অস্তিত্ব সংকটে রাজশাহীর ঐতিহ্যের সাক্ষী ঢোপকল
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ঢোপকল সংরক্ষণ করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নগরীর রাণীবাজারে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইতিহাস আর ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ রাজশাহী। উত্তরের প্রাণকেন্দ্র পদ্মা তীরের এই নগরী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত। দীর্ঘ সময় থেকেই জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রেও অগ্রগামী। সেই ঐতিহ্যেরই এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ঢোপকল। তবে অযত্ন আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে রাজশাহীর আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার এই স্মৃতিচিহ্ন।
১৯৩৭ সালে ঢোপকলের মাধ্যমে রাজশাহী শহরে আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সূচনা। কিন্তু সময়ের বিবর্তন, নগরায়ণ এবং দীর্ঘদিন সংস্কার না করার কারণে অস্তিত্ব সংকটে এখন এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা।
একসময় সুপেয় পানির নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল এই স্থাপনা। আধুনিক নাগরিক জীবনের সূচনার সাক্ষী হয়ে থাকা ঢোপকলগুলোর অধিকাংশই এখন অকার্যকর। কোথাও ভেঙে গেছে, আগাছায় ঢেকে গেছে, কোথাও নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। নগরীর বেলদারপাড়া, ফায়ার সার্ভিস মোড়, পাঠানপাড়া, রাণীবাজার, অলোকার মোড় ও কুমারপাড়াসহ হাতেগোনা কয়েকটি এলাকায় কিছু ঢোপকলের অস্তিত্ব নড়বড়ে অবস্থায় টিকে আছে। একসময় শহরজুড়ে অর্ধশতাধিক ঢোপকল থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র চার থেকে পাঁচটি।
এ অঞ্চলের ঐতিহ্য রক্ষায় কাজ করছে ‘রাজশাহী হেরিটেজ’। সংগঠনটির সমন্বয়ক আবদুল মান্নান বলেন, ঢোপকল রাজশাহীর নগর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তবে সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে এগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।
জানা গেছে, বিশ শতকের ত্রিশের দশকে শহরে নিরাপদ পানির তীব্র সংকট ছিল। পুকুর, কূপ ও অন্যান্য জলাধারের পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রায়ই কলেরা, আমাশয়সহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিত। এতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটত। পরে রাজশাহী তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান রায় ডি. এন. দাশগুপ্ত (১৯৩৪-১৯৩৯) রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় সুপেয় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেন।
সিদ্ধান্ত হয়, শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও জনবহুল এলাকায় ঢোপকল স্থাপন করা হবে, যেখানে মানুষ সহজেই বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করতে পারবেন। তারই বাস্তব রূপ এই ঢোপকল। ১৯৩৭ সালের আগস্ট মাসে মিনিস্ট্রি অব ক্যালকাটার অধীনে ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ নামে পানি শোধন ও সরবরাহ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হয় সেই সময়ে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক টাকা।
এই প্রকল্পের বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মহারানী হেমন্ত কুমারী। তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা অনুদান দেন, যা ছিল প্রকল্পটির সর্ববৃহৎ একক অনুদান। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জেলা বোর্ডের দেওয়া জমিতে নির্মিত পানি শোধনাগারের নাম রাখা হয় ‘মহারানী হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস’। পরে এর আওতায় নির্মিত পানিকলগুলো ‘হেমন্ত কুমারী ঢোপকল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান মিশুর কাছে বর্তমানে কতটি ঢোপকল রয়েছে তা জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। ঢোপকলগুলোর অবস্থান ও তালিকাসহ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। কয়েকটি সংরক্ষণও করা হয়েছে।
ঢোপকল ছিল তৎকালীন সময়ের অত্যাধুনিক পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থা। পানি শোধনাগারে প্রথমে পাথরকুচি ও বালির স্তরের মাধ্যমে পানি পরিশোধন করা হতো। এরপর সিমেন্টের তৈরি মোটা পাইপের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থিত ঢোপকলগুলোতে পানি সরবরাহ করা হতো। প্রতিটি ঢোপকলের ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৪৭০ গ্যালন। এর ভেতরে ‘রাফিং ফিল্টার’ থাকায় পানি আরও একবার পরিশোধিত হয়ে বের হতো। ফলে সরবরাহকৃত পানি ছিল নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা।
নগরবাসী দিনের যে কোনো সময় পানি সংগ্রহ করতে পারতেন। পানির মান নিশ্চিত করতে দুই মাস অন্তর ঢোপকল পরিষ্কার করা হতো এবং পরীক্ষাগারে পানির নমুনা পাঠিয়ে গুণগত মান যাচাই করা হতো। সে সময়ের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগ। স্থাপত্যের দিক থেকেও ঢোপকল ছিল ব্যতিক্রমী। প্রায় ১২ ফুট উঁচু ও চার ফুট ব্যাসের গোলাকার এসব স্থাপনা সিমেন্ট, ইটের খোয়া ও বিশেষ ঢালাই প্রযুক্তিতে নির্মিত হয়েছিল। ঢেউ খেলানো নকশার কারণে দূর থেকেই এগুলো সহজে চোখে পড়ত। প্রবীণদের মতে, একসময় ঢোপকল ছিল এলাকার পরিচয়ের অংশ। কোনো স্থানের ঠিকানা বোঝাতে পর্যন্ত ঢোপকলের নাম ব্যবহার করা হতো।
স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে ঘরে ঘরে পাইপলাইনে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হলে ঢোপকলের ব্যবহার কমে যায়। পরবর্তীকালে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নগর উন্নয়ন প্রকল্প এবং দখল-অবহেলার কারণে একে একে হারিয়ে যেতে থাকে এসব স্থাপনা। বর্তমানে যে কয়েকটি টিকে আছে, সেগুলোর অবস্থাও নাজুক।
ফোকলোর ও উন্নয়ন গবেষক এস এম তাহমিদ হাসান বলেন, রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ঢোপকল শুধু একটি পুরোনো পানির উৎস নয়, এটি আমাদের জলসভ্যতার প্রত্নস্মারক এবং ইতিহাস, প্রযুক্তি ও জনকল্যাণমূলক নেতৃত্বের এক অনন্য সাক্ষ্য। এর ইট-পাথরে লুকিয়ে আছে একটি সময়ের গল্প, যা রাজশাহীর ঐতিহ্য ও লোকস্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমান বলেন, ছোট আকারের স্থাপনা হওয়ায় এগুলোকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে গেজেটভুক্ত করা কিছুটা জটিল। তবে ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। রাসিক প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, সড়ক উন্নয়নের স্বার্থে প্রয়োজনে নগরীর কয়েকটি জায়গায় ঢোপকল স্থানান্তর করতে হয়েছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও নগরীর ইতিহাস তুলে ধরতেই নতুনভাবে কয়েকটি স্থাপন করা হয়েছে। আরও বেশ কয়েকটি ঢোপকল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
