Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে উলটো মামলার আসামি

১৫ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে ৭ দিন কারাগারে ফাতেমা * ভাঙচুরের সাক্ষীরাই বলছেন ‘ঘটনা দেখিনি’ * ‘ভাঙচুর কে করেছে জানি না’-তদন্ত কর্মকর্তা

Advertisement

Icon

জসিম উদ্দিন, কক্সবাজার

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে উলটো মামলার আসামি

Advertisement

স্বামী হত্যার বিচার চেয়েছিলেন ফাতেমা বেগম। সেই মামলার এক আসামির পরিবারের করা মামলায় এখন উলটো কাঠগড়ায় তিনি। অভিযোগ ওঠেছে, সাজানো কথিত ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় ১৫ মাসের শিশুকে কোলে নিয়ে সাত দিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাকে। মায়ের অনুপস্থিতিতে চতুর্থ ও প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই মেয়েকে রাখতে হয়েছে এতিমখানায়।

অথচ যে স্বামী হত্যার মামলার পর এ পালটা মামলা, তদন্ত প্রতিবেদনে সেই হত্যাকাণ্ডের কোনো উল্লেখ নেই। নথিতে কাশেমকে ফাতেমার স্বামী হিসাবে উল্লেখ করা হলেও তার নিহত হওয়ার বিষয়টি বলা হয়নি। আবার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, ভাঙচুরের প্রমাণ পেলেও কারা তা করেছে, আমি জানি না।

ফাতেমার স্বামী মোহাম্মদ কাশেম ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোম এলাকায় নিহত হন। পরদিন ফাতেমা বাদী হয়ে মামলা করেন। এতে মো. রাসেলসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. সাইফুর রহমান আদালতে অভিযোগপত্র দেন। সেখানে ৪ নম্বর আসামি মো. রাসেলকে হত্যাকারীদের অন্যতম হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফাতেমার অভিযোগ, স্বামী হত্যার মামলা তুলে নিতে তাকে কয়েক দফা হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মহেশখালী থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেন তিনি। এরপর ফাতেমা ও তার পরিবারের আরও ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেন রাসেলের মা নূরজাহান বেগম। ওই মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হয় ফাতেমাকে।

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট নূরজাহান বেগম মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ করেন, ২৪ মে সকাল ৮টার দিকে ফাতেমাসহ সাতজন তাদের বাড়িতে হামলা চালান। ঘরবাড়ি ভাঙচুর, মারধর ও মালামাল লুটের অভিযোগও করেন তিনি। আদালতের নির্দেশে অভিযোগটি তদন্ত করেন মহেশখালী থানার এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম। গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর তিনি আদালতে প্রতিবেদন দেন। এতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের বদলে শুধু ‘তর্কবিতর্ক’ : ফাতেমার বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের শুরুতে বাদী-বিবাদীর মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ ও তর্কবিতর্কের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাশেম হত্যাকাণ্ডের কোনো উল্লেখ নেই। অথচ ওই হত্যাকাণ্ডই দুই পরিবারের বিরোধের মূল প্রেক্ষাপট। হত্যার মামলায় রাসেল আসামি এবং অভিযোগপত্রেও তাকে হত্যাকারীদের অন্যতম বলা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে ফাতেমা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে হামলা, ভাঙচুর, মারধর ও লুটপাটের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে যাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের বক্তব্য এর সঙ্গে মেলে না।

নূরুন্নাহার, মুন্নি আক্তার ও মোতাহারা বেগম বলেন, ২৪ মে রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুর বা লুটপাটের কোনো ঘটনা আমরা দেখিনি। তদন্ত কর্মকর্তা আমাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো জবানবন্দিও নেননি। কীভাবে তাদের নাম সাক্ষী হিসাবে এসেছে, সেটিও আমরা জানি না। স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম ও মোতাজ্জেম বেগমও একই কথা বলেন।

কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামাল বলেন, ২৪ মে রাসেলের বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা আমি জানি না। তবে কাশেম হত্যার পর ক্ষুব্ধ লোকজন ওই বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছিল বলে আমি শুনেছি। তার ধারণা, কাশেম হত্যা মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই ফাতেমার পরিবারের বিরুদ্ধে পালটা মামলাটি হয়ে থাকতে পারে।

‘ভাঙচুর কে করেছে, জানি না’ : তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘর ভাঙচুর ও মাটি কেটে নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছি। তবে কারা এসব করেছে, তা আমি জানি না। ঘুসের বিনিময়ে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এজাহার অনুযায়ী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

সাত দিন কারাগারে মা-শিশু : ৩১ আগস্ট ফাতেমা, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম ও বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসা ননদ নাসিমা আক্তারকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে রাশেদা ও নাসিমা জামিন পান। ফাতেমা ১৫ মাসের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে কারাগারে যান। তার অন্য দুই মেয়ে রাজমিন আক্তার ও মিশকাত জান্নাত যথাক্রমে চতুর্থ ও প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মায়ের অনুপস্থিতিতে তাদের দেখাশোনার কেউ না থাকায় কয়েকদিন তাদের এতিমখানায় রাখতে হয়।

এ অবস্থায় জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান লিগ্যাল এইডকে ফোন করে ফাতেমার জামিনের বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলেন। পরে লিগ্যাল এইডের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইন ফাতেমার জামিন মঞ্জুর করেন। ৭ দিন পর কারাগার থেকে বের হন তিনি।

ফাতেমা যুগান্তরকে বলেন, ‘স্বামী হত্যার বিচার চাওয়াই কি আমার অপরাধ?’ তিনি বলেন, স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তান নিয়ে দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় অন্যের বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর করার শক্তি, সামর্থ্য বা লোকবল আমার নেই।

মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সুলতান বলেন, ঘটনাটি আমার যোগদানের আগে ঘটেছে। তবে মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়ে পুলিশ কাউকে হয়রানি করে থাকলে ভুক্তভোগী আদালতের আশ্রয় নিতে পারেন। বিষয়টি জানালে আদালত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম