Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড

তুহিন-ফাহাদের পূর্বপরিকল্পনার তথ্য

Advertisement

Icon

সাঈদ হাসান, কুবি

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তুহিন-ফাহাদের পূর্বপরিকল্পনার তথ্য

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম।

Advertisement

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার চারজনের মধ্যে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন ও ফাহাদের পূর্বপরিকল্পনার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার মুঠোফোনে আসা একাধিক কলের সূত্র ধরে অপর দুই কিশোরের সম্পৃক্ততার তথ্য সামনে আসে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত। তবে তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি কিশোর ফাহাদকে অপ্রতিমের ধার দেওয়া পাঁচ হাজার টাকা ফেরত চাওয়া নিয়ে বিরোধের তথ্যও পাওয়া গেছে। এই বিরোধ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে, অভিযুক্তদের সঙ্গে স্থানীয় ‘কোটবাড়ী বাইকার্স গ্রুপ’ নামের একটি কিশোর গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার তথ্যও সামনে এসেছে। এ ছাড়া ফাহাদ ও কামরুলকে ওই গোষ্ঠীর নেতৃত্বস্থানীয় সদস্য রাতুলের জন্মদিন উদ্যাপনের অনুষ্ঠানে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে রাতুলকে কোটবাড়ী এলাকায় শোডাউনে অংশ নিতে দেখা যায়।

তুহিনের বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ : প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনের বিরুদ্ধে এর আগেও বন্ধুর মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এ ঘটনায় ২০২৫ সালে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন ভুক্তভোগী সোহাগের মা মরিয়ম আক্তার।

অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা গেছে : প্রতিবেদকের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজে প্রধান অভিযুক্ত তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। পরে তারা একটি অটোরিকশায় করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে নামে।

ফাহাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট : অভিযুক্ত ফাহাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ সেপ্টেম্বর সে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ছবি পোস্ট করে। ছবিটির সঙ্গে সে ‘১৯৮০ এর রাজত্ব’ লিখেছিল। এর চারদিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর ‘কোটবাড়ী বাইকার্স গ্রুপ জুনিয়র’-এর নেতৃত্বস্থানীয় সদস্য রাতুলের জন্মদিন উদ্যাপনের একটি ছবি ফাহাদের অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করা হয়। ছবিতে ওই গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে তাকে দেখা যায়। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের মোবাইল সরঞ্জামাদি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেরই ডেলিভারিম্যান হিসাবে চাকরি করত। দুই সপ্তাহ আগে ১৪ হাজার টাকা মাসিক বেতনে সে কাজে যোগ দেয়। তবে এখনো তার সঙ্গে চুক্তিপত্র হয়নি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ফাহাদকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম। সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চাইছিল। এ নিয়ে অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল ওই কিশোর। অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না-এমন চিন্তাও তার মধ্যে ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। তাই তুহিনের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ফাহাদও জড়িয়ে পড়তে পারে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এসব ব্যক্তি ও ঘটনার পারস্পরিক যোগসূত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এখনো তদন্তাধীন। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনায় কারা জড়িত ছিল এবং প্রত্যেকের ভূমিকা কী-এসব বিষয় আরও যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

এছাড়াও তৃতীয় আসামি কামরুলের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা বিভিন্ন সময়ের পোস্ট থেকে জানা যায় সে স্থানীয় ‘কোটবাড়ী বাইকার্স গ্রুপ’ নামক কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়া ও তার লাশ পাওয়ার পর শোক প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে চারটি পোস্ট দিয়েছে।

এদিকে অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন বলে জানিয়েছেন ড. কামরুন নাহাত শীলা। এর সঙ্গে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন নাহিদা বেগম।

আসামিদের বয়স-পরিচয় নিয়ে পুলিশের তথ্যে ‘অসংগতি’ : অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের বয়স, ঠিকানা ও শিক্ষাগত পরিচয় নিয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ের লিখিত তথ্য এবং একই ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত স্লাইডের তথ্য পাশাপাশি রাখলে এসব পার্থক্য স্পষ্ট হয়। পুলিশের লিখিত তথ্যে সাইফুল ইসলাম তুহিনের বয়স ১৯ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি কুমিল্লা সরকারি সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে ফেল করে ২০২৫ সালে ড্রপআউট হয়েছেন এবং বর্তমানে পড়ালেখা করেন না। একই ব্রিফিংয়ের স্লাইডেও তার বয়স ১৯ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তুহিনের শিক্ষাগত পরিচয় নিয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে তার পরিবার ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের অমিল রয়েছে।

ফাহাদ, কামরুল ও সিয়ামের তথ্যেও পার্থক্য : আরেক আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদের বয়স নিয়েও পুলিশের দেওয়া দুই তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রেস ব্রিফিংয়ের লিখিত তথ্যে তার বয়স ১৫ বছর উল্লেখ করা হলেও একই ব্রিফিংয়ের স্লাইডে বয়স দেওয়া হয়েছে ১৬ বছর। সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় মো. সিয়ামের বয়সের ক্ষেত্রে। পুলিশের লিখিত তথ্যে তার বয়স ১৯ বছর উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাকে আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী বলা হয়েছে। অথচ একই ব্রিফিংয়ে উপস্থাপিত স্লাইডে তার বয়স ১৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের প্রেস ব্রিফিং ‘প্রহসনমূলক’-মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা : অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রেস ব্রিফিংকে ‘প্রহসনমূলক’ উল্লেখ করে চার-দফা দাবি আদায়ে মানববন্ধন করেছেন কুবি শিক্ষার্থীরা। সোমবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুল কাইয়ুম চত্বরে এ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। মানববন্ধনে বক্তারা অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ সুপারের (এসপি) দেওয়া প্রেস ব্রিফিংকে ‘প্রহসনমূলক’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পূর্বে ঘোষিত চার দফা দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।

গ্রেফতার দুই কিশোর টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে : গাজীপুর থেকে স্টাফ রিপোর্টার জানান, অপ্রতিমকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার চার আসামির মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) পাঠানো হয়েছে।

এছাড়া গ্রেফতার অপর দুই আসামিকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সোমবার বেলা তিনটার দিকে নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দুই কিশোরকে টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আনা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রটির তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খান। ওই দুই কিশোরের বয়স ১৫ ও ১৬ বছর। বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় আদালতের নির্দেশে তাদের কারাগারের পরিবর্তে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। ওই দুজন হলো মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও কামরুল হাসান (১৬)।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম