ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন
মেয়ের সামনে মা, স্ত্রীর কাঁধ ছেড়ে স্বামীর মৃত্যু
পরিবারে শোকের মাতম তদন্ত কমিটি গঠন
Advertisement
ময়মনসিংহ ব্যুরো, নেত্রকোনা ও ফুলপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুনে মারা যাওয়া শাহজাহান মনিরের মা বিবি হাওয়ার আহাজারি। মঙ্গলবার ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুরে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ধূম্রজাল কাটেনি। পাশাপাশি তারা পদদলিত নাকি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন, এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও তারা পদদলিত হয়ে মারা গেছেন কি না তা নিশ্চিত করা হয়নি। এদের মধ্যে দুজনের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে দুজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাকিরা হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন বলে দাবি করেছেন পরিবারের সদস্যরা। এদিকে মৃত্যুর তালিকায় ফুলবাড়িয়ার জাহানারা (৫০) নামে যার নাম এসেছে, তিনি এখনো জীবিত বলে দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। এছাড়া অজ্ঞাত শিশু নিহতের বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মাইন উদ্দিন।
মেয়ের সামনেই পদদলিত হয়ে মায়ের মৃত্যু : হুড়োহুড়ির সময় মেয়ের সামনেই পদদলিত হয়ে মায়ের মৃত্যু হয়েছে। নিহত কুলসুম আক্তার তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী। ১২ দিন ধরে জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছরের ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালে ছিলেন তিনি। হাসপাতালে আগুনের সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারান তিনি। মেয়ে মিম আক্তার বলেন, আগুন লাগার পর সবাই সিঁড়ি দি?য়ে নিচে নামছিল। এ সময় মা নিচে পড়ে যান, অসুস্থ স্বাধীনও পড়ে যায়। এ সময় অনেক চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। মাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলেও কেউ পাত্তা দেয়নি। চিকিৎসার অবহেলায় আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। নিহত কুলসুমার স্বামী শহিদুল ইসলাম জানান, অসুস্থ ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সুস্থ মা লাশ হয়ে ফিরেছে।
স্ত্রীর কাঁধে ভর দিয়ে নামার সময় স্বামীর মৃত্যু : নিহত পল্লী চিকিৎসক শাহজাহান মনিরের (৪৫) বাড়ি ফুলবাড়িয়ার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামে। গত ৯ সেপ্টেম্বর অসুস্থ শাহজাহান মনিরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আগুন লাগার খবরে স্ত্রীর কাঁধে ভর দিয়ে নিচে নামছিলেন তিনি। এ সময় হুড়োহুড়িতে শাহজাহান, তার স্ত্রী হারিসা খাতুন ও বড় বোন জাহানারা বেগম নিচে লুটিয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পদদলিত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন স্ত্রী হারিসা। জ্ঞান ফেরার পর জানতে পারেন, তার স্বামী মারা গেছেন। মঙ্গলবার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শাহজাহানের বৃদ্ধ মা বিবি হাওয়া ছেলের শোকে কাতর। বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। স্ত্রী হারিসা খাতুনও অঝোরে কান্না করছেন।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মৃত্যু : আগুনের সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন ফুলবাড়িয়ার কালাদহ ইউনিয়নের বিদ্যানন্দ গ্রামের অটোচালক রমজান আলী (৪০)। সোমবার সকালে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। হাসপাতালে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্ত্রীর কাঁধে ভর দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যান। এ সময় সিঁড়িতেই তিনি মারা যান। খাদিজা আক্তার জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন তার স্বামী। হাসপাতালে আগুন লাগার খবরে আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার মৃত্যু হয়েছে।
হাজেরার মৃত্যু হার্ট অ্যাটাকে নাকি সিঁড়ি থেকে পড়ে? : নিহত হাজেরা বেগম (৫০) নেত্রকোনার পূর্বধলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের ভুগী গ্রামের আইয়ুব আলীর স্ত্রী। মঙ্গলবার সরেজমিন হাজেরার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জানাজা শেষে তাকে বাড়ির আঙিনায় দাফন করা হচ্ছে। হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় ওই নারী হার্ট অ্যাটাকে নাকি নাকি হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি থেকে পড়ে মারা গেছেন, এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। তার ভাতিজি জামাই জায়েদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সোমবার রাতে আমাকে ফোন করে জানানো হয়, ফুপুশাশুড়ি (হাজেরা) হাসপাতালে আগুন লাগার সময় মারা গেছেন। হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তিনি পড়ে যান। ভাগ্নে রিপন মিয়া বলেন, আগুন লাগার পর নামার সময় সিঁড়িতে পড়ে খালা নিহত হয়েছেন। তবে হাজেরা বেগমের স্বামী আইয়ুব আলী দাবি করেন, হাসপাতালে আগুন লাগার আগেই তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসেন। আগুনের কারণে তার স্ত্রী মারা যায়নি। তার ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যাসহ নানা জটিল রোগ ছিল। জাহেরার ছোট ছেলে মাজহারুল ইসলাম ওরফে ফারুক বলেন, আম্মা হাসপাতালে আগুন লাগার পর হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। পরে সন্ধ্যার সময় তাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ধূম্রজাল : সোমবার বিকাল পৌঁনে ৬টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের আটতলায় নষ্ট লিফট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এ সময় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে পদদলিত ও সিঁড়ি থেকে পড়ে বেশ কয়েকজন হতাহত হন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর আসে। পরে এ নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়। পদদলিত হয়ে কেউ মারা যায়নি বলেও জানানো হয়। তবে নানা নাটকীয়তা শেষে মধ্যরাতে চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। যদিও তারা কিভাবে মারা গেছেন, এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি প্রশাসন। হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদের সহসভাপতি ও বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবির সরকার জানান, পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবরটি অসত্য। জরুরি বিভাগে যে দুজনের লাশ ছিল, সেটি স্বাভাবিক মৃত্যু। এছাড়া আরো দুজনের মৃত্যু নিয়ে যে খবরটি আসছে, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিটি প্রশাসক রুকুনোজ্জামান সরকার বলেন, হাসপাতালের ওই নতুন ভবনটিতে শুরু থেকেই লিফট নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। পাঁচটি লিফটের মধ্যে দু-তিনটি লিফট নষ্ট থাকত বা অপারটরের অভাব দেখিয়ে বন্ধ রাখা হতো। আগুন লাগা লিফটি বন্ধ ছিল। তিনি এ জন্য গণপূর্ত বিভাগকে দায়ী করেছেন।
