Logo
Logo
×
   

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

গল্প

দীর্ঘ যামিনী

Advertisement

Icon

শামসুদ্দিন তৌহিদ

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ যামিনী

Advertisement

রাতটি যেন রূপকথার অধ্যায় থেকে উঠে এসেছে। আকাশের বুকে পূর্ণ চাঁদ ঝুলে আছে, আর তার শুভ্র আলো চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে অপার্থিব মায়া, পৃথিবী নতুন সাজে সেজেছে। দিনের কোলাহল, ধুলো আর ক্লান্তির চিহ্ন নেই কোথাও। আছে শুধু নির্মল সৌন্দর্য আর নীরবতার সুর। জ্যোৎস্নার এ অপূর্ব আবরণে মোড়া পৃথিবীকে দেখে মনে হয়, আজ রাতের জন্য প্রকৃতি নিজেই এক অনিন্দ্য সুন্দর উৎসবের আয়োজন করেছে।

খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের এক ফালি রশ্মি ঘরের ভেতরে এসে মেঝের ওপর নরম সাদা চাদরের মতো লুটিয়ে পড়েছে। জ্যোৎস্নার আলোয় ঘরের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি আসবাব যেন নতুন করে প্রাণ পেয়েছে। ঘরের বাইরে উঠানে গাছের পাতাগুলো রুপার পাতের মতো ঝলমল করছে। পুকুরঘাট, গ্রাম্য পথ, দূরের মাঠ সবকিছুই চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় গা ভিজিয়ে নিচ্ছে। বাতাসে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন প্রকৃতি নিজেই গভীর ধ্যানে মগ্ন।

বাড়ির সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চারদিকে নিস্তব্ধতা, শুধু দূরে কোথাও ঝিঁঝিপোকার একঘেয়ে ডাক রাতের নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছে। অথচ স্মৃতির চোখে ঘুম নেই। জানালার পাশে বসে সে আনমনে বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো চাঁদের আলোয় ভেসে থাকা পৃথিবীকে দেখলেও মন পড়ে আছে বহু দূরের অতীতের কোনো অন্ধকার গলিতে। স্মৃতির বুকের ভেতর এক অদৃশ্য ঝড় অবিরাম তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। রাত যত গভীর হচ্ছে, ততই যেন একে একে জেগে উঠছে ফেলে আসা দিনের স্মৃতিগুলো।

পিতৃহারা মেয়েকে মানুষ করতে গিয়ে আত্মীয়-পরিজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর দেওয়া কত অপমান, অবহেলা, কত না-বলা কষ্ট বুকের গভীরে জমিয়ে রাখতে হয়েছে! দিনেরবেলায় শক্ত থাকার অভিনয় করা যায়, হাসিমুখে পৃথিবীর সামনে দাঁড়ানো যায়; কিন্তু গভীর রাত মানুষের সবচেয়ে গোপন ক্ষতগুলোকে জাগিয়ে তোলে। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। একমাত্র মেয়ে ফাতেমার দেওয়া হওয়াটসঅ্যাপ মেসেজ আজ স্মৃতির জীবনের সব হিসাবকে ওলোট-পালোট করে দিয়েছে।

এমন আলো ঝলমল রাতেও স্মৃতির চারদিক যেন অন্ধকার। কিছুতে সে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না। নিজের শরীরের বিন্দু বিন্দু রক্ত পানি করে যে সন্তানকে সে গড়ে তুলেছে, সে আজ এত বড় আঘাত দিতে পারল! স্বামীর সংসার ত্যাগ করার পর ফাতেমাকে নিয়ে স্মৃতির জীবনে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল; আজ যেন সেসব দিনের কথা একে একে মনের আয়নায় ভেসে উঠছে। মনে পড়ছে, সংসারের শত অভাবের মধ্যেও মেয়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের প্রয়োজনগুলো সে কীভাবে বিসর্জন দিয়েছে। কত নির্ঘুম রাত, আর অনিশ্চয়তায় মোড়া অসংখ্য দিন সে পার করে দিয়েছে। প্রতিটি সংগ্রামের স্মৃতি যেন আজ নতুন করে তার হৃদয়কে বিদ্ধ করছে।

ফাতেমা ও তার বাবা মাসুদকে নিয়ে স্মৃতির সংসার ছিল। বেশ সুখেই দিন কাটছিল। ভালোবেসে মাসুদের হাত ধরেছিল সে। কত স্বপ্ন, কত আশা আর কত রঙিন ভবিষ্যতের কল্পনা ছিল সংসার ঘিরে। কিন্তু সময়ের নির্মম কষাঘাতে সেই স্বপ্নগুলো একে একে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সবার অমতে ঘর থেকে পালিয়ে মাসুদকে বিয়ে করেছিল বলে স্মৃতির মার বাড়ির সবাই তাকে ত্যাগ করেছিল। মাসুদ আইটি স্পেশালিস্ট ছিল। ঢাকার একটি বেসরকারি আইটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত। থাকত বসুন্ধরায়। বিয়ের পর এমন কোনো ছুটির দিন নেই যে, মাসুদ স্মৃতিকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যায়নি। ফাতেমার জন্মের পরও এ ধারা অব্যাহত ছিল।

কিন্তু দিন যতই গড়িয়েছে মাসুদের আচরণেরও পরিবর্তন হয়েছে। চাকরির প্রয়োজনে সমাজের উঁচু মহলে ওঠবস ছিল তার। সে সূত্রেই ক্লাব কালচারে অভ্যস্থ হয়ে ওঠে মাসুদ। অফিস আর ক্লাব নিয়ে সে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে, স্মৃতিকে সময় দেওয়ার অবসর ছিল না তার। একসময় সে প্রচণ্ড মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। নারীর প্রতি তার দুর্বলতাও বাড়ে। ধীরে ধীরে মাসুদ ও স্মৃতির সম্পর্কের মাঝে অদৃশ্য দেওয়াল গড়ে তোলে। মাসুদের পরিবারের মুরুব্বিদের নিয়ে দেন-দরবারও কম হয়নি। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে শেষ পর্যন্ত মাসুদকে ডিভোর্স দেয় স্মৃতি।

ডিভোর্সের পর মাসুদ আরও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে। শুরু হয় বেপরোয়া জীবনযাপন। শরীরের প্রতি অযত্ন অবহেলায় একসময় মাসুদ অসুস্থ হয়ে পড়ে। লিভার সিরোসিস ধরা পড়ে। চিকিৎসা করালেও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত মাসুদকে আর বাঁচানো যায়নি।

মাসুদের অকাল মৃত্যুর খবর পেয়ে স্মৃতির হৃদয়ে এক অমোচনীয় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। মানুষটির প্রতি ক্ষোভ ছিল, অভিমান ছিল, আবার কোথাও যেন নিভৃত ভালোবাসার কিছু ছাইও রয়ে গিয়েছিল। সেই ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিগুলো যেন আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

মাসুদের সঙ্গে ডিভোর্সের পর স্মৃতির মার বাড়ির কেউ যোগাযোগ করেনি। ততদিনে বাবা মারা গেছেন। ভাইবোন কেউ একটিবারের জন্যও খোঁজ করেনি। একমাত্র অসুস্থ মা একবার টেলিফোন করেছিলেন। অসুস্থতার কারণে চলাফেরা করতে পারেন না। টেলিফোনে তিনি ফাতেমাকে নিয়ে তার কাছে চলে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। স্মৃতির মার বাড়ি পুরোনা ঢাকার নারিন্দায়। বাড়ি থাকলে কী হবে; একটি প্রাইভেট ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ দেওয়া। স্মৃতির বাবা বাড়ি মর্টগেজ দিয়ে ব্যবসার জন্য ব্যাংক থেকে বিরাট অঙ্কের অর্থ লোন নিয়েছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর স্মৃতির ভাই মাহিন, ব্যাংক থেকে রিসিডিউল করিয়ে মাসে মাসে কিস্তি জমা দিয়ে কোনো রকমে বাড়িটাকে ধরে রেখেছে। স্মৃতিরা দুই বোন এক ভাই। স্মৃতি সবার ছোট। বড় বোন প্রীতি বিয়ের পর স্বামী সংসার নিয়ে ব্যস্ত। একমাত্র ভাই মাহিন, বাবার ব্যবসার হাল ধরেছে।

মাসুদের মৃত্যুর পর তার অফিসেই নিু পদে স্মৃতির একটা চাকরি হয়। অফিস কর্তৃপক্ষ মানবিক কারণেই তাকে এ চাকরিটি দেয়। কিন্তু সেখানে যা বেতন পায় তা দিয়ে মেয়ের লেখাপড়া, বাসা ভাড়া ও সংসারের খরচ চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। ফলে, বাড়তি টাকার জন্য স্মৃতি প্রাইভেট টিউশনি নিতে বাধ্য হয়। অফিস শেষে সপ্তাহে চার দিন সে ছাত্রী পড়ায়। ততদিনে সে মাসুদের বসুন্ধরার বাসা ছেড়ে নাখাল পাড়ার কম ভাড়ার একটা বাসায় গিয়ে ওঠে। ফাতেমা তখন হলিক্রস স্কুলে পড়ে। প্রথমে স্মৃতি নারিন্দায় মার বাসায় গিয়ে ওঠার চিন্তা করেছিল। কিন্তু ফাতেমার স্কুলের কথা ভেবে যায়নি। ভালো স্টুডেন্ট সে। ক্লাসে বরাবরই ভালো রেজাল্ট করে আসছে। পুরান ঢাকায় মেয়েদের তেমন ভালো স্কুলও নেই যে, সেখানে তাকে পড়াবে। তা ছাড়া হলি ক্রসে বাড়তি সুবিধাও আছে। এখানে পড়ালে স্কুল শেষে কলেজে পড়ার সুযোগ আছে।

মাসুদ ও স্মৃতির খুব ইচ্ছা ছিল ফাতেমাকে বিদেশে পাঠিয়ে লেখাপড়া করাবে। কাজেই যত কষ্টই হোক, তাদের সেই স্বপ্ন সে পূরণ করবেই। মেয়েকে মানুষ করা স্মৃতির জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কত অশ্রু, কত নির্ঘুম রাত আর কষ্ট বুকে চেপে রেখে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তবু মাতৃত্বের শক্তি তাকে ভেঙে পড়তে দেয়নি। ফাতেমা যখন এইচএসসিতে ভালো ফল করে, স্মৃতির মনে হয়েছিল তার সব কষ্ট সার্থক হতে চলেছে। তার ইচ্ছা মেয়েকে ডাক্তার বানাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার সেই ইচ্ছা পূরণ হতে দেয়নি। ফাতেমার পাবলিক মেডিকেল কলেজে সুযোগ হলো না। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে পড়ানোর মতো আর্থিক সামর্থ্যও তার ছিল না। শেষ পর্যন্ত ফাতেমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে। তারপরও মনে হয়েছে ফাতেমাকে নিয়ে স্মৃতির যে স্বপ্ন তা পূর্ণ হয়নি। স্বপ্ন ছিল মেয়েকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠাবে। কিন্তু বিদেশে পাঠাবে বললেই তো সম্ভব নয়। বাইরে পাঠানোর যে খরচ, তা আসবে কোথা থেকে? স্মৃতি হাল ছাড়েনি। পৈতৃক সম্পত্তি নারিন্দার বাড়ি থেকে তার অংশের শেষ সম্বল ছোট্ট ফ্লাটটি মা-ভাইবোনের আপত্তি সত্ত্বেও বিক্রি করে মেয়েকে কানাডা পাঠায় স্মৃতি।

ফাতেমা যাওয়ার সময় কথা দিয়ে যায়; কানাডায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে যত শিগ্গির পারে মাকে নিয়ে যাবে। স্মৃতিও ফাতেমার কথায় বুক বাঁধে। মাত্র তো দুটি বছর মাস্টার্স শেষ করতে।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক; হয় আরেক। কানাডার ভেঙ্কুভারে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া থেকে মাস্টার্স শেষ করার আগেই সারহান নামে বাংলাদেশি এক ছেলের সঙ্গে ফাতেমার পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা এবং তারপর এক বছরের মধ্যে ফাতেমা সারহানকে বিয়ে করে। সারহান কানাডার পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট। সারহানের সঙ্গে বিয়ে হলে স্ত্রী হিসাবে ফাতেমা খুব দ্রুত পিআর পেয়ে যাবে। ফলে মাকেও সে নিয়ে আসতে পারবে অনায়াসে। বিয়ের আগে ফাতেমা ইচ্ছা করেই তার মাকে জানায়নি। বিয়ে করার জন্য সারহানের দিক থেকেও তাগাদা কম ছিল না। বরং সারহানই চেয়েছিল যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে হয়ে যাক। বিয়ের কথা মাকে না জানাতে সারহানই ফাতেমাকে পরামর্শ দিয়েছিল। সারহানের প্রতি ফাতেমা এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, সে সারহানের কথা ফেলতে পারেনি। তা ছাড়া পিআর পাওয়ার বিষয়টিও তার মাথায় তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল। ফাতেমা মনে মনে ভাবে, পিআরের কথা শুনলে আম্মুর রাগ নিশ্চয়ই কমে যাবে।

সারহানের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর ফাতেমা অবশ্য তার কথা মাকে জানিয়েছিল। সপ্তাহে অন্তত দুবার মা ও মেয়ের কথা হয়। সারহানের কথা শোনার পর স্মৃতি, ওর সম্পর্কে আরও খোঁজখবর নিতে বলেছিল। ভালো করে খোঁজ না নিয়ে গভীর কোনো সম্পর্কে যাতে না জড়ায় সে পরামর্শও দিয়েছিল তাকে। ফাতেমা স্মৃতির পরামর্শ আমলে নেয়নি। সারহান সম্পর্কে তেমন কোনো খোঁজখবর না নিয়েই হুট করে বিয়ে করে বসে। বিয়ের পরপরই ফাতেমা টের পায় সে বিরাট ভুল করেছে। সারহান তাকে ধোঁকা দিয়েছে। বিয়ের আগে সে ঘুণাক্ষরেও বোঝেনি সারহান তার সঙ্গে এত বড় প্রতারণা করতে পারে।

সারহান কানাডার পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট নয়। সে মিথ্যা কথা বলে ফাতেমাকে বিয়ে করেছে। ভেঙ্কুভারে আসার আগে সে মন্ট্রিলে ছিল। সেখানেই সে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাশ করে পাঁচ বছর একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করেছে। সে কোম্পানিতে কাজ করার সময়ই সারহান শৃঙ্খলা ভঙ্গজনিত এক মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এজন্য কিছুদিন তাকে কারাভোগও করতে হয়েছে। ফলে, পিআর পাওয়ার যোগ্যতা সে হারায়। এর পরই সারহান মন্ট্রিল ছেড়ে ভেঙ্কুভারে চলে আসে। এখানে আসার পর ফাতেমার সঙ্গে পরিচয় এবং বিয়ে। ফাতেমার যেহেতু পিআর পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় দুটিই আছে, কাজেই তাকে বিয়ে করলে স্বামী হিসাবে সারহানেরও পিআর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

প্রতারাণার কথা ভেবে ফাতেমা একেবারে ভেঙে পড়েছে। কান্নাকাটিও করেছে প্রচুর। কিন্তু উপায় কী? এখন তো পিছপা হওয়ার সুযোগও নেই। অন্ধের মতো ভালোবেসে সারহানকে সে বিয়ে করেছে। সারহান যে এমন করবে ভাবতেই পারেনি। সারহান খুব ধূর্ত ও চালাক। তার প্রতি ফাতেমার অতিমাত্রার দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে। বিয়ের আগে টের না পেলেও ফাতেমার কাছে এখন সব পরিষ্কার হয়ে গেছে। এখন সে কী করবে? ঘটনা যেদিকে মোড় নিয়েছে তাতে সারহানকে ডিভোর্স দিতেও পারছে না। ডিভোর্স দিতে গিয়ে যদি আইনি জটিলতায় পড়ে যায়, তাহলে তার নিজের পিআর পাওয়াও আটকে যেতে পারে। কী করা যায় তা নিয়ে লোকাল এক অ্যাটর্নির সঙ্গে সে পরামর্শ করেছে। অ্যাটর্নিও একই কথা বলেছেন। ডিভোর্সের আইনি প্রক্রিয়া গেলে পিআর পাওয়া আরও বেশি দেরি হয়ে যেতে পারে।

ফাতেমাও ডিভোর্সের পক্ষে নয়। সে চায় না ডিভোর্সের কারণে মায়ের মতো তার জীবনও তছনছ হয়ে যাক। ডিভোর্সি নারীদের কি যে যন্ত্রণা, সে তো কাছ থেকেই তার মাকে দেখেছে। এমন জীবন সে বেছে নিতে পারবে না। বরং কিছুটা কম্প্রোমাইজ করে যদি চলা যায়। ভাগ্যে যা লেখা আছে তা মেনে নিয়ে চলার চেষ্টা করাই কি ভালো নয়?

ফাতেমার কাছে এক একটা দিন মনে হয় যেন এক এক বছর। এই পরিস্থিতিতে ফাতেমা তার মাকেও কানাডায় আনতে পারবে না। ভেবেচিন্তে ঠিক করেছে, মাকে সে সব খুলে বলবে। কিন্তু ফোনে সরাসরি বলতে সাহসও পাচ্ছে না। শেষ পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠাবে ঠিক করেছে।

স্মৃতি, টেবিলের ওপর থেকে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ফাতেমার পাঠানো মেসেজটি চোখের সামনে মেলে ধরে। বিয়ে করা, বিয়ের কথা গোপন রাখা, সারহানের প্রতারণা, অ্যাটর্নির সঙ্গে পরামর্শ এবং পিআর পাওয়ার জটিলতা বর্ণনার পর; সারহানকে কেন ছাড়তে পারবে না জানাতে গিয়ে ফাতেমা যা লিখেছে তা যেন স্মৃতিকে ভেঙে চুরে খান খান করে দিয়েছে।

‘আচ্ছা আম্মু ছোটকাল থেকেই তুমি যে শুধু আব্বুর দোষের কথাই বলে এসেছ; দোষ কি শুধু আব্বুর একার ছিল? তোমার কোনো দোষ ছিল না? তুমি কেন আব্বুকে ঘরে আটকে রাখতে পারলে না? আব্বু কেন ক্লাবে ক্লাবে রাত কাটাত! আব্বুকে ডিভোর্স না দিয়ে তুমি চাইলেই কি পারতে না কিছুটা অ্যাডজাস্ট করে-কিছু কম্প্রমাইজ করে সংসার টিকিয়ে রাখতে? তুমি ডিভোর্স দেওয়ার পরই আব্বু আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে, যার পরিণতিতেই তার মৃত্যু হয়।

আমি তোমার মতো ভুল করতে চাই না। মানছি সারহান আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। সে হয়তো ভুল করেছে। তারপরও আমি চেষ্টা করব মানিয়ে নিতে। সে যা করেছে কানাডায় থাকার জন্যই করেছে। সারহান এখন আমার স্বামী। স্ত্রী হিসাবে আমি চেষ্টা করব আমার ওসিলায় যদি তার এ দেশে থাকার ব্যবস্থা হয়। আমি সংসার করতে চাই আম্মু। আমি নিজ থেকে ওকে ছেড়ে যাব না। তুমিও নিশ্চয়ই চাও না যে, আমি তোমার মতোই কষ্টের জীবন বেছে নিই। ওকে যদি দেশে ফিরে যেতে হয় তাহলে তো আমাকেও দেশে ফিরতে হবে। দেখি না চেষ্টা করে আমার সঙ্গে সারহানেরও যদি পিআর হয়ে যায়।

তোমাকে আরও একটা কথা জানিয়ে রাখি, কানাডায় আসার সময় তোমাকে যে কথা দিয়েছিলাম এখন বোধহয় তা রক্ষা করা সম্ভব নয়। আমি এ মুহূর্তে তোমাকে কানাডায় নিয়ে আসতে পারছি না। প্রয়োজনে তোমার চলার মতো টাকা আমি পাঠিয়ে দেব। আম্মু প্লিজ, আমাকে ভুল বুঝে তুমি কষ্ট পেয়ো না।’

মেসেজের প্রতিটি শব্দ যেন বজ পাত হয়ে আঘাত করল স্মৃতির বুকে। অনেকক্ষণ সে নির্বাক বসে রইল। মনে হলো, চারপাশের পৃথিবীটা হঠাৎ থেমে গেছে। ফাতেমাকে যেন আজ সে চিনতে পারছে না। যে মেয়েকে মানুষ করার জন্য সে নিজের সুখ, স্বপ্ন, যৌবন সবকিছু বিসর্জন দিয়েছে, সেই মেয়েই আজ তার সব আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিল!

স্মৃতির মনে পড়ে যায়, কানাডার বিমানে ওঠার আগে ফাতেমা তাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘আম্মু তোমাকে আর কষ্ট করতে হবে না। আমি ওখানে কিছু একটা করতে পারলেই তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাব।’

সেদিন ফাতেমার কথাগুলো শুনে স্মৃতির চোখে জল এসেছিল, তবে সে ছিল আনন্দের জল। আজ সেই একই চোখে জল এলো, কিন্তু এ জল যেন হৃদয়ের গভীর ক্ষত থেকে ঝরে পড়া রক্তের মতো।

জানালার বাইরে চাঁদের আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। অথচ স্মৃতির কাছে সবকিছু অন্ধকার মনে হচ্ছে। সে অনুভব করল, মানুষ কখনো কখনো মৃত্যুর চেয়েও বড় যন্ত্রণা পায়-যখন তার নিজ সন্তানের কাছ থেকে আঘাত আসে।

স্মৃতি তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা উপলব্ধি করে। তীব্র যন্ত্রণায় মনটা যেন খা খা করে উঠছে। মনে হচ্ছে, বিশাল এক সমুদ্রের মাঝখানে সে একা ভাসছে। দিগন্তজুড়ে শুধু জলরাশি, তীরের কোনো দেখা নেই। চোখের দৃষ্টি যতদূর যায় শুধু নীরবতা। চারদিক নীরব-নিস্তব্ধ, কোথাও কেউ নেই। স্মৃতির চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। চাঁদের আলোয় সেই অশ্রুবিন্দুগুলো মুক্তার মতো ঝলমল করছে...

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম