নজরে আসলে শুরু হয় তথ্য সংগ্রহ ও অনুসন্ধান। তদন্তে জানা যায়, বাবর আলী নাম ব্যবহার করে একজন চীনা নাগরিক এসব স্থাপনা ভাড়া নিয়েছিলেন। পরে তার প্রকৃত নাম ‘ঝান ইউয়ান ফান’ বলে জানা যায়। তিনি ‘জিন শিন’ নামে একটি নির্মাণ কোম্পানি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার কাজের কথা জানান। কিন্তু পুলিশ অনুসন্ধান করে বাংলাদেশে ওই নামে কোনো বৈধ নির্মাণ কোম্পানির অস্তিত্ব পায়নি বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশিরা বাংলাদেশে অবস্থানের উদ্দেশ্য, ভিসা এবং তাদের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সন্তোষজনক কাগজপত্রও দেখাতে পারেননি।
সৈকত ঘিরে বিদেশিদের আস্তানা গড়ার ব্যাপারে তথ্য দিলেন ইনানি ড্রিম হলিডে রিসোর্টের ম্যানেজার এমদাদুল হক। তিনি বলেন, গত বছরের ১৫ জুন থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত চীনের নাগরিকরা রিসোর্ট ভাড়া নেন। তারা সাধারণ পর্যটক ও বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত পরিচয়ে রিসোর্ট বুক করেন। বিদেশিরা হোটেলে থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ীই প্রশাসনকে আমরা জানাই। তবে তারা যে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নানা কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে, তা জেনে আমরা উদ্বিগ্ন।
রিসোর্টে কম্পিউটার ল্যাব ও সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ : রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা গেছে। সেখানে একটি হলরুমে তৈরি করা হয় কম্পিউটার ল্যাব। বসানো হয় ৫০টি মনিটর ও ৪৪টি সিপিইউ। রাখা হয় ৩০টি কিবোর্ড, দুটি ল্যাপটপ, দুটি প্রিন্টার, ৪০টি মাউস, একটি আইপিএস ও ২৪টি কানেকশন বোর্ড। এর সঙ্গে ছিল ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন। জব্দ তালিকা অনুযায়ী, এগুলোর অধিকাংশই পুরোনো মডেলের। রিসোর্টের অন্য অংশে তৈরি করা হয় ছয়টি সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ। পর্যটকদের থাকার রিসোর্টে কেন এমন কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন বড় প্রশ্ন। এসব কক্ষে কী ধরনের কার্যক্রম চলত, কারা ব্যবহার করত এবং কম্পিউটার ল্যাবের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
বিদেশিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ার পর গত ২৫ আগস্ট রিসোর্ট ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় অভিযান চালায় পুলিশ। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকদের অনেকে পেছনের সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান। মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টে পড়ে ছিল আইফোনসহ ওইসব ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। জব্দ করা আলামতের মধ্যে চীনা পুলিশের র্যাংক ব্যাজ, চীনের জাতীয় পতাকা এবং পুলিশের লোগোযুক্ত একটি টাইও রয়েছে। এসব জিনিস কেন রিসোর্টে রাখা হয়েছিল, কারা কী কাজে ব্যবহার করত, তা নিয়েও তদন্ত চলছে।
দূতাবাস ও সিটিটিসির তদন্ত : অভিযানের পরদিন ২৬ আগস্ট চীনা দূতাবাসের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরে সিটিটিসির ডিআইজির নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি দলও মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট পরিদর্শন করে। সিটিটিসির সদস্যরা কম্পিউটার ল্যাব, সাউন্ডপ্রুফ কক্ষ ও জব্দ করা সরঞ্জাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। পুলিশের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনলাইনভিত্তিক সংঘবদ্ধ আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য মিলেছে।
চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিক গ্রেফতার : দীর্ঘ তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারির পর বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার হোটেল সি-প্যালেসে অভিযান চালিয়ে পাঁচ চীনা ও এক তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে শত শত আইফোনসহ বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম পাওয়া যায়। শুক্রবার তাদের আদালতে পাঠানো হলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মো. অহিদুর রহমান বলেন, গোয়েন্দা নজরদারি ও দীর্ঘ তদন্তের পর তাদের গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে তারা বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার কথা জানান। পরে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে ঢাকাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষায়িত তদন্ত দল বিষয়টি খতিয়ে দেখে। পরে চীনা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের পর সামনে আসে তারা আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা চক্রের সদস্য।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি স্টারলিংক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনলাইন শেয়ারবাজার, জুয়া ও বিভিন্ন কারেন্সি-সংক্রান্ত প্রতারণায় জড়িত ছিল। তারা যাতে বাংলাদেশ ত্যাগ না করতে পারে, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রামু থানায় করা মামলার তদন্ত চলছে।
সাত ধরনের প্রতারণার সন্দেহ : তদন্তে কৃত্রিম বাজার বিশ্লেষণ, প্রলোভন, ক্লোন বা ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি বা ব্যবহার, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ জমা নেওয়া, এক্সিট ফ্রড ও অর্থ আত্মসাতের মতো প্রতারণার কৌশলের কথা উঠে এসেছে। তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারে অবস্থান করে চক্রটি শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে থাকতে পারে।
