কীর্তিপাশার জঙ্গলে সতীদাহের বেদি
Advertisement
মনিকা চৌধুরী, বরিশাল
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বরিশালের ঝালকাঠির কীর্তিপাশায় টিকে থাকা সতীদাহের বেদি -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘন জঙ্গলের নীরবতায় দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো ইতিহাস-সতীদাহের বেদি। ঝালকাঠীর কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ির ভেতরে, বহু সময় পেরিয়ে এখনো টিকে আছে সেই বেদি, যেখানে প্রায় দুইশ বছর আগে সবশেষ ঘটেছিল সহমরণের মর্মান্তিক ঘটনা। অবশ্য এর আগেও এখানে হয়েছে সতীদাহ। বহু নারীকে এই বেদীতে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে মৃত স্বামীর শেষ যাত্রায়। যে স্মৃতি ইতিহাস হয়ে এখনো ঘোরে সেখানকার মানুষের মুখে মুখে। বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহাসিক স্মৃতি।
কীর্তিপাশা জমিদার বাড়ির জঙ্গলে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে ঘন গাছপালা আর ঝোপঝাড়ে ঘেরা অবস্থায় পড়ে আছে বেদীটি। কোনো প্রকার সংরক্ষণ বা পরিচর্যার চিহ্ন নেই সেখানে। অবহেলা আর অযত্নে ঢাকা পড়ে আছে এই কালের সাক্ষী। ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে পিরোজপুরমুখী সড়ক ধরে কিছুটা এগোলেই কীর্তিপাশা ইউনিয়ন। একসময় এই এলাকাতেই গড়ে উঠেছিল জমিদার বাড়ি, যার ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছিল সহমরণের এই বেদি। এখন সেখানে মানুষের বসবাস থাকলেও, ইতিহাসের এই অংশটি রয়ে গেছে প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বিক্রমপুর পোরাগাছার রাজা কৃষ্ণরাম বরিশাল অঞ্চলে আসেন। ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে তিনি জলাশয় ও বনভূমি তালুক নিয়ে জমিদারি স্থাপন করেন। তার দুই ছেলে কৃষ্ণ কুমার সেনগুপ্ত ও দেবীচরণ সেনগুপ্তের জন্য নির্মাণ করেন দুটি বাড়ি। একটি পূর্ববাড়ি অপরটি পশ্চিমবাড়ি। পরে তা দশ আনা বড় হিস্যা ও ছয় আনা ছোট হিস্যা জমিদার বাড়ি নামে পরিচিতি পায়। কালের পরিক্রমায় ছোট হিস্যার কোনো চিহ্ন আজ নেই। তবে ভগ্নদশায় থাকা নাট মন্দির, হলঘর, ছোট মন্দির, শান বাঁধানো পুকুর ঘাট নিয়ে এখনো টিকে আছে বড় হিস্যা। সেখানে এখন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছে।
ইতিহাস বলে, দেবীচরণ সেনগুপ্তের প্রপৌত্র ছিলেন কালী প্রসন্ন কুমার। তার স্ত্রী ছিলেন হরসুন্দরী দেবী। কালী প্রসন্ন কুমারকে তার গুরুদেব এবং ভুষন্ডির তৎকালীন জমিদার ষড়যন্ত্র করে এক কর্মচারীকে দিয়ে খাদ্যে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। এই মৃত্যুর দায় ষড়যন্ত্র করে তার স্ত্রী হরসুন্দরী দেবীর ওপর চাপায় কুচক্রিমহল। অপবাদ সহ্য করতে না পেরে নিজের সতিত্ব প্রমাণে ১৮২৮ সালে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেন জমিদারপত্নী।
তৎকালীন বরিশাল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার গ্যারট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাকে থামানোর চেষ্টা করলেও দেরিতে পৌঁছানোর কারণে ব্যর্থ হন। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে যে, পরে তিনি জমিদার দম্পতির শিশুসন্তানকে নিজের কাছে নিয়ে যান এবং সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। তাকে শিক্ষিত করে গ্যারট তার পৈতৃক ভিটা ‘নাবালক বাবুর লজ’ নামে প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমানে সেই সহমরণের বেদীটি জমিদার বাড়ির ধ্বংসাবশেষের পাশে জঙ্গলের মধ্যে টিকে থাকলেও, এর সংরক্ষণে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।
জমিদারের বর্তমান বংশধর তপন সেনগুপ্ত বলেন, বংশ পরম্পরায় শুনে এসেছি ইতিহাসের এই সত্য ঘটনা। নতুন প্রজন্ম খুব কমই জানে এই বিষয়ে। আমরা চেষ্টা করেছি নিজেদের মতো করে সংরক্ষণ করার। কিন্তু আগের সেই দিনও নেই যে, নিজ উদ্যোগে সব করা সম্ভব হবে। এর সংরক্ষণে সরকার বা সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া খুব দরকার।
এ বিষয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক দেবাশীষ চক্রবর্তী বলেন, ইতিহাস সু-ইতিহাসও হতে পারে, কু-ইতিহাসও হতে পারে। যেটাই হোক, ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সহমরণের মতো কুপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। ১৮২৯ সালে রাজা রামমোহন রায় ও লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের উদ্যোগে এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাত ধরে বাংলার রেনেসাঁর যুগের প্রচলন ঘটে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে রাখতে হবে। এজন্য অবশ্যই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
অযত্ন আর অবহেলার স্তর ভেদ করে এখনও টিকে আছে ইতিহাসের এই নিঃশব্দ সাক্ষী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুছে যাওয়ার আগেই কীর্তিপাশার এই সতীদাহের বেদীকে সংরক্ষণে প্রয়োজন জরুরি উদ্যোগ-এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
