গল্প
অপরিচিতা
Advertisement
আকতার উজ্জামান চৌধুরী
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিরাক পড়া বিকেল, প্ল্যাটফর্মজুড়ে যাত্রীদের হাপিত্যেস অবস্থা। দুঘণ্টা দেরিতে এলো ট্রেন, আমাকে টাঙ্গাইল স্টেশনে পৌঁছে দিতে এসে রিফাতের কাহিল দশা ত্রাহি অবস্থা যেন! তার সঙ্গে আলাপচারিতায় সময়টা কাটল বেশ। এসি-বগিতে টিকিট না পেয়ে অগত্যা নন-এসিতে আমাকে তুলে দিয়ে সে বিদায় নিল। তখনো ট্রেন ছাড়েনি। হ্যান্ডব্যাগ রেখে সিটে বসতেই দেখলাম, পাশের জানালার সিটে বসা মেয়েটি বাইরে হাত বাড়িয়ে বিটলবণ মাখানো কয়েক ফালি শসা কিনে খেতে শুরু করল। এক ফালিতে কামড় বসিয়েই আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিন-খান।’ হকচকিয়ে গেলাম; অপরিচিতা কেউ দেখামাত্র খাবারের আমন্ত্রণ! সৌজন্যতা দেখিয়ে ধন্যবাদ জানালাম শুধু। পরক্ষণেই সে বলে উঠল, ‘বেশ গরম পড়েছে, ট্রেন থামলে টের পাচ্ছি।’ কার উদ্দেশে বলল বুঝলাম না। সিটে বসে চারপাশে চোখ বুলালামূঅন্যদের অবস্থান লক্ষ করলাম। অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলো না, মেয়েটি ছাড়া। ছিটি বাজিয়ে ঝুকঝুক শব্দ তুলে ট্রেন ছাড়ল রাজশাহীর উদ্দেশে।
কুড়ির কাছাকাছি বয়সের অপরিচিতা মেয়েটির মনে মনে নাম দিলামূ‘বর্ষা’। সামনের সিটে বসা দুজনের সঙ্গে মাঝে মধ্যে আলাপ চলছিল ওর। বিষয়ূমোবাইল ফোন। কথার ভঙ্গিতে বুঝলাম তারা অনাত্মীয়। আত্মীয় হলে বর্ষাকে আলাদা সিটে বসাত না। আবার বন্ধুও মনে হলো না, বর্ষার সঙ্গে ওদের বয়সের ফারাক বেশ। ট্রেন ক্রমেই দ্রুত চলতে লাগল, পরবর্তী স্টেশন যমুনা সেতু। বর্ষা বাঁ হাত জানালার বাইরে বাড়িয়ে কব্জিতে প্যাঁচানো সাদা ফুলের মালা-সম্ভবত বকুল ফুলূএপাশ-ওপাশ নাড়িয়ে অসমভাবে ঝুলে থাকা ছোট-বড় প্যাঁচগুলোকে ঠিক করল। হাত ঘুরিয়ে ফুলগুলোতে বাতাস লাগাচ্ছিল। অমন ঝুঁকিপূর্ণ ভঙ্গি দেখে আমার অস্বস্তি লাগল। কিছু বলতে উদ্যত হয়ে থেমে গেলাম। অসাবধান ও বেখেয়ালি ভাব বর্ষার, পাছে আমাকে না বলে বসেূ‘তাতে আপনার সমস্যা কী?’ অস্বস্তি ছাপিয়ে শেষমেশ বললাম, ‘হাত ভেতরে রাখুন, গাছের ডাল বা সিগন্যাল পোলের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে।’
আমার দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলূ হুঁ। ক্ষীণকায়া গৌর বর্ণের মেয়েটি সেজেগুজে থাকলেও চোখেমুখে ছিল ক্লান্তির ছাপ। সে সিটের ওপরের ইলেকট্রিক পয়েন্টে ফোন চার্জ দেওয়ার চেষ্টা করছিল। চার্জার খুলে আসছিল বারবার। বললাম, ‘অন্য পয়েন্টে চার্জার লাগিয়ে দেখতে পারেন।’ ‘লাগিয়েছি, কাজ হয়নি।’ তার কথায় বিরক্তি নেই, আছে নিস্পৃহতা। ‘অনেকে-ই সঙ্গে পাওয়ার ব্যাংক রাখে। আমার ব্যাগে নেই; থাকলে সাহায্য করতে পারতাম।’ বর্ষা হেসে বলল, ‘ধন্যবাদ, আমাকে তুমি করে বলুন। আমি বয়সে আপনার অনেক ছোট।’
বর্ষার কথায় আমার অস্বস্তিবোধ খানিকটা কমল। তার আদবের ভাঁড়ারে কিছু আদব জমা আছে অন্তত। তারপরও দুকথায় কারও সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন। বাস-ট্রেনের দীর্ঘ যাত্রায় অপরিচিতা মেয়ের পাশের আসন মানে এক অদৃশ্য অস্বস্তি। না যায় ঠিকমতো নড়াচড়া, না যায় কথা বলা। নিজের সিটে সটান হয়ে বসে থাকা ছাড়া গা এলিয়ে এপাশ-ওপাশ করার সুযোগ কম। এটা মেয়েদের বেলায়ও প্রযোজ্য, তাদের ক্ষেত্রে এরকম যাত্রা আরও অস্বস্তিকর বটে। বর্ষাকে বললাম, ‘পাশের সিটের চার্জার-পোর্টেও চেষ্টা করতে পারেন।’ ‘ঢাকায় মোবাইলের ডিসপ্লে পালটালাম সকালেই, এখন কাজ করছে না। দেখেন, পাসওয়ার্ড নিচ্ছে না।’ আমাকে দেখিয়ে কয়েকবার প্যাটার্ন আঁকল। সঠিক প্যাটার্ন কিনা বুঝলাম না। মূলত ওকে তখনো বুঝে উঠতে পারিনি। বললাম, ‘সমস্যাটা ব্যাটারির নাকি ডিস্প্লের?’ ‘দুটোই।’
-ডিস্প্লে ইন-অ্যাকটিভ হলে চার্জ দিয়ে কী লাভ? ঢাকায় কোনো প্রোগ্রামে গিয়েছিলেন মনে হয়।
-ঢাকা না, কক্সবাজার গিয়েছিলাম। অনেক মজা করেছি। সব ছবি-ভিডিও মোবাইলে আছে, কিন্তু দেখতে পারছি না।
বললাম, ‘ফ্যামিলিসহ গিয়েছিলেন?’ ‘না, একা।’ ‘একা মানে?’ ‘রাজশাহী থেকে আমি একা।’ ‘অন্যরা কারা, কোথাকার?’ ‘সবাই টুরিস্ট গ্রুপের সদস্য। আমরা সত্তরজন ঢাকায় জড়ো হয়ে একসঙ্গে গিয়েছিলাম। রাতের ট্রেনে চড়ে ভোরে কমলাপুর নেমেছে সবাই, তারপর যে যার গন্তব্যে রওয়ানা দিয়েছে।’ ‘এই টুরিস্ট গ্রুপের খোঁজ পেলেন কীভাবে?’ ‘ফেসবুকে। সবাই ফেসবুক ফ্রেন্ড।’ তার চোখে নির্ভার স্বীকারোক্তি। ‘ওহ...আচ্ছা’- বলে আমি থেমে গেলাম।
ফেসবুক এক বিস্ময়কর মেলা। দাদা-দাদি, বাবা-মা, ভাইবোন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই সবার ফ্রেন্ড। ভাবলে গা গুলিয়ে ওঠে, সম্পর্কের সব সীমানা যেন এক স্ক্রিনে মিশেছে। এটা কী করে হয়? আবার ফ্রেন্ডের বাংলা আভিধানিক অর্থ বন্ধু, সুহৃদ, হিতৈষী। কোন ব্যক্তির সঙ্গে মিউচুয়াল শ্রদ্ধা/স্নেহের সম্পর্ক থাকলে সে-ই সুহৃদ। সে বিবেচনায় এটা বেঠিকও নয়। বর্ষাকে বললাম, ‘আপনার টুরিস্ট গ্রুপের সদস্যরা কোন বয়সের?’ ‘বিভিন্ন বয়সের। ষাটোর্ধ্বও আছেন অনেকে।’ ‘অচেনা ফেসবুক-ফ্রেন্ডদের সঙ্গে একা কক্সবাজার ভ্রমণ, ঝুঁকিপূর্ণ নয় কি? প্রতারকের ফাঁদও হতে পারত!’ ‘তা হবে কেন? ফেক গ্রুপ হলে ঘুরে আসতে পারতাম?’ ‘হুঁ, তারপরও...’
বর্ষার উত্তরে একরাশ সরলতা ঝরে পড়ল। শুরুতে আমার যে ধারণা ছিল তাতে ভাটা পড়ল। ট্রেনের স্পিকারে ঘোষনা এলো-পরবর্তী স্টেশন যমুনা সেতু (পূর্ব)। ট্রেন থেমে রইল অনেকক্ষণ, বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনের ক্রসিং হবে এখানে। বগিতে হুড়মুড় করে উঠে পড়া লোকজনের শোর পড়ল। পেয়ারা-মাখা, আমড়া-মাখা, চিপ্স, বাদাম, বারোভাজা ওয়ালাদের ভিড় ঠেলে পণ্য বিক্রির হাঁকডাক আর উন্মত্ত ছোটাছুটি শুরু হলো এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। বর্ষা বারোভাজা কিনে খেল। ভাজায় বারো রকম আইটেম থাকার কথা থাকলেও সর্বোচ্চ সাত-আটটির বেশি থাকে না। তারপরও জিভে জল আসার মতো মসলাযুক্ত চটকদার খাবারের নাম বারোভাজা। এখানে বারো শব্দটি রকমারি অর্থে ব্যবহৃত। বর্ষা ভাজা খেতে খেতে নির্নিমেষ চোখে সেতুর ওপর চলমান ঢাকাগামী বাসকটি গভীরভাবে অবলোকন করছিল। ট্রেন তখন সেতুর ওপর, যমুনা নদীর বুকে পিঠ উঁচু করে জেগে ওঠা চরগুলো ঘন জমাটবাঁধা অন্ধকারে ঢাকা, ড্রেজার মেশিন ও বালুভর্তি নৌকাগুলোর ওপর টিমটিমে আলো জ্বলছে যেন দূর আকাশের তারা নেমে এসেছে নদীতে। বর্ষার চোখে তখন নদীর মতোই গভীর নীরবতা। ট্রেন সেতু পেরোল। নীরবতা ভেঙে সে বলল, ‘আপনার ফোনটা একটু দেবেন?’ ‘কেন?’ ‘মা’র সঙ্গে কথা বলব, নইলে চিন্তা করবে।’
: নম্বরটা বলেন, আমি কথা বলে আপনাকে ধরিয়ে দিচ্ছি।
: আমি নিজেই ডায়াল করে নিচ্ছি। (একটু সংকেচ ছিল বর্ষার কথায়)
: ঠিক আছে, বাবার নম্বর দিন। আমি কথা বলে আপনাকে দিচ্ছি।
: না... মানে, বিষয়টি বাবা জানে না তো...
: মা জানে, বাবা জানে না। অদ্ভুত হল না ব্যাপারটা?
: ট্রেন ছাড়ার আগে মাকে জানিয়েছি। জয়দেবপুরে এসে ফোন নষ্ট। মা ফোনে কল করে না পেলে চিন্তা করবেন।
: মায়ের মন বলে কথা। সন্তানই হলো মায়ের পৃথিবী।
বর্ষার অসংলগ্ন কথায় তখনো আমার সংশয় কাটেনি। বাবাকে কল দিতে চাইলে আপত্তি কেন? বললাম, ‘পাঁচ দিন ধরে মেয়ে বাসায় নেই, সেটা বাবা জানে না? মা অবশ্যই বাবাকে সবই জানিয়েছেন।’ বর্ষা কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইল। পেরিয়ে গেল বেশ কিছুটা সময়। কিছুক্ষণ পর ধীর স্বরে বর্ষা বলে উঠল, ‘আপনি কী করেন?’ ‘চাকরি করি।’ ‘কোথায়?’ ‘সরকারি অফিসে, রাজশাহীতে।’ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল আমার। আমি তখন রাবির ফার্মেসি বিভাগের সভাপতি। সন্দিগ্ধ মনে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে-বাবা কেন জানবে না?
: আমাকে তুমি করে বলেন। আমি অনেক ছোট। (ঠিক আছে, -বলে আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়লাম)
: বাবা হয়তো রাজশাহীতে থাকেন না? ...না বললে জানবে কী করে?
: না... রাজশাহীতেই থাকেন। (একটু সময় নিয়ে বর্ষার মৃদুস্বরে উত্তর)
‘তুমি কোথায় কিসে পড়াশোনা করো?’ ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, দ্বাদশ শ্রেণিতে।’ ‘কোথায় সেটা?’-উত্তরটা যাচাই করতে সম্পূরক প্রশ্ন করলাম। ‘নওদাপাড়া আমচত্বরের পূর্বে।’ ‘তোমাদের বাসা কোথায়?’ ‘তেরখাদিয়া স্টেডিয়ামের ওপাশে, ডাবতলা।’ ‘ওহ... আচ্ছা।’ ‘ডাবতলা চেনেন?’ ‘হুঁ, মেডিকেল-বন্ধগেট থেকে সিটি হার্টের দিকের রাস্তায়।’ ‘জি, ঠিক বলেছেন।’ ‘কয় ভাইবোন তোমরা?’ ‘দুই বোন। আমি বড়, ছোট বোন ক্লাস ফাইভে পড়ে।’ ‘বেশ! বাবার দুই মেয়ে, এই বাবার তো ভালোবাসার অন্ত নাই। মেয়েরা মা’র চেয়ে বাবাকেই ভালোবাসে বেশি।’
মুহূতেই বর্ষা নীরব হয়ে গেল। চটুল স্বভাবের মেয়ে বর্ষা বাবার প্রসঙ্গ এলে নির্জীব হয়ে পড়ছে কেন? কক্সবাজার ভ্রমণের বিষয় বাবা জানবে না কেন? তবে কি তার বাবা নেই? তা হলে উত্তরটা সোজাসাপটাই হতো। ট্রেন দ্রুত চলছে, তবে আমি আটকে থাকলাম বর্ষার সরল আর রহস্যভরা কথার জালে। সামনে উল্লাপাড়া স্টেশন, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেনের ঠাসাঠাসি ভিড়ও কমে যাচ্ছে। ফোন আনলক করে এগিয়ে দিয়ে বললাম, ‘নাও, তোমার মাকে ফোন করবে বলেছিলে।’ ‘না-হ, করব না।’ ‘ফোন চাইলে আমি না-তো বলিনি। রাজশাহী পৌঁছাতে রাত এগারোটা পেরোবে। তোমার মাকে জানানো প্রয়োজন।’
ফোন হাতে নিল সে। প্রথম কল অপরপ্রান্তে কেউ রিসিভ করল না। দ্বিতীয় কলে মা-মেয়ের কথা হলো। বর্ষার কথোপোকথনের প্রতি আমার কান সজাগ ছিল। সত্যিই সে মায়ের সঙ্গে কথা বলল। ...ট্রেন অনেক দেরিতে ছেড়েছে...হ্যাঁ খেয়েছি...না, ডিস্প্লে নষ্ট হয়ে গেছে...সকালে ঠিক করলাম...আহনাফ সঙ্গে ছিল...হু, ও ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে গেছে...না, অসুবিধা হয়নি...ইত্যাদি।
কথার মাঝে নতুন একটি নাম পেলামূআহনাফ। মায়ের সঙ্গে কথা বলে বর্ষা বেশ হালকা বোধ করল। তার মা নিশ্চিন্ত হলো, আমারও খুশি লাগল। ফোনে না পেলে মা দুশ্চিন্তায় পড়বেন খুব স্বাভাবিক। প্রথমে বর্ষার আচরণ অস্বাভাবিক ঠেকলেও তা দ্রুতই কেটে গেল। আহনাফ বর্ষার খালাতো ভাই, খালা ঢাকায় থাকেন। মোবাইল সার্ভিসিং করিয়ে সে বর্ষাকে ট্রেনে তুলে দিয়েছে। বর্ষার মোবাইল ফোনটা নতুন ও দামি মনে হলো, অন্তত আমারটার চেয়ে। মা কী করেন জানতে চাইলে বলল, ‘হাইস্কুলের শিক্ষিকা।’ ‘আর বাবা?’ এবার সে উত্তর না এড়িয়ে বলল, ‘ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন।’ কোম্পানির নাম ও পদবিও বলল সে। ‘তিনি কি অফিসের কাজে বাইরে কোথাও গিয়েছেন?’ ‘জানি না। বাবা আমাদের সঙ্গে থাকেন না।’ হঠাৎ মুখ ফস্কে বেরোল কথাটি।
: তিনি তাহলে অন্য শহরে থাকেন? মানে... অন্য কোথাও পোস্টিং?
: নাহ্। রাজশাহীতেই থাকেন।
: তাহলে... (একটু ভীরু স্বরে বললাম)
উত্তর না পেলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাব মনস্থির করলাম। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের ওপর থুতনি চেপে জানালার দিকের অন্ধকারে মুখ গুঁজে এক অসহায় ভঙ্গিতে সে বলল, ‘অন্য মেয়েকে বিয়ে করেছেন। বিয়ের আগে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।’
আমার প্রতীক্ষার অবসান ঘটল, যেন জট খাওয়া সুতার প্যাঁচ খুলল বহু চেষ্টার পর, কেন মেয়েটির মধ্যে আমি তার বয়ঃসন্ধিক্ষণকালের আচরণের বাইরে কিছু অস্বাভাবিকত্ব লক্ষ করছি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তিনি তোমাদের বাসায় আসেন? তোমাদের খোঁজ নেন?’ ‘না, আম্মু নিতে চায় না, আমরাও চাই না।’
-বলে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
ওড়নায় মুখ চেপে ফিসফিসিয়ে কাঁদল সে। হ্যান্ডব্যাগের রুমাল বের করে চোখ মুছল। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। বুঝলাম না-আমার কী করা উচিত?। বললাম-‘আমি তোমায় কষ্ট দিতে চাইনি। সরি, ভেরি সরি! আমি তো এসব জানি না, দুঃখিত। এ বিষয়ে আর কিছু বলব না, তুমি শান্ত হও।’ মুহূর্তক্ষণ ফুঁপিয়ে কেঁদে ওয়াসরুমে গেল বর্ষা। ফিরল একটু দেরিতে। বর্ষার চাপাকান্না, অশ্রু যদি ওর বাবাকে দেখানো যেত! তাহলে তিনি কী করতেন? মনের প্রশ্ন মনেই রয়ে গেল। ট্রেন ঈশ্বরদী স্টেশন পেরোল। বাইরের অন্ধকার গাঢ় হলো, কিছু কথা থেকে গেল না-বলা, কিছু প্রশ্ন রয়ে গেল উত্তরহীন। সিট ফাঁকা হলে সে উঠে অদূরেই এক সিটে বসল।
সন্তানের জন্য বাবার ত্যাগের দৃষ্টান্ত অসংখ্য। কিন্তু বর্ষা সেই সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায়নি। তাই হয়তো সে শৈশবের বাবাকে মনে করতে চায় না। হয়তো ধীরে ধীরে সেই স্মৃতিগুলো বিস্মৃতি হয়ে উঠবে অমোঘ নিয়তি মেনে। বছর কয়েক পরে প্রাপ্তবয়স্কা হলে হয়তো সে বলবে-আমার বাবা নেই। এক শিশুশিল্পীর গাওয়া হামদ্ শুনেছিলাম ইউটিউবে, কানে বাজল কণ্ঠটিূ‘বাবা মানে হাজার বিকেল আমার ছেলেবেলা, বাবা মানে রোজ সকালে পুতুল পুতুল খেলা। বাবা মানে কাটছে ভালো যাচ্ছে ভালো দিন..।’ পৃথিবীর সব সন্তানই তার বাবার কাছে ঋণী; এটা যেমন ধ্রুব সত্য, সব পুরুষ সেই বাবা হতে পারে না-এটাও অনেকাংশে নির্মম বাস্তবতা।
বাবা মানে সন্তানের এক অনন্য নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, সব সমস্যার সমাধান। যখন সেই আশ্রয় থাকে না তখন বর্ষাদের নিত্যদিনের পথচলা, জীবনযুদ্ধ, আনন্দ-বিনোদন কিছুই থেমে থাকে না। বাবার সাহায্য ছাড়াই নিজের মতো করে গড়ে নিতে হয় ভবিষ্যৎ। তাদের দিনলিপিতে বাবার ছায়া নেই, কিন্তু মনে আছে দৃঢ় সংগ্রামের ব্রত।
