দেড়শ বছরের নাগলিঙ্গম গাছ ছড়াচ্ছে সৌরভ
Advertisement
মো. রইছ উদ্দিন, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
গৌরীপুরে নাগলিঙ্গম গাছের কাণ্ড থেকে বের হওয়া ফুল ছড়াচ্ছে সুগন্ধ -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কাণ্ডে ফুটছে উজ্জ্বল গোলাপি ফুল। ফুলের পাপড়ি গোলাকার ও কুঁড়ি পাকানো। ফুটন্ত ফুলের পরাগকেশর দেখতে সাপের ফণার মতো। এ কারণেই গাছটির নাম নাগলিঙ্গম। এটি একটি দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ। ফল গোলাকার বলের মতো, রং সফেদার মতো। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো এ বৃক্ষ এখন সৌরভ ছড়াচ্ছে।
গাছটি আমাজান অঞ্চলের। সাধারণত শরৎ মৌসুমে এতে ফুল আসে। তবে এবার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফুল আগেই ফুটছে। বর্ষার প্রথম দিনেই ফুলের সুগন্ধে চারপাশ ম-ম করছে। গৌরীপুর থানার নতুন ভবনের পাশেই রয়েছে এ বৃক্ষ। ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাসে সেখানে ছুটে আসছেন পর্যটক। পথচারীরাও এর ঘ্রাণে থমকে দাঁড়াচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ বৃক্ষের বয়স দুইশ বছরের হাতছানি দিচ্ছে। কালীপুরের তৎকালীন জমিদার উপেন্দ্র কিশোর রায় প্রায় দেড়শ বছর আগে অনেক রয়েল পামগাছের সঙ্গে ভারত থেকে নাগলিঙ্গম গাছের চারা আনেন। পরে জমিদারের বাসভবনে গাছটি রোপণ করা হয়। জনশ্রুতি আছে, হাতির পেটের অসুখের প্রতিষেধক হিসাবে এ গাছের কচি পাতা কার্যকর ভূমিকা রাখত।
এলাকাবাসী জানান, এ গাছের ফুল স্বয়ং নাগ-নাগিনী পাহারা দেয়-এমন কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। এ কারণে প্রতিবছর নাগপঞ্চমীতে গাছের গোড়ায় পূজা-অর্চনা করা হতো। নাগকে সন্তুষ্ট করতে জমিদার আমলে এ প্রথা চালু ছিল। বর্তমানে সাপের ভয়ে গাছটির কাছে সহজে কেউ যেতে চান না।
দেশবিভাগের পর জমিদাররা ভারতে চলে গেলে পরিত্যক্ত ওই বাড়িতে বর্তমানে গৌরীপুর থানার কার্যক্রম চলছে। গাছটি প্রতিবছর শরৎকালে ফুল ফুটিয়ে সৌরভ ছড়ায়। তবে এবার বর্ষার শুরুতেই ফুল ফুটছে, ঝরছে এবং ছড়াচ্ছে ঘ্রাণ। কালীপুর মধ্যম তরফ এলাকার আব্দুর রশিদ জানান, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের শুরু ও শেষের দিকে একাধিকবার ফুল ফোটে। ফুলের ঘ্রাণে চারদিক ম-ম করে।
কাণ্ডে ফুল ফুটলেও শাখা-প্রশাখায় কোনো ফুল ফোটে না। কয়েকবার বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদনের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। ফলের ওজন প্রায় দুই কেজি। দেখতে সুন্দর হলেও ফলের স্বাদ খুবই তিক্ত। পশু-পাখিও এ ফল খায় না। পাতার রং গাঢ় সবুজ। বহুদূর থেকে ফুলের সুবাস পাওয়া গেলেও তা তীব্র নয়।
গৌরীপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক আজহারুল হক বলেন, দুর্লভ নাগলিঙ্গম গাছের ব্যাপক ঔষধিগুণ রয়েছে। এর ফুলের কুঁড়ি দিয়ে রস তৈরি করে খাওয়ালে প্রসূতির সন্তান প্রসব সহজ হয়। মাঝবয়সি পাতা দিয়ে তৈরি পেস্ট দাঁতের পাইরিয়া ও ক্ষয় রোগ নিরাময়ে কার্যকর। বাকল দিয়ে বহুমূত্র রোগের ওষুধ তৈরি করা হয়। কাঠ অত্যন্ত মজবুত। লালচে-বাদামি রঙের এ কাঠ রেলের স্লিপারসহ ভারী কাজে লোহার পরিবর্তে ব্যবহার করা যায়। তিনি আরও জানান, এত গুণ থাকা সত্ত্বেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশে নাগলিঙ্গম গাছের বিস্তার সম্ভব হচ্ছে না। প্রচণ্ড উষ্ণ অঞ্চলের গাছ হওয়ায় এ দেশে বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম হয় না। তবে গুটি কলম করে বংশবিস্তার সম্ভব। প্রায় ২৫ বছর আগে এক বৃক্ষ জরিপে উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বাংলাদেশে ৫২টি নাগেশ্বর বৃক্ষের হিসাব করেছিলেন। বর্তমানে এর সংখ্যা কমে ১৬টিতে দাঁড়িয়েছে।
