Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

সরকারি ভাতার ১৭০৯ কোটি টাকা লোপাট

নেপথ্যে নগদের সাবেক এমডি তানভীর মিশুক

Advertisement

মহিউদ্দিন খান রিফাত

মহিউদ্দিন খান রিফাত

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নেপথ্যে নগদের সাবেক এমডি তানভীর মিশুক

Advertisement

সরকারি ভাতার টাকা লোপাটে ‘নগদ’-এর মাধ্যমে ভয়ংকর কারসাজির তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জালিয়াতি করে ২৪ হাজার ১৫৯ ভুয়া উদ্যোক্তা এবং ৬৪৮ ভুয়া ডিএসওর ওয়ালেট ঘুরিয়ে ৩৪ অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মাধ্যমে সরানো হয় ১ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। লোপাটের টাকা থেকে কেনা হয় ‘নগদ’-এর ৭৮৬ কোটি টাকার শেয়ার। এ ঘটনার নেপথ্যে নগদের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকসহ সংশ্লিষ্টদের তথ্য পেয়েছে দুদক।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি বিভিন্ন ভাতার ৩২ হাজার ৬৫০ কোটি ৭৬ লাখ ৪৮ হাজার ২৫৪ টাকা ‘নগদ’-এর মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে এক বা দুই সপ্তাহে অনেক ভাতাভোগী টাকা উত্তোলন করেননি। সেই ভাতাভোগীদের উত্তোলন না করা অর্থ সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ কারসাজিতে ২৪ হাজার ১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তা ওয়ালেট, ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসও এবং ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটর ব্যবহারের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুদক।

টার্গেট মৃত ও নিষ্ক্রিয় গ্রাহকের টাকা : দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সরকারি ভাতার টাকা ‘নগদ’-এর মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেটে ই-মানি হিসাবে পাঠানো হতো। বিভিন্ন কারণে কোনো গ্রাহক এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে টাকা উত্তোলন না করলে সেই অর্থ তার ওয়ালেটেই থাকার কথা। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, মৃত্যু, পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া কিংবা অন্য কারণে পড়ে থাকা এসব ই-মানি সফটওয়্যার জালিয়াতির মাধ্যমে ২৪ হাজার ১৫৯টি ভুয়া উদ্যোক্তার ওয়ালেটে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ওই ভুয়া উদ্যোক্তাদের ওয়ালেট থেকে অর্থ যায় ৬৪৮টি ভুয়া ডিএসওর ওয়ালেটে। সেখান থেকে আবার টাকা স্থানান্তর করা হয় ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে। দুদক জানায়, এসব লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৭০৯ কোটি ৩৮ লাখ ৫৪ হাজার ২২৯ টাকা ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট হিসাব থেকে বের করে আত্মসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আট প্রতিষ্ঠানের হাতে শত শত কোটি : এই অর্থ সরানোর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ৩৪টি অননুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটরের মধ্যে অন্তত আটটির নাম দুদকের নথিতে স্পষ্টভাবে এসেছে। এগুলো হলো-অ্যাস্থেটিক ডেভেলপমেন্ট, এআরএ ডেভেলপার, ডিজিটাল সেন্টার ডিস্ট্রিবিউশন, কল্লোল ডিস্ট্রিবিউশন, এলবি নিটওয়্যার, পাইনউড ডিস্ট্রিবিউশন, রহমান ডিস্ট্রিবিউশন ও ইউডিসি ডিস্ট্রিবিউশন। সূত্র জানায়, এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন হিসাবে বিপুল অঙ্কের টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। পরে লোপাট করা অর্থ বিভিন্ন হিসাবে স্তরে স্তরে স্থানান্তরের মাধ্যমে ঘোরানো হয়।

দুদক সূত্র জানায়, বিভিন্ন হিসাবে ঘোরানো ওই অর্থ ব্যবহার করে থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের (পরিবর্তিত নাম নগদ লিমিটেড) ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার কেনা হয়। এসব শেয়ারের মূল্য প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা। সরকারি ভাতার অর্থ লোপাটের পর তা সরাসরি রেখে না দিয়ে কোম্পানির শেয়ারে রূপান্তরের তথ্য পেয়েছে দুদক।

তানভীর মিশুকের প্রতিষ্ঠানে লোপাটের টাকা : দুদকের অনুসন্ধানে ‘নগদ’ পরিচালনাকারী থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে শুধু সরকারি অর্থ বের করে নেওয়ার ঘটনাই নয়, বৈধ চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা না এনে অনাবাসী বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে শেয়ার হস্তান্তর, শূন্য কুপন বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত মূলধন দিয়ে বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং নিজ ও স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগেও অনুসন্ধান চলছে।

দুদক জানায়, থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসকে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বরের চুক্তির মাধ্যমে ‘নগদ’ মোবাইল আর্থিক সেবার মাস্টার এজেন্ট নিয়োগ করে। রাজস্ব ভাগাভাগির ওই চুক্তিতে ডাক বিভাগের অংশ ৫১ শতাংশ এবং থার্ড ওয়েভ টেকনোলজিসের অংশ ৪৯ শতাংশ নির্ধারিত ছিল। পরবর্তীতে মাস্টার এজেন্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক ‘নগদ’-এর কার্যক্রম পরিচালনায় প্রশাসক নিয়োগ করে।

লোপাটের অর্থে কেনা শেয়ার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে দেখানোর চেষ্টা : দুদক জানায়, লোপাটের অর্থ দিয়ে কেনা শেয়ারগুলো পরে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিদের নামে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার হোল্ডিংস, মিয়ার্স হোল্ডিংস, সেঞ্চুরি অনলাইন, চৌধুরী বেঙ্গল ফিনটেক, ব্লু ওয়াটার হোল্ডিংস, তাসিয়া হোল্ডিংস, চৌধুরী ফ্রন্টিয়ার ম্যানেজমেন্ট, ফিনটেক হোল্ডিংস, সিগমা ইঞ্জিনিয়ার্স ও ইএসওপি হোল্ডিংস-এর নামে শেয়ারের তথ্য রয়েছে। এসব শেয়ার বিক্রি করে অর্থ বিদেশে পাচারের চেষ্টা চলছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা নাগরিক হিসাবে দেখানো শেয়ারহোল্ডারদের মাধ্যমে শেয়ার কেনার অর্থের বৈধ উৎস সম্পর্কেও অনুসন্ধানে সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি।

৭৮৬ কোটি টাকার শেয়ার অবরুদ্ধের আদেশ : দুদকের আশঙ্কা, অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগেই লোপাটের অর্থে কেনা এসব শেয়ার বিক্রি, হস্তান্তর বা স্থানান্তর করা হলে রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। সেই আশঙ্কায় তানভীর মিশুকসহ অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা ১৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭টি শেয়ার, যার মূল্য প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা, অবরুদ্ধ করার জন্য আদালতে আবেদন করে দুদক। পরে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ সেপ্টেম্বর মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির এসব শেয়ার অবরুদ্ধের আদেশ দেন। আদালতে দেওয়া আবেদনে এসব শেয়ার হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর বা বিক্রি বন্ধ রাখার আবেদন করা হয়। একই সঙ্গে আদেশের কপি যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তর, ‘নগদ’-এর প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোরও আবেদন করা হয়।

এসব বিষয়ে তানভীর মিশুকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায় তিনি দেশের বাইরে। এরপর তার বিদেশি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম