Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

যশোরের ঐতিহ্য গুড়ের হাঁড়িতে সংকটের আঁচ

Advertisement

Icon

রাশেদুল ইসলাম, জবি

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যশোরের ঐতিহ্য গুড়ের হাঁড়িতে সংকটের আঁচ

যশোরের গাছি খেজুরগাছ কেটে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন -যুগান্তর

Advertisement

হেমন্তের শিশিরভেজা নরম ভোর। ঘাসের ডগায় জমে আছে মুক্তার মতো শিশিরকণা। কুশায়া ভেঙে মেঠোপথ ধরে এগোলেই চোখে পড়ে খেজুরগাছ। গাছে বাঁধা মাটির হাঁড়িতে রাতভর জমেছে খেজুরের মিষ্টি রস। ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা। কোথাও চলছে রস জ্বালের প্রস্তুতি। কোথাও তৈরি হচ্ছে সুগন্ধি নলেন গুড় ও পাটালি। এই চিরচেনা দৃশ্য বাংলার শীতকালীন লোকজ সংস্কৃতির অংশ। আর এই ঐতিহ্যের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে যশোরের নাম।

‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’-প্রবাদ এ অঞ্চলেরই প্রতিচ্ছবি। খেজুরের রস ও গুড় শুধু এখানকার বাসিন্দাদের খাদ্য-সংস্কৃতির অংশ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতি, পারিবারিক জীবিকা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলমান কারিগরি জ্ঞান। একসময় যশোরের খেজুরের গুড় থেকে চিনি উৎপাদিত হতো। সেই চিনি বিদেশেও রপ্তানি হতো। সময়ের সঙ্গে সেই শিল্পের ব্যাপ্তি কমেছে। তবে গুড়ের কদর এখনো রয়েছে।

এই ঐতিহ্য নতুন করে পরিচিতি পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতির মাধ্যমে। কিন্তু স্বীকৃতির আড়ালে রয়েছে একাধিক সংকট। দিনে দিনে কমছে গাছ ও পেশাদার গাছির সংখ্যা। বাজারে ভেজাল গুড়ের অভিযোগও রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাঁচা খেজুরের রসে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি। সব মিলিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।

ইতিহাসবিদ সতীশচন্দ্র মিত্রের ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি অনুসারে, ১৯০০-১৯০১ সালে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে প্রায় ২২ লাখ মন খেজুরের গুড় উৎপাদিত হয়েছিল। বৃহত্তর যশোর ছিল এ উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে খেজুরের গুড়ের ব্যবহার শুধু ঘরোয়া খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। গুড় থেকে চিনি তৈরির বাণিজ্যিক উদ্যোগও গড়ে উঠেছিল। ১৮৭৪ সালে কোটচাঁদপুর এলাকায় ৬৩টি চিনি কারখানা চালু ছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। একপর্যায়ে ঐতিহ্যবাহী অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তবে শিল্পের সেই অধ্যায় শেষ হলেও খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি। ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘যশোরের খেজুরের গুড়’ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসাবে স্বীকৃতি পায়। কার্তিক মাস থেকে শুরু হয় গাছ প্রস্তুতির কাজ। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছ থেকে রস সংগ্রহ করা হয়। শীতের সকালে এই রস ঘিরে গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সংগ্রহ করা রস বড় কড়াইয়ে ঢেলে চুলায় জ্বাল দেওয়া হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি করা হয় ঝোলা গুড়, দানা গুড় কিংবা পাটালি। রসের ঘনত্ব, জ্বাল দেওয়ার সময়, আগুনের তাপমাত্রা ও নাড়াচাড়ার কৌশল গুড়ের স্বাদ, রং ও গঠনে প্রভাব ফেলে। ফলে গুড় উৎপাদন শুধু কৃষিজ পণ্য তৈরির প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি লোকায়ত কারিগরি ঐতিহ্যও।

খেজুরের গুড় উৎপাদনের প্রধান উপকরণ খেজুরগাছ। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এ গাছের সংখ্যা ও বিস্তৃতি চাপের মুখে পড়ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সড়ক সম্প্রসারণ, বসতবাড়ি নির্মাণ এবং কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তনের কারণে অনেক এলাকায় গাছ কাটা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ইটভাটায় জ্বালানি হিসাবেও এ গাছ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, নতুন করে খেজুরগাছ রোপণ ও পরিচর্যার উদ্যোগ পর্যাপ্ত না হলে পুরোনো গাছ হারানোর ক্ষতি পূরণ করা কঠিন। এখানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীবিকার প্রশ্নও জড়িত। খেজুরগাছ টিকে থাকলে গাছিদের কাজের সুযোগ থাকে। গাছি থাকলে রস সংগ্রহ হয়। আর রস সংগ্রহ হলে গুড় উৎপাদন ও বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এই পুরো ব্যবস্থার একটি অংশ দুর্বল হয়ে পড়লে অন্য অংশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

খেজুরের গুড়ের চাহিদা বাড়লে বাজারে বিশুদ্ধ পণ্যের পাশাপাশি নিম্নমানের বা ভেজাল পণ্য বিক্রির ঝুঁকিও বাড়ে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী গুড় তৈরিতে অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম রং, ফ্লেভার ও বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থও মেশানোর অভিযোগ ওঠে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন গাছি, ক্ষদ্র্র উদ্যোক্তা ও ভোক্তা-সবাই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যশোরের খেজুরের রস ও গুড়ের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে খেজুরগাছ সংরক্ষণ ও নতুন চারা রোপণ জরুরি। গাছিদের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ সরঞ্জাম এবং উৎপাদিত গুড়ের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভেজাল প্রতিরোধে নজরদারি বাড়াতে হবে। উৎপাদকদের মানসম্মত গুড় তৈরি, প্যাকেজিং ও বিপণনে সহায়তাও প্রয়োজন।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, যশোরের খেজুর গুড়ের যেমন সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। জিআই পণ্য হিসাবে নিরাপদ রস ও ভেজালমুক্ত গুড় উৎপাদনে গাছিদের প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং উঠান বৈঠকের মাধ্যমে আমরা উৎসাহিত করছি।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

মেঘনা পাড়ের ৬ পয়েন্টে নিলামের বাজার নিষেধাজ্ঞার ইলিশ নিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য

নিষেধাজ্ঞার ইলিশ নিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য

যশোরের ঐতিহ্য গুড়ের হাঁড়িতে সংকটের আঁচ

যশোরের ঐতিহ্য গুড়ের হাঁড়িতে সংকটের আঁচ

বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস আজ হতদরিদ্রদের অর্ধেকই পান না সামাজিক সুরক্ষা

হতদরিদ্রদের অর্ধেকই পান না সামাজিক সুরক্ষা

দিনমান পরিশ্রমেও ঘোচে না দারিদ্র্য

দিনমান পরিশ্রমেও ঘোচে না দারিদ্র্য

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম