ডিবি হারুনের অঢেল সম্পদ
বাবা-ভাইয়ের নামে কিনে পরে নিতেন নিজের নামে
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ ও তার ছোট ভাই এবিএম শাহারিয়ারের বিরুদ্ধে প্রায় ৩৮ কোটি ২৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এর মধ্যে হারুনের প্রায় ২০ কোটি এবং শাহারিয়ারের ১৮ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। বুধবার এ দুই মামলার চার্জশিট অনুমোদন করেছে দুদক। দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজীর আহমেদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর দুদকের ঢাকা-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দুটি মামলা করা হয়। দুই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন। দুদকের তদন্তে হারুনের নামে ২১ কোটি ২৮ লাখ ৯ হাজার ৬০৫ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। বিপরীতে ব্যয় বাদ দিয়ে তার বৈধ ও সঞ্চয়যোগ্য আয় ১ কোটি ২৯ লাখ ১৫ হাজার ৬ টাকা। ফলে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯ কোটি ৯৮ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯৯ টাকা।
দুদক জানায়, হারুনের সম্পদের তালিকায় রয়েছে দক্ষিণখানের আশিয়ান সিটিতে ৫ কাঠার প্লট ও প্রায় ৮২ একর জমি, বনানীতে ১০ দশমিক ৩৬ শতাংশ জমি ও ভবন, উত্তরা সেক্টর-৩-এ ৮ তলা বাড়ি, পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির ৩ দশমিক ৬৮ কাঠার প্লট এবং কক্সবাজার ও টেকনাফের জমি। বনানীর সম্পত্তির মূল্য ৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩ মার্চ হারুনের বাবা আবদুল হাসেমের নামে জমিটি কেনা হয়। কিন্তু ওই সম্পত্তি কেনার মতো তার বাবার আর্থিক সক্ষমতার তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি। মাত্র ১৮ দিনের মাথায় ২১ মার্চ হেবা দলিলের মাধ্যমে জমিটি হারুনের নামে হস্তান্তর করা হয়। উত্তরার ২৬/এফ, রোড-২০-এর ৮ তলা বাড়িতে হারুনের মালিকানা ৫০ শতাংশ। জমি ও ভবন নির্মাণে তার অংশের মোট বিনিয়োগ ৫ কোটি ২৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫০ টাকা। আয়কর নথি অনুযায়ী তার অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৯ কোটি ২১ লাখ ১ হাজার ৬৯৩ টাকা।
হারুনের ব্যাংক হিসাবেও বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুদক। তদন্ত নথিতে বলা হয়েছে, এসব লেনদেনের কারণে ২০২৪ সালের আগস্টে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসএআর) দাখিল করে।
দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সময় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। সম্পদের প্রকৃত উৎস ও মালিকানা আড়াল করতে মা-বাবার নামে সম্পদ কেনা, পরে নিজের নামে হস্তান্তর এবং ব্যাংকে অস্বাভাবিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে।
ভাইয়ের সম্পদ ১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকার : হারুনের ছোট ভাই এবিএম শাহারিয়ার প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দুদকের তদন্তে তার নামে ১৮ কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৫ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে স্থাবর সম্পদের মূল্য ৭ কোটি ৮১ লাখ ৪৪ হাজার ৩০৭ টাকা। সাভার, রূপগঞ্জ, গুলশান ও কিশোরগঞ্জে তার জমি রয়েছে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট রিসোর্ট অ্যান্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডে তার বিনিয়োগ ৬ কোটি ১৬ লাখ ৩৫৭ টাকা। অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি ৯৫ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৮ টাকা। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ করবর্ষ পর্যন্ত শাহারিয়ারের মোট আয় ৬৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩০৪ টাকা। ব্যয় হয়েছে ১৬ লাখ ৪৭ হাজার ১৭৪ টাকা। ফলে সম্পদ অর্জনের বৈধ উৎস ছিল ৪৮ লাখ ৯০ হাজার ১৩০ টাকা। এর বিপরীতে সম্পদের মূল্য ১৮ কোটি ৭৬ লাখ ৯৭ হাজার ১৮৫ টাকা। ফলে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৭ হাজার ৫৫ টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
হারুনের কাছ থেকে ভাইয়ের নামে ১,৮৫০ শতাংশ জমি : দুই ভাইয়ের সম্পদের মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রও পেয়েছে দুদক। ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট মিঠামইন সাবরেজিস্ট্রি অফিসের হেবা দলিলের মাধ্যমে শাহারিয়ার তার ভাই হারুনের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৫০ শতাংশ জমি পান। ওই সম্পদের মূল্য শাহারিয়ারের মামলায় ধরা হয়নি। হারুনের বিরুদ্ধে করা পৃথক মামলায় তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুদকের তদন্তে বলা হয়েছে, হারুন ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ ভাইকে হেবা করেন এবং তাকে সম্পদ অর্জনে সহযোগিতা করেন। একই সঙ্গে দুই ভাই পরস্পর যোগসাজশে সম্পদের প্রকৃত উৎস গোপন করতে তা হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর করেছেন।
চার্জশিটে হারুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১), ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। শাহারিয়ারের বিরুদ্ধে এসবের পাশাপাশি দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় অভিযোগ করা হয়েছে।

