‘দৈত্য’ কাঠবিড়ালীতে মুগ্ধ প্রকৃতিপ্রেমীরা
রেমা-কালেঙ্গা বন
Advertisement
রোকন উদ্দিন লস্কর ও খন্দকার আলাউদ্দিন, চুনারুঘাট
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গহিন অরণ্যে ‘দৈত্য’ কাঠবিড়ালী -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘন জঙ্গল, উঁচু উঁচু গাছ। চারদিকে সুনসান নীরবতা। পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সূর্যের রশ্মি। এমন পরিবেশে ঘন সবুজের আড়ালে যেন লুকিয়ে থাকে অন্য এক জগৎ। এর মধ্যে হঠাৎ গাছের মগডালে চোখে পড়ে অস্বাভাবিক বড় এক কাঠবিড়ালী। লম্বা লেজ আর বিশাল দেহ নিয়ে ডাল থেকে ডালে ছুটে বেড়াচ্ছে প্রাণীটি। সম্প্রতি হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গহিন অরণ্যে এমন দৃশ্যই ধরা পড়ে।
প্রাণীটি সাধারণ কাঠবিড়ালী নয়। এটি মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেল-বাংলাদেশে পাওয়া কাঠবিড়ালী প্রজাতির মধ্যে এটি অন্যতম বড়। বৈজ্ঞানিক নাম Ratufa bicolor। বিরল এই প্রাণীটিকে ফ্রেমবন্দি করেছেন শৌখিন বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী শাহেদ আহমেদ। ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পর প্রকৃতিপ্রেমীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও আনন্দ।
আকারেই আলাদা
মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর আকার। পূর্ণবয়স্ক প্রাণীর শরীরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। লেজও প্রায় শরীরের সমান লম্বা। ফলে মাথা থেকে লেজের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য এক মিটারের বেশি হতে পারে। ওজন প্রায় দুই কেজি পর্যন্ত হয়। কালো, বাদামি কিংবা লালচে-মেরুন রঙের শরীর এবং ঘন ঝোপালো লেজ প্রাণীটিকে অন্য কাঠবিড়ালী থেকে সহজেই আলাদা করে। গাছের মগডালে দ্রুত চলাচলের সময় লম্বা লেজটি ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গাছই যার ঘর
এই প্রাণীর জীবন অনেকটাই গাছকেন্দ্রিক। সাধারণত মাটিতে খুব কম নামে।
বড় ও পুরোনো গাছের ডালপালায় ঘুরে বেড়ায় এবং উঁচু গাছে পাতা ও ডাল দিয়ে বাসা তৈরি করে। বুনো ফল, বীজ, বাদাম ও গাছের কচি পাতা এদের প্রধান খাদ্য। এ কারণেই মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের অস্তিত্বের সঙ্গে রেমা-কালেঙ্গার পুরোনো প্রাকৃতিক বনের সম্পর্ক গভীর। বড় গাছ কমে গেলে শুধু এই কাঠবিড়ালীই নয়, আরও অনেক বৃক্ষনির্ভর প্রাণী খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটে পড়তে পারে।
বন রক্ষার তাগিদ
বন উজাড়, পুরোনো বৃক্ষ নিধন, মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও অবৈধ শিকার-এসব কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে। তাই বিরল এই কাঠবিড়ালীর দেখা পাওয়া যেমন আনন্দের, তেমনি এটি বন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেয়।
কালেঙ্গা বিট কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, রেমা-কালেঙ্গায় মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের উপস্থিতি বনের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের বিরল প্রাণীর অস্তিত্ব প্রমাণ করে, অভয়ারণ্যটি এখনো বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসাবে টিকে আছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্থানীয়দের সহযোগিতা প্রয়োজন।
হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সুবাস চন্দ্র দেব বলেন, বড় ও পুরোনো গাছ সংরক্ষণ ছাড়া জায়ান্ট স্কুইরেলের মতো প্রাণীকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। গহিন বন ও প্রবীণ বৃক্ষ কমে গেলে এসব প্রাণী একই সঙ্গে খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় হারাবে।
বন্যপ্রাণী প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, রেমা-কালেঙ্গায় বিরল মালয়ান জায়ান্ট স্কুইরেলের দেখা পাওয়া নিঃসন্দেহে সুখবর। বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সচেতন নাগরিকদের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
রেমা-কালেঙ্গার সবুজ অরণ্যে এই বিরল কাঠবিড়ালীর উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের আনন্দ দিয়েছে। তবে আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়িত্বও। কারণ ‘দৈত্য’ এই কাঠবিড়ালীর আসল নিরাপত্তা ক্যামেরার ছবিতে নয়-নিরাপদ, অক্ষত ও সবুজ অরণ্যের মধ্যেই।
