না.গঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ খুন মামলায় কনডেম সেলের আসামি
ডিভিশন সুবিধা না পেয়ে ক্ষিপ্ত তারেক সাঈদ
পাঁচজন কারারক্ষী লাঠি দিয়ে হামলা চালিয়ে গুরুতর জখমের অভিযোগ স্ত্রীর * অভিযোগ অস্বীকার কারা কর্তৃপক্ষের
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদ মুন্সীগঞ্জ কারাগারে কনডেম সেলে বন্দি ছিলেন। সেখানে উগ্র ও বেপরোয়া আচরণের কারণে সম্প্রতি তাকে কিশোরগঞ্জ কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। কারা সূত্রে জানা যায়, ফাঁসির কাষ্ঠের মুখোমুখি হয়েও কারাগারের ভেতরে অবৈধ সুবিধা ভোগ ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালান তারেক সাঈদ। তার কক্ষ তল্লাশিতে বাধা দেওয়া, কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ দায়িত্বশীলদের গায়ে ময়লা পানি নিক্ষেপের মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি। কনডেম সেলে অবৈধভাবে বিলাসবহুল ও নিষিদ্ধ নানা সামগ্রীও ঢোকান। এসবের মধ্যে রয়েছে সুগন্ধি বোতল, ইলেকট্রিক ওয়াটার হিটার জগ এবং কার্টনভর্তি বিভিন্ন অবৈধ জিনিসপত্র।
কারাবিধি অনুযায়ী, এসব সামগ্রী রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কক্ষে নিষিদ্ধ পণ্য রাখা এবং উচ্ছৃঙ্খল আচরণসহ নানা কারণে কয়েকদিন আগে স্বজনদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ কারণে কারাবিধি লঙ্ঘনের মতো আচরণ করেছেন তিনি। তবে তারেক সাঈদের স্ত্রীর অভিযোগ, মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে কারারক্ষীদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার স্বামী। কারা মহাপরিদর্শকের কাছে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে জেল সুপার জান্নাত-উল ফরহাদের নির্দেশে কমপক্ষে পাঁচজন কারারক্ষী কারাগারের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে লাঠি দিয়ে হামলা চালিয়ে তার স্বামীকে গুরুতর আহত করেন। হামলায় তার স্বামীর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়।
জানা যায়, ২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জে বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনার পর ওই বছর মে মাসে গ্রেফতার করা হয় র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে। গ্রেফতারের পর থেকে তিনি রাজকীয় অবস্থাতেই ছিলেন কারা অভ্যন্তরে। বাসা থেকে রান্না করা খাবার যেত। সাধারণ কারাবন্দিদের জন্য বরাদ্দ খাবার খেতেন না তিনি। বিধি ভেঙে অনেকটা ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিদের মতোই সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন। সূত্র জানায়, তারেক সাঈদ দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে কারাগারে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন। সাক্ষাতের সময় কারারক্ষীরা তার স্ত্রীর নাম নথিভুক্ত করতে চাইলে তিনি রাগান্বিত হয়ে কর্মকর্তাদের বলতেন, ‘লিখে নাও, মায়া চৌধুরীর মেয়ে।’ ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর চিত্র পালটে যায়। তিনি তার সুবিধামতো চাইলেই সব পাচ্ছিলেন না।
মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার জান্নাত-উল ফরহাদ মঙ্গলবার যুগান্তরকে জানান, মৃত্যুদণ্ডের আসামিদের ডিভিশন দেওয়ার বিধান না থাকলেও ২ সেপ্টেম্বর তারেক সাঈদ ডিভিশন দাবি করেন। এ নিয়ে কারারক্ষী ও কর্মকর্তাদের নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখান। এ বিষয়ে জেল সুপার তার বিরুদ্ধে কারা বিধি অনুযায়ী শাস্তিমূলক রিপোর্ট করেন। ওই রিপোর্টের প্রেক্ষাপটে সাজা হিসাবে আত্মীয়দের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ এক মাস বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কারা মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি জেল সুপারের : কারা মহাপরিদর্শকের কাছে এক অবহিতকরণ পত্রে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার জান্নাত-উল ফরহাদ জানান, ৫ জানুয়ারি প্রশাসনিক কারণে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে স্থানান্তরিত হন তারেক সাঈদ। কারাগারে আসার পর থেকেই তিনি নিয়মের তোয়াক্কা না করে মনগড়া চলাফেরা এবং অন্যদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ শুরু করেন। এমনকি নিজের কক্ষ তল্লাশিতেও তিনি অসহযোগিতা করেন। ২ সেপ্টেম্বর নতুন জেল সুপার অন্যান্য সেলে বন্দিদের পরিদর্শনে গেলে তারেক সাঈদ তার সঙ্গে চরম অশোভন আচরণ করেন এবং সেল এলাকা থেকে তাকে চলে যেতে বলেন। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের জেরে কারা কর্তৃপক্ষ বিধি অনুযায়ী তার এক মাসের পারিবারিক দেখাসাক্ষাৎ বন্ধ রাখার শাস্তি দেয়।
১৬ সেপ্টেম্বর জেল সুপার ও অন্য কর্মকর্তারা পুনরায় সেল এলাকায় সাপ্তাহিক পরিদর্শনে গেলে তার পাশের সেলে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি কামাল হোসেন পূর্বপরিকল্পিতভাবে কর্মকর্তাদের গায়ে ময়লাযুক্ত পানি নিক্ষেপ করেন। পরবর্তী সময়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে কয়েদি কামাল হোসেন জানান, ২ সেপ্টেম্বর তারেক সাঈদকে শাস্তি দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারেক সাঈদের ইন্ধনেই তিনি এ ঘটনা ঘটিয়েছেন। এর বিনিময়ে তারেক সাঈদ প্রতিদিন তার প্রাপ্ত সিগারেট কামাল হোসেনকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি আর্থিকভাবে সহায়তারও লোভ দেখান। কামাল আরও স্বীকার করেন, কারা কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অন্য লোক দিয়ে আদালতে মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করার পরিকল্পনাও ছিল তারেক সাঈদের।
অবহিতকরণপত্রে আরও জানানো হয়, ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষ কয়েদি কামাল হোসেনকে এক মাসের ডান্ডাবেড়ি পরানোর পাশাপাশি অন্য কারাগারে বদলির নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে তারেক সাঈদের এক মাসের জন্য সব ধরনের যোগাযোগ (টেলিফোন ও পারিবারিক সাক্ষাৎ) বন্ধ রাখার শাস্তি কার্যকর করা হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি তারেক সাঈদ। ১৬ সেপ্টেম্বর কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সেল পরিদর্শনে গেলে তারেক সাঈদ পার্শ্ববর্তী সেলের অপর এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে সঙ্গে নিয়ে কর্মকর্তা ও রক্ষীদের গায়ে ময়লা ছিটিয়ে দেন। এ ঘটনার জেরে আসামিকে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে কিশোরগঞ্জে বদলি করা হয়।
মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার জান্নাত-উল ফরহাদ যুগান্তরকে বলেন, তারেক সাঈদ সব সময় কারাগারে আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করেন। অতীতেও তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় টিভি, ফ্রিজসহ নানা অবৈধ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
এদিকে কারা অভ্যন্তরে তারেক সাঈদকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে এআইজি (প্রিজন্স) মাসুদ হাসান জুয়েল যুগান্তরকে বলেন, অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কারাবিধি অনুযায়ী তাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী তিনি এখন কিশোরগঞ্জের কারাগারে আছেন।

