উদ্বোধনে গঠিত হচ্ছে বেবিচকের টাস্কফোর্স
থার্ড টার্মিনালের চুক্তি ঝুলে আছে
Advertisement
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চুক্তির জট কাটেনি। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, আয় বণ্টন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আর্থিক দায় এবং অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা নিয়ে চলছে দরকষাকষি। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতাও চূড়ান্ত হয়নি। চুক্তি ঝুলে থাকা অবস্থায়ই শুরু হয়েছে উদ্বোধনের প্রস্তুতি। দায়িত্ব বণ্টন ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে গঠন করা হচ্ছে টাস্কফোর্স। প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি (পিএমসি) গঠনেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
পরিচালনা চুক্তি চূড়ান্ত না হলেও ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য ধরে এগোচ্ছে কর্তৃপক্ষ। চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের উপস্থিতিতে রোববার বেবিচক সদর দপ্তরে এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুক্তির আলোচনা থেমে নেই। তবে বৈঠকে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হওয়ায় প্রতিটি শর্ত আলাদাভাবে পর্যালোচনা করতে হচ্ছে। ফলে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে আরও সময় লাগতে পারে। এ অবস্থায় উদ্বোধনের প্রস্তুতি এগোলেও পরিচালনা ও আর্থিক কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করতে টার্মিনাল চালুর আগেই আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো স্পষ্ট করা জরুরি। কার কী দায়িত্ব এবং কোনো পক্ষ আর্থিক দায় পরিশোধে ব্যর্থ হলে তার দায় কে নেবে, চুক্তিতে তা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। টার্মিনাল চালুর পর যেন কোনো প্রশাসনিক বা আর্থিক জটিলতা তৈরি না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, ‘আমরা এই টার্মিনালটি উদ্বোধন করতে চাই। টার্মিনালটি চালু করা না গেলে অন্যান্য খাতের আয় থেকেই এভাবে ঋণ পরিশোধ করতে হবে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিজয় দিবসে আংশিক হলেও যাতে এটি চালু করা যায়।’
উদ্বোধনের কর্মযজ্ঞ : থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা শেষে উত্থাপিত বিভিন্ন বিষয় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছে পাঠানো হচ্ছে। তারা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে পরবর্তী বৈঠকে অংশ নেবে। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে দ্বিতীয় দফার আলোচনা হতে পারে।
চুক্তি চূড়ান্ত না হলেও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে বেবিচক। উদ্বোধনের দায়িত্ব বণ্টন, কাজের পরিধি ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে বেবিচকের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হবে। রোববার এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত বেবিচকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, টার্মিনাল আংশিকভাবে চালু হলে অপারেশন সচল রাখা এবং সার্বিক কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য উচ্চপর্যায়ের ‘অপারেশনাল টাস্কফোর্স’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কমিটিতে কতজন সদস্য থাকবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রয়োজন অনুযায়ী সদস্যসংখ্যা নির্ধারণ করা হবে।
বেবিচকের সদস্য এসএম লাবলুর রহমান বলেন, ‘কার কী কাজ, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। আলোচনা চলছে। সব সমস্যার সমাধান করে ১৬ ডিসেম্বর চালুর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।’
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়ে জট : সূত্রমতে, চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের বড় অংশের দায়িত্ব পালন করছে বিমান। থার্ড টার্মিনাল চালুর পর এই দায়িত্ব কীভাবে পরিচালিত হবে, বিমানের অংশ কতটুকু থাকবে এবং এর আর্থিক কাঠামো কী হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
থার্ড টার্মিনালের বিভিন্ন সেবা ও কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয় কীভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বণ্টন হবে, তা নিয়েও সমঝোতা হয়নি। পরিচালন ব্যয় কে বহন করবে এবং দায়িত্বের ভিত্তিতে কোন পক্ষ কী পরিমাণ অর্থ পাবে-এসব বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
চুক্তির আরেকটি স্পর্শকাতর বিষয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টদের মতে, জাপানি পক্ষ থেকে বিমানের আর্থিক দায় যথাসময়ে পরিশোধ হবে-এমন নিশ্চয়তা চাওয়া হয়েছে। সরাসরি সরকারি গ্যারান্টির পরিবর্তে সরকারের পক্ষ থেকে ‘কমফোর্ট লেটার’ দেওয়ার প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। তবে এর আইনি কাঠামো কী হবে এবং তা আর্থিক গ্যারান্টির বিকল্প হিসাবে কতটা কার্যকর হবে, সেটি এখনো নির্ধারিত হয়নি।
বিমানের অর্থ পরিশোধ নিশ্চিত করতে ‘পারফরম্যান্স সিকিউরিটি’ রাখার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বিমান অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ওই নিরাপত্তা জামানত থেকে অর্থ সমন্বয়ের সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে জামানতের পরও ঘাটতি থাকলে পরবর্তী ব্যবস্থা কী হবে, সেটিও চূড়ান্ত হয়নি।
এছাড়া বিমানের বিদ্যমান ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক দায়ের ক্ষেত্রে ‘লায়াবেলিটি ফ্রিজ’ রাখার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এই ফ্রিজ কতদিন কার্যকর থাকবে, ওই সময়ে দায় কীভাবে নিষ্পত্তি হবে এবং পরবর্তী সময়ে এসব দায়ের ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা হবে, তা নিয়েও সমঝোতা হয়নি।
থার্ড টার্মিনালের শেয়ার কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রেফারেন্সিয়াল শেয়ারের বিষয়টি মোটামুটি এগিয়েছে। তবে অন্যান্য আর্থিক ও বাণিজ্যিক শর্ত এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরিচালন ও আর্থিক কাঠামো চূড়ান্ত করা। চুক্তির আলোচনা এবং উদ্বোধনের প্রস্তুতি পাশাপাশি চলছে। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, আয় বণ্টন, বিমানের আর্থিক দায়, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি, লায়াবেলিটি ফ্রিজ ও সরকারের কমফোর্ট লেটার নিয়ে অগ্রগতি না হলে চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনে আরও সময় লাগতে পারে।

