Logo
Logo
×
   

Advertisement

শেষ পাতা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

মামলা তদন্তের অগ্রগতি কম, ‘বাণিজ্য’ বেশি

Advertisement

সিরাজুল ইসলাম

সিরাজুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মামলা তদন্তের অগ্রগতি কম, ‘বাণিজ্য’ বেশি

Advertisement

রক্তঝরা চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী দিনগুলো দেশের মানুষের কাছে এক আকাশ প্রত্যাশার হাতছানি নিয়ে হাজির হয়। গণমানুষ আশায় বুক বাঁধে সর্বক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কোথাও আইনের ব্যত্যয় ঘটবে না। মানুষ তার অধিকার ফিরে পাবে। অথচ সেই আকাঙ্ক্ষার জায়গায় এখন থাবা বসিয়েছে এক নির্মম বাস্তবতা।

ওই ঘটনায় গণহত্যা, সহিংসতার বিচার দাবিতে দায়ের মামলাগুলো হাতিয়ার করে ঢাকাসহ সারা দেশে এখন শুরু হয়েছে নজিরবিহীন ‘গ্রেফতার বাণিজ্য’। এতে ভুক্তভোগী, নিরপরাধ আসামিদের অনেকের দিন কাটছে এখন থানা-আদালতের বারান্দায়। মূলত তদন্তাধীন মামলাই কিছু অসাধু পুলিশ সদস্য ও দালালচক্রের প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।

মামলা ঝুলিয়ে রেখে গ্রেফতারের ভয় দেখানো, রিমান্ডের হুমকি এবং জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তির আগে শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখানোর আশ্বাস দিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে জুলাই হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও অন্যান্য অপরাধে দায়ের করা হয় ১ হাজার ৮৮০টি মামলা। বৈষম্যবিরোধী অন্দোলনের ঘটনায় হত্যা মামলা ছাড়া অন্যান্য মামলা হয়েছিল ১ হাজার ৭৭টি। ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৮৮০টি মামলার মধ্যে প্রতিবেদন হয়েছে ৩৫২টির।

প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, গত দুই বছরের বেশি সময়ে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মামলা মাত্র নিষ্পত্তি (ফাইনাল রিপোর্ট ও চার্জশিট) হয়েছে। এ হিসাবে ৮১ দশমিক ৩ শতাংশ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। অপরদিকে হত্যা মামলা হয়েছিল ৮০৩টি, এগুলোর মধ্যে ১৪৭টি নিষ্পত্তি (ফাইনাল রিপোর্ট ও চার্জশিট) হয়েছে। হত্যা এবং অন্যান্য মিলিয়ে মোট চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ২৭০টি মামলায়। এর মধ্যে ৯৪টি হত্যা মামলায় চার্জশিট হয়েছে।

প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, হত্যা মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৮১ দশমিক ৭ শতাংশ হত্যা মামলার তদন্ত এখনো ঝুলে আছে।

নিষ্পত্তি হওয়া হত্যা মামলার মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ৯৪টি এবং ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে ৫৩টিতে। প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, ৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ হত্যা মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আর ফাইনাল রিপোর্ট হয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ মামলায়।

বর্তমানে ১ হাজার ৫২৮ মামলার তদন্ত চলমান। তদন্তাধীন মামলাগুলোর মধ্যে হত্যা মামলা ৬৫৬টি। হত্যা মামলা ছাড়া হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২০৫টি। নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ১৭৬টিতে। আর ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে ২৫টি মামলায়। হত্যা মামলায় সাত হাজার ৫২৫ জন এবং এবং অন্যান্য মামলায় ১৩ হাজার ৮৭১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে চার্জশিটভুক্ত আসামির সংখ্যা ২১ হাজার ৩৯৬ জন।

তদন্ত বাণিজ্য : জানা যায়, মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। অনেক ক্ষেত্রে নাম না থাকলেও অজ্ঞাতনামা আসামির ভয় দেখিয়ে টার্গেট ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। সচ্ছল ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, সাবেক স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী বা প্রবাসী পরিবারের সদস্যদের টার্গেট করা হয়।

পুলিশি ধরপাকড়ের সময় মধ্যস্থতাকারীদের (দালাল বা স্থানীয় প্রভাবশালী) মাধ্যমে থানায় দরকষাকষি হয়। টাকা দিলে রাতেই ‘নির্দোষ’ সার্টিফিকেট দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর না দিলে চালান করা হয় আদালতে।

গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে এমনই এক ঘটনার তথ্য আসে যুগান্তরের হাতে। একটি আবাসিক এলাকা থেকে দুই ভাইকে আটক করে ভাটারা থানা পুলিশ। তাদের মধ্যে একজন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং অপরজন সদ্য বিবাহিত। দুজনই রাজধানীর নিকুঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। তাদের একজন চাচা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

আটকের পর তাদের থানা থেকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরিবার অনেক কষ্ট করে ৫ লাখ টাকার ব্যবস্থা করার পর একজন মুক্তি পান থানা থেকে। বড় ভাইকে পেন্ডিং মামলায় চালান দেওয়া হয়। পরে যাতে বড় ভাইকে নতুন করে কোনো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো না হয়, সেজন্য স্বজনদের আরও দুই লাখ টাকা দিতে হয়। ৬ মাস কারাভোগের পর আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

এ বিষয়ে ভাটারা থানার তৎকালীন ওসি (পরে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি হন, ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়) রাকিবুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিনই অনেক ধরনের ঘটনা ঘটে, তাই সুনির্দিষ্টভাবে ঘটনাটি আমার মনে আসছে না। আমি তো সরাসরি কাউকে গ্রেফতার করি না। আসামি ধরেন অফিসাররা।’ টাকার বিনিময়ে থানা থেকে আসামি ছেড়ে দেওয়া এবং শ্যোন অ্যারেস্ট না দেখানোর বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মামলার আরেক ভুক্তভোগী ভাটারার নাছির উদ্দিন। গুরুতর অসুস্থ এই প্রবীণ একটি হত্যাচেষ্টা মামলা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহারের জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কার্যালয়ে লিখিত আবেদন জমা দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাইয়ের একটি ঘটনায় তাকে ৯২ নম্বর মামলার আসামি করা হয়েছে। অথচ ঘটনার দিনে তিনি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য ওই এলাকায় উপস্থিত ছিলেন না।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে লিভারসিরোসিসসহ নানা জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত। ২০১৭ সাল থেকে ভারতে তার চিকিৎসা চলছে। মামলা থাকায় তিনি চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যেতে পারছেন না। তিনি সম্প্রতি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন উল্লেখ করে জানান, তিনি বা তার পরিবার কখনোই আওয়ামী লীগ বা এর কোনো অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মামলাগুলোয় গ্রেফতার ব্যক্তিরা উচ্চ বা নিু আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারাগার থেকে বের হতে পারছেন না। কাগজে-কলমে জামিন হওয়ার পরও কারামুক্তি পেতে ৫ ধাপের প্রক্রিয়া পার হতে হয়। ভুক্তভোগী ও কারামুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ, থানায ঘুসের টাকা না দিলে এই পাঁচ স্তরের কোনো-না-কোনো ধাপে ফাইল আটকে রাখা হয়। আর এই সুযোগে অন্য কোনো থানায় নতুন মামলা সাজিয়ে তাকে নতুন করে গ্রেফতার দেখানো হয়।

ঢাকার শাহজাহানপুর এলাকার এক মাংস ব্যবসায়ী যুগান্তরকে জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার করার পর তিনি আদালত থেকে জামিন পান। কিন্তু জেলগেট থেকে বের হওয়ার আগেই তাকে আরও তিনটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। পরে আইনজীবীর মাধ্যমে থানা ও তদন্ত কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে তাকে মুক্তি পেতে হয়েছে।

সিলেটের এক ভুক্তভোগী যুগান্তরকে জানান, পেশাগত কাজে ঢাকায় অবস্থানকালে ২ জুলাই রাজধানীর একটি শপিংমল এলাকা থেকে গ্রেফতার হন দুই যুবক। জুলাই আন্দোলনের সময় তারা ছিলেন সিলেটে। অথচ গ্রেফতারের পর তাদের রামপুরা থানায় হওয়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এক হত্যা মামলায় আসামি দেখিয়ে চালান করা হয়। ওই মামলায় দুই মাসের বেশি কারাভোগের পর তারা জামিন পান।

এরপর যাতে তাদের অন্য কোনো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো না হয়, সেজন্য পুলিশ কর্মকর্তাকে মোটা অঙ্কের টাকাও দেওয়া হয়। এরপরও তাদের অন্য একটি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। যে কারণে জামিন পেলেও মুক্তি মেলেনি তাদের। পরে পুলিশ কর্মকর্তাকে দেওয়া ওই টাকা ফিরিয়ে নেয় ভুক্তভোগী পরিবার।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক হয়রানির উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে দুই যুবককে একের পর এক মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করছে পুলিশ। দায়িত্বশীল কয়েকজন কর্মকর্তা বড় অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে ‘উপর মহলের চাপ’ রয়েছে দাবি করে কোনো ধরনের সহযোগিতা করেননি।

পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে কোনো পুলিশ সদস্যের ছাড় পাওয়ার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান যুগান্তরকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলোয় শুরুতে বাদীরা এক ধরনের বাণিজ্য করেছে। বিষয়টি পুলিশের নজরে আসার পর সেটি বন্ধ হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঝুলে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে মাঠপর্যায়ে তদন্তকাজে গতি এসেছে।’

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম