কমলাপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ
রাজধানীতে ৪ বাস ও ১ পিকআপে আগুন
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীতে আগুনে জ্বলছে যাত্রীবাহী বাস। শনিবার মিরপুর-১১ নম্বরের জমজম টাওয়ারের পাশে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি যানবাহনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে মিরপুরে দুটি যাত্রীবাহী বাস, মধ্য বাড্ডায় একটি স্টাফ বাস, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার সামনে জব্দ করে রাখা একটি পিকআপ এবং মাতুয়াইলে একটি দূরপাল্লার বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, কমলাপুর রেলস্টেশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে।
শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মিরপুর ১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডে গাজীপুর থেকে আসা অভিজাত পরিবহণের একটি বাসে আগুন দেওয়ার চেষ্টা হয়। মিরপুর থানার ওসি হাফিজুর রহমান জানান, এতে বাসটির পেছনের দুটি আসন আংশিক পুড়ে গেছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
এর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা ৭টা ১৩ মিনিটে মিরপুর ১১ নম্বরের জমজম টাওয়ারের পাশে শিকড় পরিবহণের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে বাসটির আসন, জানালা ও গ্লাস পুড়ে যায়। ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাশেদ বিন খালিদ জানান, চলন্ত অবস্থায় বাসটিতে আগুন লাগে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোস্তাক সরকার বলেন, দুটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করা হবে।
এরপর একই রাত ৭টা ৫০ মিনিটে মধ্য বাড্ডা ইউলুপের নিচে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বিপরীতে আলিফ এন্টারপ্রাইজের একটি স্টাফ বাসে আগুন লাগে। স্থানীয়রা পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। বাড্ডা থানার এসআই হাসানুল বলেন, বাসটিতে কে বা কারা আগুন দিয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার সামনে মূল সড়কে পুলিশের জব্দ করে রাখা একটি পিকআপে আগুন দেওয়া হয়। থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আজগর আলী জানান, কে বা কারা আগুন দিয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। রাত ১টার দিকে মাতুয়াইলে একটি দূরপাল্লার বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। বিষয়টি নিশ্চিত করে ফায়ার সার্ভিসের ডিউটি অফিসার রাফি আল ফারুক বলেন, সংবাদ পাওয়ার পর আমাদের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তাৎক্ষণিকভাবে বাসের নাম জানা যায়নি।
এদিকে শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যাত্রাবাড়ী মোড়ে সামাদ মার্কেটের সামনে পরপর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণে রিকশাচালক মো. বিল্লাল (৩২) আহত হন। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক সড়কেও একটি ককটেল বিস্ফোরণে এক পথচারী আহত হন। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি রাজু আহমেদ জানান, আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এসব ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি। জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের নির্জন এলাকায় একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে কেউ হতাহত হয়নি। ঢাকা জেলার রেলওয়ে পুলিশের এসপি নিকুলিন চাকমা জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। স্টেশনে প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া শনিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন নেতার মাজারের সামনে মেট্রোরেলের ৫৫৭ নম্বর পিলারের পাশে ককটেল বিস্ফোরণের আলামত পাওয়া যায়। শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, ঘটনায় কোনো হতাহত হয়নি। রাত সাড়ে ৯টার দিকে ধানমন্ডির শংকর এলাকায় মোটরসাইকেল থেকে দুটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তবে এগুলো ককটেল নাকি পটকা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ধানমন্ডি থানার ওসি ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও সেখানে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
রাজধানীতে নাশকতার চেষ্টা, সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী : রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ঢাকার নিরাপত্তাব্যবস্থায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফ্লাইওভার, প্রবেশ ও বহির্গমনপথসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে দুই শতাধিক চেকপোস্ট। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশির পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি। বিশেষ নজরে রাখা হয়েছে মোটরসাইকেল চলাচলও। শুক্রবার দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দফায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাতটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ১৪টি ককটেল বিস্ফোরণ হয়েছে। এর মধ্যে মালিবাগ, আগারগাঁও, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, বাবুবাজার, মগবাজার ও বিটিভি ভবনের আশপাশের এলাকা রয়েছে। একই রাতে কাফরুল থানার সামনে একটি ফাঁকা বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। যদিও এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছড়ায় যাত্রাবাড়ী এলাকায়। সেখানে সন্ধ্যার পর পরপর কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে।
২০০-এর বেশি চেকপোস্ট : শনিবার ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেন, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, ফ্লাইওভার ও প্রবেশপথে দুই শতাধিক চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত চেকপোস্ট ও টহল কার্যক্রমও চলছে। পুলিশ সূত্র জানায়, এসব চেকপোস্টে সন্দেহজনক যানবাহন থামিয়ে তল্লাশির পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঢাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোয়ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
সড়কে মোড়ে মোড়ে এসআরবি : ডিএমপির পাশাপাশি স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনায় চেকপোস্ট এবং টহল জোরদার করেছে। জনবহুল এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, কেপিআই ও প্রধান সড়কগুলোয় বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে। এসআরবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধ, মাদক উদ্ধার এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঠেকাতে বিশেষ অভিযান চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
এসআরবির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এমজেডএম ইন্তেখাব চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, রাজধানীজুড়ে ৪০টির বেশি চেকপোস্ট এবং ২১টি টহল দল কাজ করছে। এর মধ্যে ১৯টি নিয়মিত ও দুটি সাদা পোশাকে বিশেষ টহল। গত দুই দিনে ককটেল বিস্ফোরণ ও কাফরুল থানার সামনে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে এসব চেকপোস্ট ও টহল পরিকল্পনা করা হয়েছে।
একাধিক ঘটনায় তদন্ত : কাফরুল থানার সামনে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তবে ঘটনাস্থলের আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এদিকে শুক্রবার ফার্মগেটের একটি মসজিদ থেকে গোপন বৈঠকের অভিযোগে ২৩ জনকে আটক করে পুলিশ। তাদের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে তেজগাঁও বিভাগের পুলিশ জানিয়েছে। তাদের যাচাই-বাছাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংগঠনটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং এর পেছনে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নগরবাসীর স্বাভাবিক চলাচল বজায় রেখে নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গুলশানে আ.লীগের মিছিল, গ্রেফতার ১৭৯ : রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১৭৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী এ তথ্য জানান।
ককটেল ও বাসে আগুনের ঘটনায় মামলা : রাজধানীর মালিবাগ, মহাখালী, শেরেবাংলা নগর, যাত্রাবাড়ীসহ অন্তত ৮টি স্থানে শুক্রবার দুপুর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ এবং কাফরুল থানার সামনে একটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় একাধিক মামলা করেছে পুলিশ। যাত্রাবাড়ী এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় থানা পুলিশ বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে। ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় রাজধানী থেকে একজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ডিবির হাতে গ্রেফতার ব্যক্তির নাম রায়হান (৩৫)। তার কাছ থেকে ককটেল বিস্ফোরণে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। রায়হান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩২নং ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক। মহাখালীতে জোড়া ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এখনো জড়িতদের শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। দায়ের করা হয়নি মামলা। জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুলশান বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, মহাখালী ফ্লাইওভারের ঢালে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এখনো কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। সিসিটিভিসহ অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন।
মিরপুরের কাফরুল থানার সামনে রাখা বাসে আগুনের ঘটনায় সাতজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় নাশকতার অভিযোগ আনা হয়েছে। এদিকে ককটেল বিস্ফোরণের আলামত না পাওয়ায় মামলা করেনি শেরে বাংলানগর থানা পুলিশ। তবে এ ঘটনায় থানায় একটি জিডি করা হয়েছে।
