‘ব্যারাজের গেট ছাড়ি দিলে নদী পাক দেয়, হামার বুক কাঁপে’
ভোটের আগে তিস্তা বাঁচাই, পরে তিস্তা মরে! * ‘সরকার আইসে, সরকার যায়-হামার আশা পূরণ হয় না’
Advertisement
হাবিবুর রহমান হাবীব, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
তিস্তার ভাঙনে ক্রসবাঁধ ভেঙে ঝুঁকিতে পড়েছে বাড়ি। তাই আতঙ্ক নিয়ে বাঁধের ধারে বসে আছেন বৃদ্ধ জবের আলী। সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বুড়িরহাট এলাকায় -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তিস্তাপারে বসবাস জবের আলীর। ২০২০ সালে কুড়িগ্রামের রাজারহাটের বুড়িরহাট ক্রসবাঁধের অংশবিশেষ ভেঙে গেলে তিস্তার গর্ভে চলে যায় খিতাবখা গ্রামের এই ৮৫ বছরের বৃদ্ধের ভিটে। এরপর থেকে বাঁধের ধারে মাথা গুঁজে আছেন তিনি। সপ্তাহ দুয়েক আগে হঠাৎ ফুঁসে ওঠা তিস্তার তোপে ফের বিলীন হয়েছে ক্রসবাঁধের অংশবিশেষ। এতে আবারও আতঙ্ক ভর করেছে জবের আলীর চোখে-মুখে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখা এই প্রবীণ ভেবেছিলেন, এবার নদী খনন ও পাড় বাঁধার মাধ্যমে তিস্তাকে বাগে আনা হবে। সুরক্ষিত হবে ভিটেমাটি। চাষাবাদ করে জীবনধারণ করতে পারবেন তারা।
কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর আশ্বাসে এখন আর ভরসা করতে পারছেন না তিনি। জবের আলী বলেন, ‘এই তিস্তা হামার দুঃখ। যখন ব্যারাজের গেট ছাড়ি দেয়, নদী পাক দেয়, ডুকরি ওঠে। হামার বুক কাঁপে। চপুর আইত নিন্দ হয় না (সারা রাত ঘুম ধরে না)। শুনি বোলে তিস্তা বাইন্ধবে। সগাই (সবাই) আশা দেয়, কাম হয় না।’
৩০ বছর আগে ভিটে হারিয়ে বাঁধের ধারে বসত গড়েছেন রাজারহাটের তিস্তাপারের রামহরি গ্রামে আব্দুল মজিদ। তাও এখন তিস্তার চোখ রাঙানিতে বিপন্ন। ফসলি জমি চলে গেছে নদীগর্ভে। মহাপরিকল্পনা তাদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু ভরসা পাচ্ছেন না তিনি। হতাশ আব্দুল মজিদ বলেন, ‘৩০ বছর ধরি শুনি নদী খুঁড়বে, পাড় বাইন্ধবে। সরকার আইসে, সরকার যায়-হামার আশা পূরণ হয় না।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিস্তাপারে ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ নামে বড় আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন স্থানীয় মানুষ। মশাল মিছিল ও গানের সুরে জেগে উঠেছিল তিস্তাপার। তবে সেই আন্দোলনের সফলতা নিয়ে সংশয় কাটেনি। খিতাবখা গ্রামের গৃহবধূ মমতা বেগম বলেন, ‘ভোটের আগে তিস্তা বাঁচাই। ভোট বের হইলে তিস্তা মরে।’
রাজারহাটের গতিয়াশাম, রামহরি, খিতাবখা, গাবুরহেলান, ডাংরা, রতি, উলিপুরের ঠুটাপাইকর, হোকডাঙা ও চিলমারীর চর বজরা-সব গ্রামেই ভাঙন আতঙ্ক। অনেক গ্রাম শুধু নামেই টিকে আছে। বেশির ভাগই চলে গেছে তিস্তার গর্ভে। বাকি অংশের মানুষও ঘরবাড়ি হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
কয়েকদিন আগে বুড়িরহাট ক্রসবাঁধের ৪০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। এতে ভাটির দিকে ৮-১০টি গ্রামে ভাঙন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙা অংশ মেরামতের কাজ করছে। নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ পলাশপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ ধানিজমি বিলীন হচ্ছে। হাসারপাড় এলাকার উজান ও ভাটিতেও প্রতিনিয়ত ভাঙন চলছে।
তিস্তাপারের মানুষের দাবি, দীর্ঘদিন খনন না করায় নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে মে থেকে অধিকাংশ সময় তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি থাকছে। এতে কুড়িগ্রামের অংশের ২০ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা চলছে। বর্তমানে তিস্তার আরও ৫-৬টি পয়েন্ট ভাঙনপ্রবণ। অর্থ বরাদ্দ সাপেক্ষে সেসব পয়েন্টেও ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হবে।
