মান্দেব প্রণালি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি
আরও বাড়বে দেশের জ্বালানি অনিশ্চয়তা
বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র শঙ্কা
Advertisement
তুহিন তৌহিদ
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর সেটি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। আর এমনটি হলে তা হবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আরেকটি বড় ধাক্কা। জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে দাম। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলো।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার জেরে ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি ইতোমধ্যে বন্ধ করে রেখেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম চলতি সপ্তাহে আবারও প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। দামের এ ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে। এ অবস্থায় বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে তা জ্বালানি সরবরাহে আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ তেল-গ্যাসের বাণিজ্য হয়ে থাকে।
প্রশ্ন হলো-হুথিরা কি এ প্রণালি বন্ধ করার সক্ষমতা রাখে? আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত শুক্রবারই হুথি বাহিনী ইয়েমেনে লোহিত সাগরের পুরো উপকূল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। সাগরের যে সংকীর্ণ স্থানটি দিয়েই জাহাজগুলো প্রণালি থেকে বের হয়, সেখানে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করেছে ইরানসমর্থিত সশস্ত্র সংগঠনটি। আগের দিন বৃহস্পতিবার তারা বন্দরনগরী মোচার দখল নেয়। এটি ছিল ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকারের জন্য বড় ধাক্কা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের ঘটনা প্রবাহে হুথির এ জয় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
হুথিরা মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তা সৌদি আরব ছাড়া অন্য সব দেশের জন্য উন্মুক্ত বলে জানিয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেছে, ওয়াশিংটন যদি তাদের ওপর হামলা না চালায়, তবে তারা প্রণালিতে মার্কিন জাহাজ আটকাবে না। বাংলাদেশ সৌদি ও কাতার থেকেই বেশি জ্বালানি আমদানি করে থাকে। মান্দেব প্রণালি বন্ধ হওয়ায় এর প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মান্দেব প্রণালির করিডর বন্ধ হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হবে; তেল-গ্যাসের দাম আরও বেড়ে যাবে। বিশেষ করে, সৌদির জন্য এটি বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ, হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর এ প্রণালির ওপর নির্ভর করেই জ্বালানি তেল রপ্তানি করে আসছে সৌদি। তারা একটি পাইপলাইনের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের তেল-গ্যাস পশ্চিমাঞ্চলে নিয়ে মান্দেব প্রণালির মাধ্যমে রপ্তানি করে আসছে। সম্প্রতি পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনটিও ইরাকের একটি সশস্ত্র সংগঠনের হামলার জেরে বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাবে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে ইরাকের। বাগদাদ ইরানের সঙ্গে তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে।
সূত্র জানায়, মান্দেব প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ৩০ লাখ থেকে ৪০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলের বাণিজ্য হয়। এ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাঘাত ঘটলে এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলো সংকটে পড়বে। এতে এসব দেশে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে যাতায়াত ভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়বে। কারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। প্রতিটি জাহাজকে আফ্রিকার বন্দর হয়ে ঘুরে এশিয়ায় আসতে গিয়ে খরচ বেড়ে যাবে অনেকটাই। জাহাজের সমুদ্রযাত্রার সময় বাড়বে ১৫ থেকে ৩০ দিন। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় ইতোমধ্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। দেশের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সিংহভাগই আসত এ প্রণালি দিয়ে। আর এলএনজির প্রায় ৭০ শতাংশ আসত। বিকল্প হিসাবে বাব আল মান্দেব সেই জায়গা দখলের সমূহ সুযোগ ছিল। হুথির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা কমল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। এছাড়া সৌদি, কাতার, ইরানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি তেলের বড় ভোক্তা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ। ওই অঞ্চলের ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ (দেশভেদে) আমদানি করা জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে যায়। এ কারণে হরমুজের পর মান্দেব প্রণালি বন্ধ হলে তা হবে আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো ঘটনা।
হরমুজ ও সৌদি আরবে নতুন হামলা
সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজগুলোর ওপর নতুন হামলার ঘটনায় রোববার মধ্যপ্রাচ্যে উদ্বেগ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সৌদি তেল পাইপলাইনে হামলা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের অগ্রাভিযানের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বিঘ্ন আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব থেকে সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ায় সোমবার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন ব্যবসায়ীরা।
উপসাগরীয় অঞ্চলে সর্বশেষ ঘটনাগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও রোববার জানায়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় একটি জাহাজে প্রজেক্টাইলের আঘাত লেগেছে। এতে আগুন ধরে যায় এবং জাহাজের কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে হয়। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তাদের উপকূলের কাছে একটি ইরানি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাতের ঘটনায় একজন নিহত ও চারজন কর্মী আহত হয়েছেন।
এছাড়া সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান প্রদেশে হুথিদের কথিত সর্বশেষ আন্তঃসীমান্ত হামলায় বাড়িঘর ও একটি মসজিদের ক্ষয়ক্ষতির ভিডিও প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। এছাড়া হুথিরা পৃথকভাবে দাবি করেছে, তারা প্রতিবেশী একটি প্রদেশে সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে।
