সোনারগাঁয়ের গৌরব
কালের সাক্ষী গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি
বছরজুড়ে ভক্ত-পর্যটকের পদচারণায় মুখর শাহচিল্লাপুর গ্রাম
Advertisement
আল আমিন তুষার, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া শাহচিল্লাপুর গ্রাম। এখানে রয়েছে মুসলিম বাংলার প্রাচীনতম নিদর্শন-স্বাধীন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি। ১৪শ শতকের এই শাসক শুধু রাজনীতিতেই নয়, কূটনীতি, সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষার উন্নতিতেও রেখেছিলেন অনন্য স্বাক্ষর। তার শাসনামল ছিল বাংলার ইতিহাসে শান্তি, স্থিতি ও সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই সমাধি নীরবে বয়ে বেড়াচ্ছে গৌরবময় অতীতের গল্প, যা আজও ইতিহাসপ্রেমীদের টানে। প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের পর্যটকরা এখানে ভিড় করেন।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন ইলিয়াস শাহী রাজবংশের তৃতীয় সুলতান। তার প্রকৃত নাম আজম শাহ। তিনি তার পিতা সুলতান সিকান্দর শাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১৩৮৯ সালে সিংহাসন দখল করেন। ক্ষমতায় আরোহণের পর নামের শুরুতে ‘গিয়াসউদ্দিন’ যোগ করেন। ১৪১০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা শাসন করেন। তার আমলে শিক্ষা-দীক্ষা, সাহিত্যচর্চা, চারু ও কারুকলার ব্যাপক উন্নতি হয়। তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারক শাসক। যুদ্ধের চেয়ে মিত্রতা ও কূটনীতির মাধ্যমে রাজ্যকে সমৃদ্ধ করতে তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন। তিনি সমসাময়িক চীন সম্রাট ইয়ংলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সাংস্কৃতিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন পারস্যের শীর্ষস্থানীয় চিন্তাবিদদের সঙ্গে। তিনি পবিত্র মক্কা ও মদিনায়ও দূত পাঠান। এই দুই শহরে ‘গিয়াসিয়া মাদ্রাসা’ নামে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে অর্থ দেন। সেখানকার বাসিন্দা ও হজযাত্রীদের জন্যও তিনি নানা উপহার পাঠান।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির ক্ষেত্রেও যথেষ্ট অবদান রাখেন। তিনিই প্রথম শাসক, যিনি বাংলা ভাষাকে সরকারি স্বীকৃতি দেন। এর আগে বাংলা ছিল অনাদৃত-অবহেলিত গরিব মানুষের ভাষা। বাংলাকে তিনি উপহার দেন প্রথম মুসলিম কবি। তার পৃষ্ঠপোষকতায় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর বিখ্যাত কাব্য ‘ইউসুফ জোলেখা’ রচনা করেন। তিনি রাষ্ট্রের টাকায় বাংলা ভাষার উন্নতির পথ উন্মুক্ত করে দেন। সুলতান কৃত্তিবাস ওঝাকেও বাংলায় ‘রামায়ণ’ অনুবাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ নিজেও বিদ্বান ও কবি ছিলেন। মাঝেমধ্যে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় কবিতা লিখতেন। পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে তার পত্রালাপ ছিল। একবার তিনি হাফিজের কাছে কবিতার একটি চরণ লিখে পাঠান এবং সেটিকে পূর্ণ করার জন্য কবিকে অনুরোধ জানান। তিনি তাকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণও জানান। হাফিজ দ্বিতীয় চরণটি রচনা করে কবিতাটি পূর্ণ করে পাঠান।
১৪১১ সালের নভেম্বরে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ মারা যান। তাকে সোনারগাঁয়ের শাহচিল্লাহপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়। সম্ভবত এ স্থানটিই ছিল সুলতানি শাহী প্রাসাদের অংশ অথবা কবরগাহ। আজ সবই বিলীন হয়ে গেছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১৯২০ সালের ২২ নভেম্বর ওই সমাধিকে অধিদপ্তরের পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকার। সর্বশেষ ১৯৮৫ সালে এ সমাধির সংস্কার হয়। সমাধিটি কালো কষ্টিপাথরের প্ল্যাটফর্মের ওপর স্থাপিত। এই প্ল্যাটফর্মের ওপর কালো পাথরের উঁচু খাড়া ভিত্তি। এটি ১০ ফুট লম্বা, ৫ ফুট চওড়া ও ৩ ফুট উঁচু। সমাধির ৩ ফুট উচ্চতার খিলানের ওপর আরও দেড় ফুট উচ্চতায় ৭ ফুট লম্বা অর্ধবৃত্তাকার কষ্টিপাথরে ঢাকা। মূল সমাধির কার্নিশে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকাজখচিত অলংকার। দুই পাশে রয়েছে তিনটি করে তিন খাঁজবিশিষ্ট খিলান। খাঁজের মধ্যে রয়েছে প্রলম্বিত শিকল ও ঝুলন্ত ঘণ্টার নকশা। সমাধিটি কালো পাথরে তৈরি বলে স্থানীয়রা একে ‘কালো দরগা’ নামে চিনে। পাথরের গায়ে এমন কারুকাজ করা মাজার দেশে বিরল। সমাধির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে একটি খাল। ধারণা করা হয়, শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ এ খাল খনন করেছিলেন।
কবি আবদুল হাই শিকদার তার ‘সোনারগাঁ : অন্তরে বাহিরে রূপকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, শাহিদা আখতার নামে এক গৃহবধূ স্বপ্নে দেখেন, কেউ তাকে আদেশ দিচ্ছেন আজ সূর্য হেলে যাওয়ার আগেই তিনি যেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মাজার জিয়ারত করেন। শাহিদার মতে, সোনারগাঁ এলাকায় বহু পীর-আউলিয়ার মাজার রয়েছে। তিনি গিয়াসউদ্দিন আজম শাহকে সুলতান হিসাবে নয়, কবি হিসাবে নয়, দরবেশ হিসাবে জানেন।
সেজন্যই দরবেশের মাজার জিয়ারতের জন্য তিনি ছুটে এসেছেন আজম শাহের মাজারে। আসার পথে যত মাজার পড়েছে, সব মাজারের দানবাক্সে টাকা দিতে দিতে এসেছেন। গ্রন্থে তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুধু শাহিদা নন, সোনারগাঁয়ের সব মানুষই সুলতানকে একজন উঁচুমানের দরবেশ হিসাবে জানেন। এজন্য প্রতিবছর গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মাজারে উরস হয়। সেই উরসে স্থানীয় লোকজন ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা ছুটে আসেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান, এই সমাধি পরিদর্শনে সারা বছরই পর্যটকরা মোগরাপাড়ার শাহচিল্লাপুর গ্রামে এসে ভিড় করেন। ফলে বছরজুড়েই মুখর থাকে এ গ্রাম।
ঢাকার মিরপুর থেকে সমাধি পরিদর্শনে আসা ইঞ্জিনিয়ার তানভীর আহাম্মেদ বলেন, দুই সন্তানকে নিয়ে সুলতানের সমাধি দেখতে এসেছি। ছেলেমেয়েদের বাংলার ইতিহাস ও শাসকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে চেষ্টা করছি।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা রহমান বলেন, আমরা এ সমাধির উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করে যাচ্ছি।
