মন্ত্রী-এমপিসহ আওয়ামী প্রভাবশালীদের দুর্নীতি
সম্পদের খোঁজে দেশে বিদেশে তৎপর দুদক
দুর্নীতির সম্পদ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে-দুদক চেয়ারম্যান
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে গড়া অবৈধ সম্পদের তথ্য পেতে এবার দেশ-বিদেশে একযোগে তৎপর হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী ছিলেন-এমন সাবেক মন্ত্রী, আমলা, সংসদ-সদস্য ও ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান-তদেন্তে গতি এসেছে। দেশে গড়া অবৈধ সম্পদের নথি তলবের পাশাপাশি বিদেশে থাকা অর্থ, ব্যবসা ও সম্পদের তথ্য পেতে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চাওয়া হচ্ছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য থেকে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও স্ত্রী রুকমিলা জামানের সম্পদের রেকর্ড এবং এফবিআই-এর তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছে দুদক। নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও সংশ্লিষ্টদের সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সাবেক মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নতুন দলনেতা নিয়োগ, সাবেক মুখ্যসচিব আহমদ কায়কাউস ও সাবেক সংসদ-সদস্য আলিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান-তদন্তে নতুন অভিযোগ যুক্ত করা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ওয়াকিটকি ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে দুদকের চেয়ারম্যান বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘দুর্নীতি কমিয়ে আনতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। দেশের ভেতরে ও বাইরে যেখানেই দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের সন্ধান পাওয়া যাবে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা থাকবে। আমরা চাই, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নেওয়া এসব পদক্ষেপের সুফল দেশের মানুষ ভোগ করুক। সে লক্ষ্যেই কমিশন কাজ করছে। ইনশাআল্লাহ, আপনারা সামনে এর ইতিবাচক ফল দেখতে পাবেন।’
এফবিআই-এর নথি দুদকে : সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও স্ত্রী রুকমিলা জামানের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ব্যাংক, ব্যবসা ও সম্পদের রেকর্ড চাওয়াসহ অপরাধলব্ধ সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের বিষয়েও দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ। দুদকের মানি লন্ডারিং-২ শাখার নথি অনুযায়ী, এ বিষয়ে পাঠানো পারস্পরিক আইনগত সহায়তার অনুরোধ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কার্যালয় ২০২৫ সালের ১৯ মে গ্রহণ করে। আবেদনে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও রুকমিলা জামানের ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা ও সম্পত্তির রেকর্ড চাওয়া হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যে থাকা অপরাধলব্ধ সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের বিষয়েও সহযোগিতা চাওয়া হয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে এফবিআই-এর তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদন ও সম্পদের রেকর্ড পাঠানো হয়েছে। একটি সিডিতে এসব নথি দুদকের কাছে এসেছে। তবে চাওয়া সব তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বাকি রেকর্ড ও তথ্য পরবর্তী সময়ে দেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেখছেন। এ বিষয়ে দেশটির একজন সরকারি কৌঁসুলি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ দায়িত্ব পালন করছেন। দুদকের হাতে আসা নথি এখন চলমান অনুসন্ধান-তদন্তে যাচাই করা হবে। সম্পদের উৎস, মালিকানা ও অর্থের গতিপথ সম্পর্কে এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে এফবিআই থেকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি কবে এসেছে, তাতে কী তথ্য রয়েছে কিংবা কত সম্পদ চিহ্নিত হয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি দুদক। যুক্তরাষ্ট্রে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের কোন সম্পদ এরই মধ্যে জব্দ বা বাজেয়াপ্ত হয়েছে, তাও জানানো হয়নি। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকার একটি আদালত সাইফুজ্জামান চৌদুরী জাবেদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্টদের ৭ দেশে থাকা ১ হাজার ৮২৪ কোটি ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯০৫ টাকার সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পত্তির ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছিল ৪৩৬ কোটি ৮৮ লাখ ৬৫ হাজার ২৪২ টাকা।
অবরুদ্ধ নাসা নজরুলের বিদেশি সম্পদ : বিদেশে সম্পদের বিষয়ে আরেকটি পদক্ষেপ নিয়েছে দুদক। নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, স্ত্রী নাসরিন ইসলামসহ সংশ্লিষ্টদের সম্পত্তি আইল অব ম্যান-এ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। দুদকের পাঠানো পারস্পরিক আইনগত সহায়তার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আইল অব ম্যানের কর্তৃপক্ষ এ ব্যবস্থা নেয়। এ-সংক্রান্ত ১৬১ পৃষ্ঠার মূল রেকর্ডও দুদকের হাতে এসেছে। নজরুল ইসলাম মজুমদার, নাসরিন ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং ওয়ান প্রপার্টি লিমিটেডের বিষয়ে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। আইল অব ম্যান কর্তৃপক্ষ কার্যক্রম সম্পন্ন করে রেকর্ডপত্র পাঠিয়েছে।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশের তদন্তের অগ্রগতি জানাতে হবে। ২০২৭ সালের ২০ মের মধ্যে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন আইল অব ম্যানের আদালতে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ১ মের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য পাঠাতে দুদককে বলা হয়। নির্ধারিত সময়ে অগ্রগতি জানানো না হলে সম্পদ জব্দের আদেশ প্রত্যাহারের বিষয়টি আদালত বিবেচনা করতে পারে। ব্রিটিশ কোম্পানি নিবন্ধকের অনলাইন নথি অনুযায়ী, ওয়ান প্রপার্টি লিমিটেড আইল অব ম্যানে নিবন্ধিত। নথিতে নাসরিন ইসলাম ও নজরুল ইসলাম মজুমদারকে প্রতিষ্ঠানটির সুবিধাভোগী মালিক দেখানো হয়েছে। কোম্পানিতে দুজনেরই ২৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ও ভোটাধিকার রয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নজরুলের বিরুদ্ধে বৈধ আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৭৮১ কোটি ৩১ লাখ ২২ হাজার ৪৫৪ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক।
ইয়াফেসের অনুসন্ধানে নতুন দলনেতা : সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানেও গতি এসেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চলমান অনুসন্ধানে নতুন দলনেতা নিয়োগ করা হয়েছে। দুদকের নথিতে অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ইয়াফেস ওসমানের ছেলে ইশরার ওসমানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে সরকারি ঠিকাদারি কাজ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় জীবপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে বিধিবহির্ভূত নিয়োগ, ছুটিতে থাকা দুই কর্মকর্তাকে বড় দুটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক করা এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও তাতে রয়েছে। আগের অনুসন্ধান দলের দলনেতা মোহাম্মদ সিরাজুল হক অবসর-পরবর্তী ছুটিতে যাওয়ায় তার স্থলে উপপরিচালক মো. রাশেদুল ইসলামকে নতুন দলনেতা করা হয়েছে। নতুন দলনেতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান শেষ করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কায়কাউস-নাসিমের ফাইলেও নতুন অভিযোগ : সাবেক মুখ্যসচিব আহমদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পেয়েছে দুদক। অভিযোগটি যাচাই করে দেখা যায়, একই ধরনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই দুদকের মানি লন্ডারিং অনুবিভাগে অনুসন্ধান চলছে। ফলে নতুন অভিযোগটিও চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাবেক সংসদ-সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জমি দখল, নিয়োগ বাণিজ্য, দলীয় পদ বাণিজ্য, অর্থ আত্মসাৎ ও হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। তার বিরুদ্ধে নোয়াখালীর সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে তদন্ত চলছে। নতুন অভিযোগটিও সেই তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পুরোনো তদন্ত চলার সময় নতুন অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটি আলাদা করে না রেখে বিদ্যমান অনুসন্ধান-তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করার পথেও এগোচ্ছে দুদক।
ওয়াকিটকি ক্রয়েও আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান : শুধু সাবেক মন্ত্রী, আমলা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিই নন, সরকারি ক্রয়েও নজর দিচ্ছে দুদক। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ওয়াকিটকি ক্রয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এ অভিযোগ অনুসন্ধানে উপপরিচালক মো. আহসানুল কবীর পলাশকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা এবং পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-১)-কে তদারককারী কর্মকর্তা নিয়োগ করেছে কমিশন। দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে ৩ সেপ্টেম্বর জারি করা চিঠিতে বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান শেষ করে সুনির্দিষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। মতামত বা সুপারিশের পক্ষে প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্রও চিহ্নিত করে সংযুক্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুদক সূত্র জানায়, এ অভিযোগের বিষয়ে এর আগে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর স্মারক জারি করা হয়েছিল। পরে ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি অনুসন্ধানের জন্য এনফোর্সমেন্ট রিকুইজিশন-সংক্রান্তক নথি তৈরি হয়। এবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগের মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে আনা হলো।

