Logo
Logo
×
   

Advertisement

সাহিত্য সাময়িকী

আবু জাফর শামসুদ্দীনের

পদ্মা মেঘনা যমুনা

Advertisement

Icon

আহমেদ বাসার

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা মেঘনা যমুনা

Advertisement

বাংলা সাহিত্যে ত্রিকালদর্শী লেখকখ্যাত আবু জাফর শামসুদ্দীন-এর এক মহাকাব্যিক সৃষ্টিকর্ম ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ উপন্যাস। মূলত তার অনবদ্য ত্রয়ী উপন্যাস ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ও ‘সংকর সংকীর্তন’ বাংলা সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল, দেশভাগ-পরবর্তী পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এ তিন উত্তাল সন্ধিক্ষণ দেখার এক বিরল সৌভাগ্য অর্জন করেছেন তিনি। তার সাহিত্যকর্মেও এ অভিজ্ঞতার সুস্পষ্ট ছাপ পড়েছে গভীরভাবে। বাংলার ঐতিহাসিক বিবর্তনকেই তিনি শুধু রূপায়িত করেননি, বরং বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৃতাত্ত্বিক অভিযাত্রার মর্মার্থকেও তিনি গভীর ব্যঞ্জনায় চিত্রিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ উপন্যাসের সময়কাল ১৯৩০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত বিস্তৃত। উপন্যাসটি পাঁচটি খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ড ‘উন্মেষ’, দ্বিতীয় খণ্ড ‘উদঘূর্ণা’, তৃতীয় খণ্ড ‘মহানগরী’, চতুর্থ খণ্ড ‘ঝড়’ এবং পঞ্চম খণ্ড ‘উলঙ্গ আদম’। বোঝাই যাচ্ছে, ব্রিটিশ শাসনের শেষদিকে উপমহাদেশের অস্থির সমাজ-রাজনীতি ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার কণ্টকিত পথরেখা আলোচ্য উপন্যাসের অন্যতম উপজীব্য। উপন্যাসটি আবর্তিত হয়েছে মূল চরিত্র মামুনকে কেন্দ্র করে। মামুন জবরদস্ত আলেম ইদরিস মিঞার ছেলে। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে অপুত্রক ইদরিস মিঞার পুত্রলাভের বাসনায় আল্লাহর দরবারে মোনাজাতের মধ্য দিয়ে-‘আমাকে সন্তান দাও-একটি মাত্র ফরজন্দ। আমার সাত পুরুষের ভিটায় বাতি জ্বলুক: রজনীগন্ধার শীষের মতো বিকশিত হোক অষ্টম পুরুষ। হে আল্লাহ, তুমি আমাকে সন্তান দাও।’ প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের পর তিনি পুত্রসন্তান লাভ করেন। লেখক ইদরিস মিঞা কিংবা বিষ্ণুচরণের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার গভীর ক্ষতকে চিহ্নিত করেছেন। এ চরিত্ররা ধর্ম ও সংস্কারের বাতাবরণে সাধারণ মানুষকে আটকে রাখার চেষ্টা করেন। অথচ ব্যক্তিজীবনে এরা চরম মাত্রায় অসৎ। নানা কৌশলে অসহায় মানুষের শোষণ করাই এদের নিত্যকর্ম। উপন্যাসের মূলচরিত্র মামুন পড়ালেখা ও কবিতা লেখায় উৎসাহী। গ্রামে স্কুল না থাকায় তাকে বহুকষ্টে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হয়। কলেজে পড়ার জন্য আসতে হয় ঢাকায়। দারিদ্র্যের কষাঘাত সহ্য করেও সে মনোবল ধরে রাখে। শহরে এসে মামুন সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ চরমভাবে বুঝতে পারে। সংস্কারগ্রস্ত হিন্দুসমাজে সে অপমানিত হয় নানাভাবে। হিন্দুধর্মের কিছু বন্ধুও জুটে যায়; কিন্তু তাদের বাড়িতে যথাযোগ্য সম্মান পায় না। একজন আদর্শবাদী মুসলমান যুবকের সঙ্গেও তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়। একসময় সশস্ত্র বিপ্লবীদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও পরে সে মুসলিম লীগে যোগ দেয়। তার অনুপ্রেরণায় মামুন কলকাতায় এসে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে কবিখ্যাতি অর্জন করে। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের অন্তহীন ভণ্ডামি সে গভীরভাবে উপলব্ধি করে। মুসলিম লীগের রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থসিদ্ধির দিকটিও এখানে উন্মোচিত হয়েছে। উপন্যাসটি শেষ হয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দেশভাগের কারণে অগণিত মানুষের বাস্তুভিটা হারানোর মর্মবেদনার মধ্য দিয়ে।

‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ উপন্যাসটিতে শুধু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নয়, বরং বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং রাজনৈতিক চেতনার বিকাশকে শিল্পসম্মতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ফলে এটি একইসঙ্গে ইতিহাসের দলিল, সমাজবাস্তবতার আখ্যান ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। উপন্যাসটি সম্পর্কে প্রবোধচন্দ্র সেন বলেন, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ একটি আশ্চর্য মহাগ্রন্থ। ভারতীয় ইতিহাসের একটা মহা-যুগসন্ধির পটভূমিকায় লিখিত। এ বই পড়তে পড়তে বারবার মনে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ বইটির কথা। কিন্তু আপনার কাহিনির ঐতিহাসিক পটভূমিকা গভীরতর। আপনার কাহিনির পরিণামও ‘গোরা’র মতো কোনো আকস্মিকতার মধ্যে উদ্ঘাটিত হয়নি। কারণ ‘গোরা’র মতো আপনার কাহিনিতে কোনো মনোগত আদর্শ অতি-পরিস্ফুট হয়ে ওঠেনি। এ সংযম যথার্থ কল্প প্রতিভারই পরিচায়ক।

আলোচ্য উপন্যাসে লেখক কেবল রাজরাজড়া, নেতা কিংবা সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষের বিবরণ তুলে ধরেননি। তার দৃষ্টিতে সাধারণ মানুষই ইতিহাসের প্রকৃত নির্মাতা। তাই বৃহৎ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব কীভাবে গ্রাম-বাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এসে পৌঁছায়, উপন্যাসে তারই মানবিক রূপ ফুটে ওঠে। উপন্যাসটি প্রকাশের পর ১৯৭৪ সালের ১১ মে ‘দেশ’ পত্রিকায় উপন্যাসটি সম্পর্কে বলা হয়, ‘‘বাংলা ভাষায় প্রকাশিত যাবতীয় উপন্যাসের মধ্যে সবচেয়ে দামি উপন্যাসটি কিছুকাল আগে প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা থেকে। বইটির নাম ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’। লেখক আবু জাফর শামসুদ্দীন।”

উপন্যাসটির অন্যতম আকর্ষণীয় দিক এ অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে জনজীবনের সম্পৃক্ততা। কৃষক, শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং গ্রামীণ সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এখানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে যেমন সংকুচিত করেছে, তেমনি প্রভাবিত করেছে সামাজিক সম্পর্ক ও মূল্যবোধকেও । ক্ষুধা, দারিদ্র্য, ঋণ, জমি ও জীবিকার সংকট মানুষের চিন্তা ও আচরণের ওপর প্রভাব ফেলেছে গভীরভাবে। লেখক এ মানুষদের করুণার পাত্র হিসাবে দেখাননি; বরং তাদের ইতিহাস-সচেতন, সংগ্রামশীল ও পরিবর্তনকামী মানুষ হিসাবে উপস্থাপন করেছেন। উপন্যাসটির মানবিক আবেদন তাই এতটা মর্মভেদী হয়ে ওঠে। বৃহৎ রাজনৈতিক ইতিহাসের আড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্রই এ আখ্যানের মূল উপজীব্য।

উপন্যাসে লেখক ইতিহাসকে শুধু তথ্য হিসাবে উপস্থাপন করেননি। ঐতিহাসিক পরিবর্তন ব্যক্তিমানুষের সুখ-দুঃখ, সম্পর্ক, স্বপ্ন ও হতাশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কীভাবে কৃষক পরিবারের জীবনে সংকট তৈরি করে, সামাজিক পরিবর্তন কীভাবে মানুষের সম্পর্ক বদলে দেয় অথবা বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলন কীভাবে সাধারণ মানুষের চেতনায় পরিবর্তনের ঢেউ তৈরি করে, তা এ উপন্যাসে নিবিড়ভাবে লক্ষ করা যায়। ফলে ইতিহাস ও সাধারণ মানুষের ভাগ্যবদলের চিত্র এখানে সমান্তরালভাবে দৃশ্যমান।

উপন্যাসটির জনজীবন জীবন্ত হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক কথ্যভঙ্গির স্পর্শে। চরিত্রের সামাজিক অবস্থান ও মানসিকতার সঙ্গে ভাষার ব্যবহারও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে চরিত্রগুলোকে কৃত্রিম বা বইয়ের পাতার মানুষ মনে হয় না; তারা জীবন্ত সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে ওঠে। যেমন, ইদরিস মিঞা খেতে বসলে হাজেরা বিবি স্বামীকে যখন জিজ্ঞেস করে-আচ্ছা রোজ রোজ এত রাইত মজিদে বইয়া আপনে কী করেন? তখন ইদরিস মিঞা মনের দুঃখে বলে-বিবি মনের দুঃখ মনেই রইল। জেন্দেগানি শেষ অইয়া আইছে। বয়স পঞ্চাশ ছাড়াইছে। ভিডায় বাত্তি দেওনের কেউ নাই। এই কথোপকথনে চরিত্রের মনোজগৎ নিপুণভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। উপন্যাসটিতে লেখক উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের চিত্র যেমন ধারণ করেছেন, তেমনি তৎকালীন সাধারণ মানুষের যাপিতজীবনে তার প্রবল অভিঘাতের দিকটিও তুলে ধরেছেন হৃদয়গ্রাহী ভাষায়। ফলে পাঠক খুব সহজেই সেই সময় ও সমাজের অন্দর্মহলের চিত্র বাস্তবতার আলোকে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করতে পারে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম