গল্প
ফুজিসান
Advertisement
আকতার উজ্জামান চৌধুরী
প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিকাল ঠিক চারটা বাজলে প্রফেসরের চেম্বারের দরজায় তিনটা টোকা দিতাম। প্রফেসর ভেতর থেকে ‘হাই!’ বলে আওয়াজ দিলে ভেতরে ঢুকতাম কফি খাওয়ার জন্য। প্রফেসর শিনপেই ইয়ামাদা আমার পিএইচডি সুপারভাইজার, তিনি নিজেই ল্যাবরেটরিতে এসে কখনো কখনো আমাকে বিকালের টি-ব্রেকের আহ্বান করতেন এবং আমিও এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমার দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষের পেশা, অর্থনীতি, খাদ্যাভ্যাস, বিশ্ববিদ্যালয় এবং তার দেশের আচার, রীতিনীতি, তার যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে থাকার স্মৃতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি গল্প করতেন টি-ব্রেকে। মাত্র দুসপ্তাহ পেরোল জাপানের শিজুওকা ইউনিভার্সিটিতে আসা। অক্টোবর ২০০৪। সুপারভাইজারের সহানুভূতিশীল আচরণ আমাকে আন্তরিকভাবে তুষ্ট করেছিল। গল্পের ফাঁকে দুটি কাজ তিনি একসঙ্গে করতেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে আমার জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করতেন, আমাকে টি-ব্রেকে একটু সঙ্গও দিতেন, যাতে করে আগন্তুক হিসাবে আমার মধ্যে ল্যাবসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো অনীহা বা অনাগ্রহ তৈরি হতে না পারে। ষাট পেরোনো মানুষ তখনো যথেষ্ট কর্মঠ ও স্মার্ট। একইসঙ্গে দূরদর্শী ও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাসম্পন্ন। তার সঙ্গে গল্প করে মনে হতো বয়স শুধুই একটা সংখ্যা। আমার দেশে অধিকাংশ ষাটোর্ধ্ব মানুষ দুশ্চিন্তা, অসুস্থতা, পারিবারিক কলহ, আর্থিক টানাপোড়েন, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা নিয়ামকের কারণে ন্যুব্জ হয়ে পড়েন ও অন্যের বোঝায় পরিণত হন। এ দেশে সেই নিয়ামকগুলোর দৃশ্যত কোনো প্রভাব নেই।
এক বিকালে প্রফেসর আমার গান শোনা ও কবিতা লেখার শখ তখনো চলমান কিনা জানতে চাইলে আমি হতভম্ব হলাম। উনি এটা কী করে জানলেন? আমি শশব্যস্ত হয়ে সরলভাবে বললাম-‘এক সময় শখগুলো ছিল তবে এখন সময় হয় না।’ উনার শখ ছিল-ছবি তোলা, মাউন্টেইন ক্লাইম্ব করা, ঘুরে বেড়ানো। তিনি অনেকবার মিয়ানমার গিয়েছেন সেখানে বৌদ্ধদের অনেক তীর্থস্থান থাকায়। আমি বাংলাদেশে ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানালে তার দুঠোঁটে খুশির এক চিলতে হাসি ফুঠে ওঠে, আর চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে এক আবেশভরা হর্ষের আবহ। তিনি তার ডিজিটাল ক্যামেরায় মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, জাপানের ফুজিয়ামাসহ বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর ছবি দেখালেন। নিজ দেশে তখনো কারও হাতে আমি ডিজিটাল ক্যামেরা দেখিনি। আমাকে প্রস্তাব দিলেন মাউন্ট ফুজি ক্লাইম্ব করার। ভয়ে বুকের ভেতরটাধক্ করে উঠল, এটা কী করে সম্ভব! আমি কেন; উনিই-বা এ বয়সে তা সাহস করেন কী করে!
অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রস্তাব ফিরিয়ে না দিয়ে বললাম-‘আমি সমতল মাটিতে বেড়ে ওঠা মানুষ।’
প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন-‘লেট্স ট্রাই, অর লেট্স সি দ্যা সাইট্স।’
আমি উপর-নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করলাম। তিনি আমার সঙ্গে একজন বাংলাদেশি গবেষক ফেলো নিতে বললেন।
জাপানিজ খাবারে তখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। লাঞ্চ-ব্রেকে ইউনিভার্সিটির কো-অপে (ক্যান্টিন) জাপানিজদের হাষি (কাঠি) দিয়ে খাবার খাওয়া আড়চোখে দেখতাম আর বিস্মিত হতাম। খাবারের একটি দানাও থালা-বাটিতে অবশিষ্ট থাকত না। অথচ আমার দেশে হাত দিয়ে খাওয়া মানুষগুলো থালায় সামান্য উচ্ছিষ্ট রাখাকে এক ধরনের সভ্যাচার মনে করেন। আমি ডরমেটরিতে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ভাবলাম-দেশ থেকে পাঠানো আমার জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা শখগুলোর বিষয়েও প্রফেসরের ছিল বাড়তি নজর। যেন প্রফেসর নয় সে দেশের গোয়েন্দা প্রধান।
ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল ডরমেটরি থেকে ভোর পাঁচটায় বাইসাইকেলে রওয়ানা দিলাম নিকটবর্তী এক বৌদ্ধ উপাসনালয়ের দিকে, যেখানে অপেক্ষমাণ প্রফেসরের সঙ্গে তার গাড়িতে মাউন্ট ফুজির দিকে রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল। কথা ও সময়ের কোনো হেরফের হলো না। যাত্রা শুরু হলো এবং তিনি মাঝ রাস্তায় নিজ ল্যাবের একজন মাস্টার্স স্টুডেন্টকে গাড়িতে তুললেন, নাম কাতাওকা। আমিল্যাবে যোগদানের দ্বিতীয় দিন বিকালে পিপাসা পেলে কাতাওকাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম-‘ইজ দ্যা ট্যাপ ওয়াটার অফ আওয়ার ল্যাব ড্রিংক্যাবল?’
উত্তর না দিয়েই অত্যুৎসাহী কাতাওকা পালটা প্রশ্ন করেছিল-‘তোমাদের দেশে তাহলে তোমরা কিসের পানি খাও?’
প্রশ্নটি করে যেন আমি বোকা বনে গেলাম। আমি বর্ণনা দিয়ে তাকে টিউবওয়েল ওয়াটার কী তা বোঝাতে ব্যর্থ হলাম, সে আরও দুজনকে ডেকে এনে আমার কাছে টিউবওয়েল বোঝার চেষ্টা করে সফল হলো। আমি বিব্রত বোধ করলাম। সেই বিকালে প্রফেসর ল্যাবে ঢুকলে ওরা বিষয়টি তার সঙ্গে শেয়ার করল, তবে বিষয়টা তার একটুও মনোযোগ কাড়তে পারল না। সিনিয়র জাপানিজরা এক সময় নানা ধরনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজকের উন্নত জাপান প্রতিষ্ঠায় প্রাণান্তকর চেষ্টা করে গেছেন যার সুফল ভোগ করছে বর্তমান প্রজন্ম। অথচ আমার দেশে ট্যাপের পানি আজও পেয় হয়নি, তখন থেকে আজ কুড়ি বছর পরও ট্যাপের পানিতে পোকা, শেওলাসহ বিচিত্র বর্জ্য পদার্থের সন্ধান মেলে।
গাড়ির সামনে দুজন জাপানিজ ভাষায়, আর পেছনে আবিদ ভাই ও আমি, আমরা দুজন বাংলা ভাষায় প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কথোপকথন চালিয়ে নিচ্ছিলাম। কোনো পক্ষই কারও ভাষা বুঝছিল না। টিউবওয়েলের পানি নিয়ে কাতাওকার করা তাচ্ছিল্যের গল্প আবিদ ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করলাম। তিনি বাজে মন্তব্য করলেন। একপক্ষ আরেক পক্ষ সম্পর্কে বাজে মন্তব্য বা কটুকথা বললেও তা না বোঝার কারণে কারও বিরাগভাজন হওয়ার সম্ভবনা ছিল না। অবশ্য জাপানিজ ভাষা এতটাই কোমল ও ভদ্র যে কাউকে গালি দেওয়ার মতো কোনো শক্ত শব্দই নেই। অথচ ভাষা হিসাবে বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও গালাগালির শব্দগুলো এতটাই বেশি সমৃদ্ধ যে, তা ব্যবহার করে যে কাউকেই হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব। গাড়ি চলছে ফুজির দিকে, মাঝে মধ্যে ভেতরে আপাতশান্ত এক পরিবেশ। ফুজির কাছাকাছি আসতেই আশপাশের প্রকৃতির নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখে অভিভূত হলাম। শিজুওকা ও ইয়ামানাশি প্রিফেকচারের মাঝখানে অবস্থিত পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত এ ফুজি মাউন্টেইনকে জাপানিজরা ফুজিসান বলে ডাকে, যার উচ্চতা ৩.৭৭৬ কি.মি.। কাউকে সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে জাপানিজরা কোনো ব্যক্তির নামের শেষে সান বলে থাকে। মাউন্ট ফুজিকেও তাই।
প্রফেসর প্রশ্ন করলেন-‘আকতার সান, তোমাদের দেশে মাউন্টেইন আছে?’ বললাম-‘জি আছে।’
উচ্চতা কত এবং তোমার শহরে আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে আমি প্রত্যুত্তরে দেশের তাজিনডং (১.২৩ কি.মি.) শৃঙ্গ, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি এলাকা সম্পর্কে তার কাছে সবিস্তার বর্ণনা দিলাম। ইতোমধ্যে আমাদের গাড়ি আঁকাবাঁকা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফুজির বেজমেন্টে পৌঁছাল। বেজমেন্টে পর্যটকদের জন্য গাড়ি পার্কিংসহ কম্বিনিটরিয়াল শপ রয়েছে-যেখান থেকে জুস, পানি, ফলমূল কিনে যে যার ব্যাক-প্যাকে ভরে নিল। প্রফেসর তার গাড়ি থেকে মাউন্টেইন ক্লাইম্বিং সু ও স্টিক বের করে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী বিতরণ করলেন। আনুমানিক সকাল ৭টায় এন্ট্রান্স পেরোয়ে শুরু হলো আমাদের পর্বতারোহণ। আমি আর আবিদ ভাই বেশ উচ্ছ্বসিত। শুরুর দিকে পর্বতটার ঢাল খুব বেশি নয়, সমতলের চেয়ে সামান্য খাড়া। জাপানিজ গাইডসহ কিছু বিদেশি পর্যটকদের দেখা মিলল পাশে। প্রফেসর ইয়ামাদা ছিলেন আমাদের গাইড, যিনি এ পর্বতের শীর্ষে আরোহণ করেছেন কয়েকবার। আমি আর আবিদ ভাই একটু বেগবান পায়ে হেঁটে প্রফেসরের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব বাড়িয়ে ফেললাম।
তিনি পেছন থেকে আমাদের ডাকলেন-‘আকতার সান, ইউক্কুরি শিত্তে কুদাসাই।’
অর্থ হলো-‘মি. আকতার, প্লিজ ধীরে চলো।’ বাক্যের শেষে কুদাসাই (প্লিজ) শব্দটা এদেশে প্রত্যেকেই ব্যবহার করে থাকেন, এমনকি প্রফেসর ছাত্রদের প্রতি, বড় পদস্থ কর্মকর্তা তার অধীনস্তদের প্রতি। এমন কোমল শব্দের ব্যবহার আমাদের দেশে বিরল, তাও আবার সৌজন্যতার খাতিরে ব্যবহৃত হয় কোথাও কোনো ভাব-গম্ভীর অনুষ্ঠানে। উনার অবাধ্য হওয়া সমীচীন নয় ভেবে আস্তে হাঁটা শুরু করলেও কিছুক্ষণ পর তা মেনে চলা সম্ভব হলো না; হয়তো এমন অ্যাডভেঞ্চারের মুখোমুখি হইনি কখনো এ উচ্ছ্বাসে।
আমরা ইচি গোমেতে পৌঁছালাম অল্প সময়ের মধ্যে, যেখানে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কিছুটা জায়গা পাথর কেটে কৃত্রিম উপায়ে সমতল করা হয়েছে ও দু-একটি বেঞ্চ পাথরের সঙ্গে স্ক্রু দিয়ে সেঁটে দেওয়া আছে। পানিতে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে পরবর্তী গোমের দিকে আবার যাত্রা শুরু হলো। জাপানিজ ইচি গোমে অর্থ প্রথম ধাপ বা সেকশন যেখান থেকে দেখা গেল ফুজিসানের উত্তরের ঢাল ঘেঁষে পাঁচটি লেকের কয়েকটি; লেক ইয়ামানাকা, কাওয়াগুচি, সাই, সোজি, মতোসু। সে এক অপূর্ব নয়নাভিরাম দৃশ্য যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পরে কোনো এক ছুটিতে ইউনিভার্সিটির আমরা পাঁচ বাংলাদেশি পরিবার লেক মতোসু ভিসিটের সুযোগ হাতছাড়া করিনি। নি গোমেতে (দ্বিতীয় ধাপ) পৌঁছে হালকা কুয়াশায় আমরা ঢেকে গেলাম। ওপরের দিকে আরও ঘন কুয়াশা হবে কিনা প্রফেসরের কাছে জানতে চাইলে উনি বললেন-‘এটি কুয়াশা নয়, মেঘ।’ তার মানে আমরা মেঘের চাদর গায়ে জড়ালাম? বাহ! কী চমৎকার। আমাদের কৌতূহল ক্রমেই বাড়তে থাকল। হাইকিং ব্যাগে রাখা ওনিগিরি, দুটা কমলা ও জুস খেয়ে নিলাম নি-গোমেতে।
হালকা-ভারী মেঘের পাঁজর ভেঙে যখন আমরা ক্রমশ ওপরে উঠছিলাম, তখন চোখের সামনে নীল আকাশ ঘনীভূত হয়ে রূপ নিতে লাগল গাঢ় নীলে। সূর্যটা এত উজ্জ্বল ও চকচকে দেখাচ্ছিল যে, আকাশে তাকাতে গেলেই চোখ কুঁচকে আসছিল অনিচ্ছা সত্ত্বেও। আরও ওপরে উঠে পেছন ফিরে তাকালে মনে হলো যেন আমরা স্বপ্ন জগতে-চারপাশে তুলার মতো ভেসে বেড়ানো অজস্র মেঘমালা যা ছুঁয়ে দেখা যাচ্ছিল। যথেষ্ট হাঁপিয়ে উঠেছিলাম আমরা দুজন, অথচ প্রফেসরের মধ্যে নেই কোনো শ্রান্তির ছাপ, যেন তিনি মহাযাত্রার এক অবিচল পথিক।
এক মুঠো আঠালো ভাতের দলা, তার ভেতরে রাখা পেস্ট করা মাছ, মাছের ডিম কিংবা মাংসের টুকরো-সবুজ সামুদ্রিক শৈবালের মোড়কে মোড়ানো এ বিশেষ খাবারটির নাম ওনিগিরি। প্যাকেটজাতকরণের জন্য ব্যবহৃত ওনিগিরি মোড়ানো কাগজ বেঞ্চের নিচে টুপ করে রেখে দিলাম। নজরে আসতেই প্রফেসর দুদিকে থুতনি নাড়িয়ে বললেন- ‘নো। ইউ সুড পুট এনি ওয়েস্ট ইন ইওর ব্যাগ অর পকেট’। কথামতো কাজ করলাম। এ দেশের বিরানভূমিতেও কোনো প্যাকেট-খোসা ফেলার জো নেই। আমার দেশে অভিজাত আবাসিক এলাকায়ও আমরা রান্নাঘরের ময়লা অবলীলায় ফেলে দেই রাস্তায়, কে ফেলেছে কেউ জানল না। আবার সেই আমরাই পরিচ্ছন্ন নগরীর দাবি তুলি কোথাও, কখনো কখনো। প্রফেসর আবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন শুরুর দিকের সেই আস্তে হাঁটার কথাটি। জ্ঞানীর কথা যেন বাসি হলে ফলে। মনে পড়ে গেল স্কুল জীবনের ৮০০ মি. দৌড় প্রতিযোগিতার কথা। ১ম রাউন্ডে যে সবার সামনে থাকত, শেষ রাউন্ডে তাকে খুঁজেই পাওয়া যেত না। গাঢ় নীল আলোয় কারও ত্বকে এলার্জিক রিঅ্যাকশন হতে পারে ভেবে তিনি আমাদের মুখ ও হাতে লাগানোর জন্য ইউভি সান প্রটেকশন ক্রিম এগিয়ে দিলেন। যাকে বলে পেশাদার পর্বতারোহী। ওপর থেকে শহর বা লোকালয়ের কোনো চিহ্নই চোখে পড়ল না। মনে হলো, নরম শুভ্র তুলোয় পৃথিবী নামের গ্রহটি কেউ যেন আবৃত করে রেখেছেন এক নবজাতকের মতো। সেই শুভ্রতার মাঝে প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে নিজের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছিল।
ঠান্ডার আঁচ কিছুক্ষণ আগেও ছিল সহনীয়, কিন্তু হঠাৎই বাতাসের গতি ও ঠান্ডা বাড়তে শুরু করল। প্রফেসর দেখালেন একটি রেসকিউ বিমান মাউন্টেইনের চারপাশ ঘুরে পর্বতারোহীদের নজর রাখতে টহল দিচ্ছে। পর্বতারোহীদের পদচিহ্নে পাথরের ওপর একটি সরু পথ তৈরি হয়েছে ঠিক গ্রামের মেঠোপথের মতো, যা অনুসরণ করা ছিল আমাদের মূল কাজ। কোনো কোনো জায়গা এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে দু-পা আর ক্লাইম্বিং স্টিকের ভারসাম্য ঠিক রাখতে না পারলে নির্ঘাত মৃত্যু। সেখানে রেসকিউ বিমানের টহল কোনো কাজে আসবে না। হিমেল বাতাসের গতি ক্রমেই বাড়তে থাকল, ঝড়ের শঙ্কায় আমরাও একটু ভীতসন্তস্ত্র হয়ে পড়লাম। ওপরে উঠার সাহস, মনোবল দুটিই হারিয়ে ফেললাম সবাই। বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে আমরা যে তরুণ, সেই আত্মবিশ্বাস ষাট পেরোনো প্রফেসরের দৃঢ়তার কাছে যেন পরাজিত হলো। বাতাসের গতি না বাড়লেও আমাদের নিচে নেমে আসার অজুহাত খুঁজতে হতো হয়তো।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ফুজি আরোহণের অফিসিয়াল সময়। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এ সময় মধ্য-নভেম্বর পর্যন্তও বর্ধিত করা হয়ে থাকে। আর কদিন বাদেই পর্যটকদের জন্য ফুজি আরোহণ বন্ধ করে দেওয়া হবে। শীতের শুরুতে ফুজিসান যখন মাথায় সাদা টুপি পরে, তখন টুপির অংশ বিশেষ অর্থাৎ বরফের বড় চাঁইগুলো বাতাসে খসে পড়তে থাকে যা পর্বতারোহীর জন্য বিপজ্জনক। ঝুঁকি না নিয়ে আমরা নামতে শুরু করলাম। ওপরে উঠার চেয়ে নামাটাই কঠিন হয়ে পড়ল, আবিদ ভাই ইটের সুরকির মতো ছোট্ট পাথরের গাদার ওপর অসাবধানতায় পা রেখে একবার পিছলে পড়ে গেল, জিন্সের প্যান্ট পরনে না থাকলে থেঁতলে যেত কোমরটা। আমার পা দুটো এতটাই ভারী হয়ে আসছিল যে, মনে হচ্ছিল আমি আর নামতে পারব না। পায়ের পেশিতে দেওয়া মাত্রাতিরিক্ত চাপ ও শরীরের ভারে পা দুটো যেন গুঙিয়ে উঠতে চাচ্ছিল, বলতে চাচ্ছিল আমাদের ছাড়াই তুমি নেমে পড়, আমরা আর পারছি না। বেজমেন্টের কাছাকাছি এলে রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিগন্তের ওপারে দিবাকরের ভূগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার নয়নাভিরাম দৃশ্য নজরে এলো। আড়ষ্ট চোখ তাতে ফের মুগ্ধ হতে চাইল না। নিমেষে আবছায়ায় ঢেকে গেল ফুজিসানের চারপাশ।
