পরীক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে উত্তর লেখালেন পরীক্ষক
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন * ইংরেজির দুই হাজার উত্তরপত্র জব্দ
Advertisement
আনু মোস্তফা, রাজশাহী
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা এক পরীক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে খাতায় উত্তর লিখিয়ে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। বৃহস্পতিবার রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিবের এক চিঠিতে এ তথ্য জানা গেছে।
শিক্ষা বোর্ডের অফিস আদেশপত্রে বলা হয়েছে, সম্প্রতি এক পরীক্ষকের বিরুদ্ধে বাসায় ডেকে এক পরীক্ষার্থীকে খাতায় উত্তর লেখানোর অভিযোগ উঠেছে। অত্যন্ত স্পর্শকাতর এ বিষয়ে শিক্ষা বোর্ড তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়েছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) মো. ইব্রাহিম হোসেনকে প্রধান করে এ লক্ষ্যে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অফিস আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, তদন্ত কমিটিকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বোর্ড সচিবের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত পরীক্ষক রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানার মহিষবাথান এলাকার হাজী জমির উদ্দিন শাফিনা মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইংরেজির প্রভাষক মো. সেকেন্দার আলী। তার বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বেলঘরিয়া গ্রামে। ঘটনাটি জানাজানির পর তার মূল্যায়ন করা ইংরেজির প্রায় দুই হাজার উত্তরপত্র জব্দ করা হয়েছে।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, যে পরীক্ষার্থীকে বাসায় ডেকে দুই হাজার টাকার বিনিময়ে ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখিয়ে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার নাম মেহেদী হাসান। মেহেদী পুঠিয়ার বেলপুকুরের আইডিয়াল ডিগ্রি কলেজের মানবিক শাখার পরীক্ষার্থী। ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষা খারাপ হওয়ায় মেহেদী উত্তরপত্রের এককোণে নিজের মোবাইল নম্বর লিখে দিয়েছিল। সেই নম্বরে ফোন দিয়ে সেকেন্দার আলী তাকে ডাকেন। মেহেদী প্রথমে জানতে চান ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রে কত নম্বর পেয়েছেন। পরীক্ষক তাকে জানান মাত্র ২৫ নম্বর। তিনি তাকে আরও বলেন তুমি চাইলে এটা ৫০ নম্বর করা সম্ভব। এজন্য টাকা দিতে হবে।
এদিকে কথোপকথনের এক পর্যায়ে মেহেদীকে ১৪ আগস্ট নগরীর বিনোদপুর বাজারে যেতে বলেন পরীক্ষক। নির্ধারিত দিনে বিনোদপুর বাজারে নির্ধারিত স্থানে মেহেদী হাজির হন। সঙ্গে তার আরও কয়েকজন সহপাঠীও ছিল। কিছুক্ষণ পর একটি মোটরসাইকেলে সেখানে আসেন সেকেন্দার আলী। সেখান থেকে মেহেদীকে নিয়ে একটি বাসায় যাওয়া হয়। সেখানেই মেহেদী ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের উত্তর পেয়ে যান। উত্তরপত্রের ফাঁকা পাতায় বিভিন্ন প্রশ্নের সঠিক উত্তর লিখে বেরিয়ে আসেন। বিনিময়ে পরীক্ষককে দেন দুই হাজার টাকা।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, মেহেদী পরীক্ষকের সঙ্গে হওয়া তার ফোনালাপ রেকর্ড করে রেখেছিলেন। সেই ফোনালাপের রেকর্ড যে কোনোভাবে শিক্ষা বোর্ড কর্মকর্তাদের হাতে পৌঁছায়। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এর কপি পাঠানো হয় হাজী জমির উদ্দিন সাফিনা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষের কাছে। অধ্যক্ষ এনামুল হক মণ্ডল ফোনালাপ শুনে নিশ্চিত করেন এ কণ্ঠ তার কলেজের ইংরেজির প্রভাষক সেকেন্দার আলীর। এর পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা বোর্ড বৃহস্পতিবার পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে। এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষ এনামুল হক মণ্ডল বলেন, কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে কণ্ঠটি সেকেন্দার আলীরই। বোর্ড যেহেতু একটি তদন্ত কমিটি করেছে, সেক্ষেত্রে প্রতিবেদনের আলোকে সেকেন্দার আলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে সেকেন্দার আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এমন কোনো ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তবে মেহেদী ঘটনার কথা স্বীকার করে বলেন, পরীক্ষক ফোন দিয়ে আমাকেসহ আরও পরীক্ষার্থী থাকলে তাদেরকেও নিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তার কাছে শুধু আমার উত্তরপত্র পাওয়া গেছে। আমার অন্য সহপাঠীদের উত্তরপত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। মেহেদী আরও স্বীকার করেন উত্তরপত্রে কিছু ভুল ছিল। সেগুলো ঠিক করেছি। যেগুলো লিখতে পারিনি সেগুলোর কয়েকটি লিখেছি। হয়তো ৫০ নম্বর পেতে পারি। শুক্রবার সকালে যোগাযোগ করা হলে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. আব্দুর রৌউফ জানান, ঘটনাটি খুবই স্পর্শকাতর। প্রভাষক সেকেন্দার আলী ইংরেজি বিষয়ের যেসব উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেছেন নিয়মানুযায়ী সেগুলো দ্বিতীয় পরীক্ষকের কাছে পাঠানো হয়। ঘটনাটি জানার পর আমরা চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় দুই হাজার উত্তরপত্র ফিরিয়ে এনেছি। সেগুলোও আমরা খতিয়ে দেখছি। তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। প্রতিবেদন আসার পর এই বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
