যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি
জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে পৌনে দুইশ বছর
Advertisement
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত তালপাতার ওপর লেখা বই (ওপরে), এখানে রয়েছে শত বছর পূর্বে হাতে লেখা কিছু গ্রন্থও -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রায় পৌনে দুইশ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে স্বমহিমায় জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে যশোর ইনস্টিটিউট পাবলিক লাইব্রেরি। এটি উপমহাদেশের দ্বিতীয় এবং বাংলাদেশের প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি। ভারতীয় উপমহাদেশে যখন কেউই ভাবেনি বইমেলার কথা, সেসময় বইমেলার আয়োজন করা হয় এই লাইব্রেরির উদ্যোগেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি এই লাইব্রেরি পরিদর্শন করে ৫০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন।
সাধারণভাবে জানা যায়, ‘যশোহর পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৫৪ সাল’। এর প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে স্বীকৃত যশোরের সেসময়ের জেলা কালেক্টর আর সি রেক্স। কিন্তু লাইব্রেরি বিষয়ে পণ্ডিত-গবেষক ড. মোফাখখার হোসেনের দাবি, ‘যশোহর পাবলিক লাইব্রেরি’র প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৫১। কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব ইন্ডিয়া ও লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে অনুসন্ধান চালিয়ে এই দাবির পক্ষে তথ্য মিলেছে।
ফরাসি বিপ্লবের পর (১৭৮৯) বিশ্বব্যাপী জ্ঞানচর্চার যে বাতাবরণ তৈরি হয়, এরই পথ ধরে আমেরিকার কানেক্টিকাট রাজ্যের সলিসবারিতে পৌরকর্তৃপক্ষ প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮৫০ সালে পাবলিক লাইব্রেরি অ্যাক্ট পাশ করে।
১৮৫১ সালে রাজনারায়ণ বসু (প্রধান শিক্ষক, মেদিনীপুর জিলা স্কুল) মেদিনীপুরে এই উপমহাদেশে প্রথম গণপাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। ওই একই বছর ‘যশোহরে’ প্রতিষ্ঠিত হয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় গণপাঠাগার। শ্রীবিষ্ণুশর্মা পণ্ডিত লিখিত নিবন্ধ অনুসারে ‘যশোহর পাবলিক লাইব্রেরির’ প্রতিষ্ঠা ১৮৫১ সালে। এর মানে, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম পাবলিক লাইব্রেরি এটি।
অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফ হোসেন (লাইব্রেরি সম্পাদক, ১৯৬৩-১৯৮৩) তার লেখায় ‘পটল ময়রা’ নামে এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি ব্যবহার করে লিখেছিলেন, ‘যশোহরের কিছু উৎসাহী মানুষ লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার জরাজীর্ণ পুরোনো ভবন ভেঙে নতুন দ্বিতল ভবন নির্মাণ করে দেয়। ভবন উদ্বোধন করেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন, যা বর্তমানে পাঠকক্ষ ও গ্রন্থ ইস্যু বিভাগ।
১৯৭৯ সালের ১৪ অক্টোবর বার্ষিক সাধারণ সভায় গৃহীত কিছু সংশোধনী থেকে জানা যায়, এমএ মান্নান প্রস্তাবিত ও এসএম আলী কাচা সমর্থিত ‘যশোর নাট্যকলা সংসদের’ পরিবর্তে যশোর ‘ইনস্টিটিউট নাট্যকলা সংসদ’ সংশোধিত প্রস্তাব গোলাম ইয়াজদান চৌধুরীর সমর্থনক্রমে বার্ষিক সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় এক লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ হাজার তালিকাভুক্ত। বাংলা ভাষায় রয়েছে প্রায় ৭৩ হাজার, ইংরেজি ভাষায় ২০ হাজার। আছে হাতে লেখা কবি কালিদাসের পুথি। রয়েছে প্রাচীন রামায়ণও। নলখাগড়ার কলম আর ভূষা কালিতে লেখা দুর্গাপূজা পদ্ধতির বর্ণনা আছে।
লাইব্রেরি সম্পাদক অধ্যাপক শেখ জুলফিকার আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই লাইব্রেরি ভবন পরিদর্শনকালে আমাদের ৫০ লাখ টাকা অনুদানের ঘোষণা দেন। ইতোমধ্যে ২৫ লাখ টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। বাকি ২৫ লাখ টাকার বই জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে সরবরাহ করতে হবে।
ইতোমধ্যে আমরা ই-বুক শেল্ফের কাজ অনেকখানি এগিয়ে নিয়েছি। সামনের সপ্তাহে এটি উদ্বোধন করা হবে। এছাড়া, আমাদের লাইব্রেরিতে থাকা বইগুলোর তালিকা আমাদের পোর্টালে অনলাইনে দেখতে পাবেন পাঠক। তিনি বলেন, পাঠক বৃদ্ধিতে আমরা এবার গতানুগতিক ধারা পরিবর্তন করে পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে লাইব্রেরির আশপাশের ৫টি স্কুলকে সংযুক্ত করেছি।
চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গণপাঠাগারটি পরিদর্শন করেন। লাইব্রেরিয়ান আবু জাহিদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই প্রথম কোনো সরকারপ্রধান, যিনি লাইব্রেরি পরিদর্শন ও সংস্কারে মোটা অঙ্কের অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী প্রথমেই লাইব্রেরির দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি শাখাটি ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি তুলট কাগজ ও তালপাতায় হাতে লেখা মহাকবি কালিদাসের পুথি, প্রাচীন রামায়ণ, মহাভারত এবং চাণক্যের কালজয়ী সৃষ্টিগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে প্রত্যক্ষ করেন। প্রায় পৌনে দুইশ বছরের প্রাচীন এসব অমূল্য সম্পদ দেখে প্রধানমন্ত্রী মুগ্ধ হন।
