Logo
Logo
×
   

শেষ পাতা

২৩ শর্তে সমাবেশের অনুমতি

আওয়ামী লীগকে ২ বিএনপিকে ৩ ঘণ্টা সময় পুলিশের

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগকে ২ বিএনপিকে ৩ ঘণ্টা সময় পুলিশের

রাজধানীতে সমাবেশ করার জন্য আওয়ামী লীগকে দুই ঘণ্টা এবং বিএনপিকে তিন ঘণ্টা সময় দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। উভয় দলকে সমাবেশের জন্য ২৩ শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অনুমতিসংক্রান্ত আলাদা চিঠিতে বিএনপিকে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা এবং আওয়ামী লীগকে বেলা ৩টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সমাবেশ করার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সোমবার মৌখিক অনুমতির পর মঙ্গলবার ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের পক্ষে তার বিশেষ সহকারী সৈয়দ মামুন মোস্তফা দল দুটিকে লিখিত অনুমতি দিয়েছেন। 

রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপিকে এবং জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগকে শান্তি সমাবেশ করার স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ডিএমপির শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে-শর্তাবলি যথাযথভাবে পালন করতে হবে; অনুমোদিত স্থানে সমাবেশের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে হবে; সমাবেশ শুরুর দুই ঘণ্টা আগে লোকজন সমবেত হওয়ার জন্য আসতে পারবে; অনুমোদিত সময়ের মধ্যে সমাবেশের সার্বিক কার্যক্রম শেষ করতে হবে; কোনো অবস্থাতে মূল সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না; আইনশৃঙ্খলাপরিপন্থি এবং জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কার্যকলাপ করা যাবে না; রাষ্ট্রবিরোধী কোনো কার্যকলাপ ও বক্তব্য দেওয়া যাবে না; উসকানিমূলক কোনো বক্তব্য প্রদান বা প্রচারপত্র বিলি করা যাবে না; কোনো ধরনের লাঠিসোঁটা বা ব্যানার, ফেস্টুন বহনের আড়ালে লাঠি, রড ব্যবহার করা যাবে না; আইনশৃঙ্খলা অবনতি ও কোনো বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবেন; শব্দদূষণ প্রতিরোধে সীমিত আকারে মাইক বা শব্দযন্ত্র ব্যবহার করতে হবে, কোনোভাবেই অনুমোদিত স্থানের বাইরে মাইক বা শব্দযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না; অনুমোদিত স্থানের বাইরে প্রজেক্টর স্থাপন করা যাবে না; অনুমোদিত স্থানের বাইরে রাস্তায় ফুটপাতে কোথাও লোক সমবেত হওয়া যাবে না; আজান, নামাজ ও ধর্মীয় সংবেদনশীল সময় মাইক বা শব্দযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না; ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত আসতে পারে এমন কোনো ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন, বক্তব্য প্রদান বা প্রচার করা যাবে না; সমাবেশের কার্যক্রম ছাড়া মঞ্চকে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না; নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করতে হবে; স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থল ও এর চারদিকে পর্যাপ্ত উন্নত রেজুলেশনযুক্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে; নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশে আগতদের হ্যান্ড হেড মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে চেকিং করতে হবে; নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখতে হবে; উল্লিখিত শর্তাবলি যথাযথভাবে পালন না করলে তাৎক্ষণিকভাবে এ অনুমতির আদেশ বাতিল বলে গণ্য হবে; জনস্বার্থে কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে এ অনুমতির আদেশ বাতিল করার ক্ষমতা সংরক্ষণ করে।

বিএনপির সমাবেশ ঘিরে নাশকতার আশঙ্কা নেই : ‘বিএনপির সমাবেশে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটবে এবং এ সমাবেশকে ঘিরে কোনো ধরনের নাশকতার আশঙ্কা নেই। তাই কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হবে না। তবে পুলিশ অত্যন্ত সতর্ক অবস্থায় থাকবে। রাজধানীজুড়ে পুলিশের প্রায় ২০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হবে। সমাবেশ ড্রোন দিয়ে নজরদারি করা হবে।’ 

আজ নয়াপল্টনে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশ উপলক্ষ্যে যুগান্তরের কাছে এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। জানা গেছে, অতীতে বিভিন্ন সময় বিরোধী দলের সমাবেশের আগে মহানগরীতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হলেও এবার তা করা হবে না। ডিএমপির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সমাবেশস্থল ও আশপাশে থাকবে বিপুলসংখ্যক সিসি ক্যামেরা। ক্যামেরা দিয়ে সমাবেশ মনিটরিং করা হবে। সমাবেশস্থলের আশপাশের বহুতল ভবনগুলোতে বসানো হবে ওয়াচ টাওয়ার। সেখান থেকে শক্তিশালী বাইনোকুলার লাগানো স্নাইপার রাইফেল দিয়ে পুরো এলাকার ওপর নজরদারি করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের পক্ষ থেকে পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে রিজার্ভ রাখা হচ্ছে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সমাবেশস্থল ও তার আশপাশে এবং ঢাকার প্রতিটি প্রবেশপথে বাড়তি চেকপোস্ট বসানো হবে। যাতে অবৈধ কোনো কিছু নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কেউ সমাবেশে যোগ দিতে না পারে। চেকপোস্টগুলোতে হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও বস্তুতে তল্লাশি চালানো হবে। এছাড়া সমাবেশস্থল ও আশপাশের এলাকা ডগ স্কোয়াড দিয়ে তল্লাশি চালানোর কথা রয়েছে। 

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন আর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, বুধবার দুটি বড় রাজনৈতিক দলের বৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমাবেশস্থল কাছাকাছি। সমাবেশ দুটি ঘিরে আমরা নিরাপত্তা ছক প্রণয়ন করেছি। ইতোমধ্যে আমরা দুটি সমাবেশের স্থান পরিদর্শন করেছি। সমাবেশস্থলের আশপাশে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। ইতোমধ্যে পোশাকে এবং সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যরা কাজ শুরু করেছেন। আশা করছি-কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই সমাবেশ শেষ হবে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার খন্দকার মহিদ উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, সমাবেশ ঘিরে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয় সেজন্য পুলিশ যথেষ্ট তৎপর। যে কোনো পরিস্থিতিতে পুলিশ পেশাদারিত্ব ও আইনানুগ দায়িত্ব পালন করবে। 

ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার (ডিসি) ফারুক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সমাবেশকে ঘিরে আমরা সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছি। কেউ গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসন্ত্রাস বা নাশকতা সৃষ্টি করতে পারে কিনা সে বিষয়ে গোয়েন্দারা কাজ করেছেন। এখনো পর্যন্ত অপ্রীতিকর কোনো কিছুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। সমাবেশ ঘিরে ঢাকার বাইরে থেকে পুলিশ সদস্যদের আনা হবে কিনা-জানতে চাইলে ফারুক হোসেন বলেন, বাইরে থেকে কোনো সদস্য আনার প্রয়োজন নেই। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং অফিস আদালত চালু রাখাসহ নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। 

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, সমাবেশে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে র‌্যাবের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। প্রস্তুত থাকবে হেলিকপ্টার; র‌্যাবের স্পেশাল টিম, ডগ স্কোয়াডসহ সব ইউনিট। সমাবেশের ওপর নজরদারি করতে প্রয়োজনে ড্রোন ব্যবহার করা হবে। 

ডিএমপির অপরাধ বিভাগের একজন ডিসি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের পালটাপালটি সমাবেশ নিয়ে তারা যথেষ্ট চাপে রয়েছেন। আওয়ামী লীগ তাদের সমাবেশস্থল বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে এক লাখ মানুষের জমায়েত করার টার্গেট নিয়েছে। একইদিনে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির সমাবেশ থেকে একদফা আন্দোলনের চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণার সময় বড় শোডাউনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অথচ দুটি সমাবেশস্থলের দূরত্ব গুগল ম্যাপ অনুযায়ী মাত্র দেড় কিলোমিটার। আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশে এক লাখ মানুষ জড়ো হলে এ ঢল ফকিরাপুল ছাড়িয়ে নয়াপল্টনের কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছবে। আবার বিএনপির সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হলে তার ঢেউ আরামবাগে আছড়ে পড়বে। বুধবার দুপুরে মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি সমাবেশ শান্তিপূর্ণ রাখা তাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, নয়াপল্টন, মতিঝিল, কাকরাইলের নাইটঙ্গেল ক্রসিং, ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা ও বায়তুল মোকাররমের চারপাশসহ নগরীর প্রায় তিন ডজন পয়েন্টে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্পর্শকাতর স্পটে মোতায়েন থাকবে গোয়েন্দা ওয়াচম্যান এবং ডিবির ভিডিও ও স্টিল ক্যামেরাম্যানরা। যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নাশকতার ছবি, ভিডিও ফুটেজ এবং তথ্য সংগ্রহ করবেন তারা। যাতে এসব ঘটনায় জড়িতদের পরবর্তী সময়ে সহজে শনাক্ত করা যায়।
 

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম