গল্প
তাকিয়ে ছিল মেরিলিন মনরো
Advertisement
হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রায় বছর চারেক আগে দেশ ছাড়ে পার্থিব। সঙ্গে যা ছিল, তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্রাবলী আর সমরেশ বসুর বাছাই গল্প। বুকে গোপন এক বাসনা খুব সন্তর্পণে পুষে বেড়ায়। পারীর মতো দ্বিতীয় কোনো লেখক-মাতৃক শহর পাওয়া সহজ হবে না হয়তো। এত এত লেখকের জন্ম তার গর্ভে! সেই গর্ভের সুবাসমাখা তাদের সৃষ্টিতে। পারীর আলো-ছায়া-বাতাসের আশ্রয়ে বেঁচেবর্তে আছে পার্থিব। নিত্য যার রসদের সন্ধান। জীবন আর আনন্দের স্পন্দনের মাঝে গল্প খুঁজে বেড়ানোর এক অনিঃশেষ যাত্রা।
পঁয়ত্রিশের ওপারে বয়স। বলা যায়, অর্ধেক জীবন হারিয়ে এসেছে। আসলেই কি হারিয়ে গেছে? জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির অঙ্কতে বরাবরই দুর্বল সে। যেমন দুর্বল ফ্যাকাসে তার চোখ। মাঝারি গড়ন। অপ্রসর কাঁধ। গোলগাল মুখ। চোয়ালে নেই দৃঢ়তা। কয়েক সপ্তাহের না কাটা দাড়ি-গোঁফ মরা দূর্বা ঘাসের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে। শীর্ণ স্বাস্থ্যের আকর হয়ে আছে অনুচ্চ নাক আর হাবশিদের মতো মোটা ঠোঁটে। পঁয়ত্রিশ পার করতেই মাথার চুলের সিংহভাগ খরচে। যেটুকু আছে তাও ফিনফিনে হাওয়ায় মিঠাই। চেকনাই শহরের বিলাস ব্যসনে অভিরুচি নেই তার। আটপৌরে জীবন।
বহুবর্ষী পাথুরে পথে হেঁটে বেড়ায়। খুঁজে বেড়ায় উগো, ভলতের, জিদ, জোলা, মোপাসঁ, বোদলেরের পদচিহ্ন। অথবা হেমিংওয়ে, জয়েস, ফিট্জেরাল্ডের স্মৃতি। ছেলেটি পাগল নাকি? এই শহরের ভাগ্যান্বেষী মানুষের চোখে ছেলেটি পাগলই। তা না হলে এভাবে ভাবলেশহীন জীবন পার করে কেউ? এই হাজারো সম্ভাবনার নগরে? আড়ালে-আবডালে নয়, প্রকাশ্যেই এমন উপহাসের জবাবে সে শুধু হাসে। নিঃশব্দে।
লেখক হওয়ার বাসনা সেই তার প্রথম যৌবনেই। লেখার মতো সাহস, ধৈর্য, কল্পনা, অধ্যবসায় আর ছোটখাটো জীবনবোধ-আছে তার। তবুও তার লেখক হয়ে ওঠা হয়নি আজও। অথচ এতদিনে তার কত সুহৃদ, সমকালীন লেখকেরা দিব্যি দাপাচ্ছে। বাজারে বিকোচ্ছে ভালো দরেই। এমনকি পুরস্কার-টুরস্কারও ভরেছে ঝোলায়। অথচ সে এখনো ভাষার সন্ধানই পেল না! ‘আরে মিয়া ভাষা কি তুমি রাস্তায় হাঁটলে পাইবা? ভাষা কি রাস্তায় পইড়া থাকে?’ কে একজন উপহাস করে তার নিজের আড়াল থেকে। পার্থিব কানে তোলে না। কান থাকলেই সব শুনতে হবে কেন? মুখ আছে বলেই কি মানুষ সব বলে?
২. ‘হঠাৎ তুমি কোথায় হাওয়া হয়ে যাও? ফোন বন্ধ। বাসাতেও ফিরছ না?’ কথাগুলো কানে বিঁধছিল খুব। মুঠোফোনের ওপাশ থেকে। পার্থিব ফোনটা খানিক দূরে সরাল কান থেকে। ‘কোথায় আর যাব? এই শহরে কি হারিয়ে যায় মানুষ।’ ভাবলেশহীন কণ্ঠ পার্থিবের। ‘তা আমাকে কেন হঠাৎ প্রয়োজন হলো?’
‘তোমাকে আবার কী প্রয়োজন হবে? এমনিতেই...।’ হাওয়াটা ফুস করে বেরিয়ে গেল বেলুন থেকে। নরম শোনাল আরও, মেয়েটির কণ্ঠ। ‘বিকেলে বেরাচ্ছ কোথাও?’ পার্থিব এক পলক চোখ রাখল দেওয়াল ঘড়িটায়। সাড়ে নয়টা। ‘নাহ্, তেমন কোথাও যাবার নেই।’ ‘আজ আবহাওয়াটা মন্দ নয়।’ ওপাশ থেকে অনুনয়ের সুর ভেসে এলো পরিজায়ী পাখির মতো। ‘বের হতে পার চাইলে।’, ‘ভেবে দেখি।’ পার্থিবের গলায় অনাগ্রহের সেতার। ‘ঘুম হয়নি বেশ কদিন। শরীরটা ক্লান্ত খুব।’ বিপরীত কণ্ঠে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি। ‘বললে না তো এ কদিন কোথায় ছিলে?’
‘কোথাও না।’ তন্দ্রাহতের মতো জড়ানো শোনাল কথাগুলো। ‘ফোনটা ছাড়তে চাচ্ছিলাম ইজাবেল। মাথা ভার হয়ে আছে ঘুমে।’
দপদপ করছিল কপালের দুপাশে। একটু আগেও। এক সমুদ্র শান্ত ঘুম ছিল পার্থিবের চোখে। ফোন রাখতেই পালিয়ে গেল কোথাও! হুট করেই। কোথায় পালাল, আলমারিটার আড়ালে? সোফাটার ওপাশে? বিছানাটার নিচে? টেবিলে ওপর অগোছাল কাগজের স্তূপে? লম্বা সেলফের বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে? দেওয়ালে ঝুলে থাকা মেরিলিন মনরো হাসছে খুব। নাকি ঘুমটা লুকিয়েছে তার বক্ষসন্ধির চিকন অন্ধকারে? টনটনে লাগছে মাথাটা। একটু আগেও চোখ দুটো মাখামাখি ছিল ঘুমে। আশ্চর্য! ম্যাজিক নাকি?
ফোনটায় চার্জ ছিল না। চার্জে বসিয়ে পাঁচ দিন পর সুইচটা অন করতেই ইজাবেলের ফোন। বিছানায় শুয়ে শুয়েই কথা হচ্ছিল ওর সঙ্গে। বিছানা থেকে জানালার পাশের সুইচটায় চাপল পার্থিব। হাঁপানিগ্রস্ত প্রৌঢ়ের শ্বাসের ঘড়ঘড় শব্দে উঠে যাচ্ছে খড়খড়িটা। ওপরে আর সামান্য বাকি। সুইচটায় আবারও হাত রাখল সে। জানালার কাচের শার্সিটা খুলে দিতেই, হেমন্তের হিমেল হাওয়া হইহই করে ঢুকে পড়ল সদলবলে। গাঁ-সওয়া। স্নিগ্ধ। পারীর আবহাওয়া আর নারীর মন দুটোই বুঝে ওঠা দায়। এই হাড় কামড়ে ধরা হিম। সারা দিন আকাশ চুইয়ে পড়া বৃষ্টি। আবার হঠাৎ নাই হয়ে যায় কোথায়! কোথায় যায়? আবার ফিরে আসেই বা কোত্থেকে?
পুবের আকাশে মুখ টিপে হাসছে সূর্যটা। বেড়ালের শরীরের মতো তুলতুলে তার আলো। সেই কোমল আলোর পরশ ছুঁয়ে গেল পার্থিবকেও। হিমের রুক্ষতায় মলিন ত্বকে কে যেন হাত বোলাল, আলতো করে।
জানালার ওপাশে চওড়া পথ। তার ওপাশে বিপুলায়তনে উদ্যান। ম্যারি দ্য ইভরির এ উদ্যানে নানাজাতের বৃক্ষসম্ভার। চারতলার ছোট্ট স্টুডিওটা যতটা সকীর্ণ, বাতায়ন খুলে দিলে ততটাই প্রসর।
পার্থিব কয়েকবার স্টুডিওটা ছেড়ে দেবে ভাবলেও, সামনে-পেছনের শ্যামলী নিসর্গে জমেছে তার অগাধ মায়া। মনটা কোনো কারণে ভার হয়ে এলে, জানালাটা খুলে দিলেই সব হাওয়া। এই যেমন এখন। ঠোঁটের ফাঁকে একটা সিগারেট এঁটে দিল পার্থিব। বাঁ হাতে আড়াল করল বাতাস। লাইটার চাপতেই বাচ্চা গুঁই সাপের মতো জিহ্বা বের করল আগুনটা। বুক ভরে ধোঁয়া পুষে উগড়ে দিল একবার। অন্যমনষ্কভাবে চোখ ফেলল ইতিউতি। বাড়িটির ঠিক নিচে কাফে-বিস্ত্রোর আঙিনাটা জমে উঠেছে সকাল-সকাল। ফরাসিরা বলে লা তেরাস। রোববার ছুটির দিন। কাফের কাপে দ্রুত চুমুক বসিয়ে ছুটবার তাড়া নেই। যতটা খুশি, যেমন খুশি ফরাসিরা আজ কাটাবে দিনটাকে। কেউবা আছে গ্রাস মাতিনিতে। অর্থাৎ বেলা করে উঠবার লম্বা ঘুমে। আর যারা চান দিনটাকে যতটা সম্ভব উপভোগ করতে, তারা এখন কফি নিয়ে বসে গেছেন টেরাসে।
টেরাস টপকে দৃষ্টি পড়ল পথে। হঠাৎ একটা-দুটা গাড়ি। পথ কামড়ে চুপচাপ বেয়ে যাচ্ছে। ঢিমেতালে পথ মাপছে দু-একটি সাইকেলের চাকা। ফুটপাত বেয়ে ঢিমেতালে দৌড়চ্ছে একটি মেয়ে। পার্থিব দেখল, মেয়েটার শরীরে ব্যায়ামের আঁটোসাঁটো পোশাক। তা ভেদ করে উদ্ভাসিত তার উন্নত বুক। দোদ্যুল্যমান সেই সৌন্দর্যের দিকে ফিরে তাকিয়ে সিগারেটের ধুঁয়ো গিলল নাভি অবধি। চকলেট রঙের চুলগুলো বাঁধা ঘোড়ার লেজের মতো। ডানে-বায়ে দুলছে ছন্দময়। নাকের ফুটো গলে ধুঁয়োরা সব বেরিয়ে আসছে পড়িমরি। পুসেতে শুয়ে এক শিশু। তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে আফ্রিকান এক মা। একহাতে মুঠোফোন, কানে চাপা। শিশুটি একটি পুতুল নিয়ে খেলছে আপন মনে। একজন প্রৌঢ়া দেখতে ইঁদুরমুখো কুকুরটিকে হাওয়া খাওয়াতে বের করেছেন। জন্তুটি ছুটছে বেশ আগে আগে। বৃদ্ধার হাতে তার নিয়ন্ত্রণ। দর্জির ফিতের মতো লম্বা দড়ি। যত টানছে, লম্বা হচ্ছে। আবার কাছে এলেই গুঁটিয়ে যাচ্ছে হাতে, আপনাআপনি। কুকুরটার আকৃতি ধেড়ে ইঁদুর থেকে কিছুটা বড়। বেড়াল থেকে ছোট। থেমে থেমে পেছন ফিরে, ফের দৌড়াচ্ছিল আদুরে প্রাণিটা।
পার্থিব সিগারেটরা নিঃশেষ করে ঠেসে ধরল জানালার পাশের দেওয়ালে। বৃদ্ধাঙুল আর তর্জনীর ফাঁকে নিয়ে ছোট্ট এক টোকা দিল। ফিল্টারটা গিয়ে পড়ল পথের ওপর। চকিতে তার মনে হলো, কাজটা ঠিক হয়নি। যদি তেরাস্ েপড়ত, কারও টেবিলে!
৩. বিকেল মাথায় করে এলো ইজাবেল। পার্থিব ঘুমোচ্ছিল। দরজার ওপরে কয়েকবার টিং টাং বেজে উঠতেই উঠে বসল। এখন দুজনে বসে আছে মুখোমুখি। দুটো তাস্ দ্য কাফে থেকে হালকা ধোঁয়া উঠে মিলিয়ে যাচ্ছে। ‘মানুষও কি ধোঁয়ার মতো, উবে যায় কোথাও?’ ইজাবেল মিছে মিছে ছুঁতে চাইল ধূসর বাষ্প। ‘মানুষ ভ্রামণিক। সে শুধু তার গণ্ডি বদলায়। চেনা-অচেনার ঘূর্ণিপাকে। আবর্তিত হয় কাল থেকে কালান্তরে।’ পার্থিব একবার অলস ভঙ্গিতে চুমুক দিল কাফেতে। জানালাটা দখিনের মৃদুমন্দ হাওয়া ঠেলে দিচ্ছিল ঘরে। স্ট্রবেরি রঙের সোয়াটারটা ভেদ করে সে হাওয়া চিমটি কাটছিল ইজাবেলকে। ‘হঠাৎ করেই বদলে গেল আকাশটা।’ কাফের কাপটা দুহাতে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা নিচ্ছে ইজাবেল। ‘একরাশ ছাই লেপ্টে আছে মনে হচ্ছে।’
পার্থিব চোখ দুটো ছুড়ে দিল জানালার ওপাশে। শূন্যে। উদ্যানের বড় বড় পাইনগাছগুলো গাঢ় কালচে সবুজ মেখে আছে। হঠাৎ-বিটাত বাতাস দু-একটি অসমাপ্ত বাক্য ঠেলে দিচ্ছে ওপরে। নিচের তেরাস্ থেকে। বসে থাকা লোকেদের। অথবা টুকটাক হিলের শব্দ তুলে পার হয়ে যাওয়া পথচারীর।
‘তুমি ইদানীং বড় উদাস হয়ে গেছ।’ ইজাবেলের কথা শুনে মুখ ফেরায় পার্থিব। ‘হঠাৎ কোথায় হারিয়ে যাও?’ জবাবে নিঃশব্দে হাসে পার্থিব। ‘মাঝেমধ্যে এই কোলাহল ছেড়ে নির্জনতার নিরাময় দরকার হয় জীবনের।’ ‘তুমি কি এভাবেই কাটিয়ে দিতে চাও জীবনটাকে?’ ইজাবেলের কণ্ঠে কৌতূহল।
‘আমার তো দিব্যি চলে যাচ্ছে।’ পার্থিব কাফেটা নিঃশেষ করে কাপটা নামিয়ে রাখে টেবিলে। ‘ছোট্ট জীবন। যে যেভাবে পারে উপভোগ করাটাই আনন্দের।’ ‘যারা জীবন নিয়ে সচেতন, গুছিয়ে চলে, তারা কি জীবনকে উপভোগ করে না তোমার ধারণা?’ ইজাবেলের প্রশ্নটা শূন্যে বুদবুদের মতো ভাসে।
‘সবাইকে কেন একই ছকে ভাবতে হবে জীবনকে?’ পার্থিব ভাবলেশহীন উত্তর সুই হয়ে ভেদ করে ইজাবেলের প্রশ্নের বুদবুদ। ‘আনন্দ-বেদনা কি গণিতের সূত্র মেনে চলে?’ পার্থিব পেছনে না ফিরেই পিঠের নিচের দিকে সোফার ভাঁজে কিছু একটা হাতড়াচ্ছে ডান হাতে। ‘তোমাকে একটা বিষয় বলার ছিল।’ ইজাবেল তার মনোযোগ প্রত্যাশী।
সিগারেটের প্যাকেট থেকে রুপোলি কাগজটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে পার্থিব বলল, ‘বলো শুনছি।’
‘এখন যেখানে আছি সেই ফ্ল্যাটটার মেরামতে কাজ চলবে বলে জানাল বাড়ির মালিক।’ ইজাবেল বলতে লাগল। ‘আগামী মাসের শুরুতে ছেড়ে দিতে হবে। এত কম সময়ে পারীতে নতুন একটা বাসা খুঁজে পাওয়া...’
‘এখানে চলে এসো।’ ইজাবেলকে কথাটা শেষ করতে দিল না পার্থিব। সিগারেটে আগুন জ্বালতে জ্বালতে বলল, ‘এই স্টুডিওটা ছোট বটে। তবে দুজনের জন্য যথেষ্ট।’ ‘তোমার এ আস্তাবলে।’ ইজাবেল নাক কোচকায়। ‘কী করে রেখেছ ঘরটাকে!।’
‘সমস্যা নেই। তুমি এসে গুছিয়ে নেবে না হয়।’ পার্থিব বুকে পোষা ধুঁয়ো উগড়ে দেয় জানালার দিকে।
‘ইশ্! কী শখ।’ আরোপিত অবজ্ঞার সুর ইজাবেলের কণ্ঠে। ‘আমি কেন এ আস্তবল গোছাতে যাব? আমার কী দায়! ’
ইজাবেল রাডোর সঙ্গে পার্থিবের পরিচয় পারীর একটি পাবলিক লাইব্রেরিতে। মেদিয়াতেক দ্য লা কানোপেতে। শুধু লাইব্রেরি বললে ভুল হবে। এখানে মাল্টিমিডিয়া সরঞ্জামও আছে। কম্পিউটার, ডিভিডি কর্নার, বাচ্চাদের জন্য পড়ার পাশাপাশি খেলার আঙিনা। প্রতি মঙ্গলবার বিকালে ফরাসি ভাষায় কথা বলার আতেলিয়ে বা কর্মশালা হয় এখানে। ইজাবেল সেখানে কাজ করত স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে। পরিচয়ের পর ফরাসি শিল্প-সাহিত্যের প্রতি পার্থিবের অনুরাগ ইজাবেলের ভালো লাগে। সাগ্রহেই পার্থিবকে ফরাসি শেখাতে সচেষ্ট হয় সে। ভুল-শুদ্ধের ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে পার্থিব বলে যেত। ইজাবেল কাগজে টুকে ভুলগুলো শুধরে দিত ওকে। প্রায় বছর দেড়েকের চেষ্টায় আর ইজাবেলের কল্যাণে পার্থিব এখন অনেকটাই স্বতঃস্ফূর্ত ফরাসিতে। নানা বিষয়ে ভাবের আদান-প্রদানের সূত্র ধরেই দুজনের মধ্যে বোঝাপড়া।
ফরাসিনী ইজাবেলের জন্মগ্রাম তুলুজ। ওখানকার বসতবাড়ির ছাদে গোলাপি টালির ছাদ। স্থাপনাগুলো, দেওয়ালগুলোও গোলাপি। পুরো শহরের দৃশ্য প্রায় একই। যে কারণে তুলুজকে বলা হয়, ‘লা ভিল রোজ।’ পারীর নিবাসীরা যেমন নিজেদের পারীজিয়ান বলতে গর্বে বুক ফোলায়, তেমনি তুলুজের বাসিন্দারা নিজেদের পরিচয়ের পাশে জুড়ে দেন তুলুজিয়ান। আবার লিল শহরের মানুষ পরিচিত লিলুয়া নামে। আঞ্চলিকতার পরিচয় ফরাসিদের কাছে গর্বের।
সিগারেটের শেষ ধোঁয়াটা জানালার ওপাশে উড়িয়ে দিতেই হিম বায়ু হুল ফোটাল পার্থিবের শরীরে। কাচের কপাটটা টেনে দিয়ে বসল এসে সোফায়। ইজাবেল তখন মুঠোফোনে কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত। বাইরে দিনের আলো মিলিয়ে গেছে অনেকটাই। নীলচে আর সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীতে। তার খানিকটা কাচের জানালার এপাশে ঢুকে পড়েছে পথভুলে। সেই আলোয় ফুটে উঠছে ইজাবেলের লাবণ্যময় মুখ। চালকুমড়ার গায়ের মতো নরম আবরণের মতো লালচে-সাদা মুখটায় অগণিত শুভ্রতা। পাকা সফেদার রং চুলে। পিঠের অর্ধেকে নেমে থেমে গেছে। স্বর্ণের চৌকো দুল দুলছে কানে। টিকল নাক আর পাকা ক্র্যানবেরির রং ধরা ঠোঁট দুটোর মাঝের স্বল্প ভূমিতে বিন্দুবিন্দু জল। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চিবুকের লাল তিলগুলো প্রগাঢ় করছে টলটলে রূপের চেকনাই। হাতের আঙুলগুলো দেখতে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা লম্বা আঙুরের মতো। একহারা দেহের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা লম্বা দেখায় ওকে।
পার্থিব বিছানার পাশের টেবিল থেকে জ্যাক প্রেভেখের ‘পারোল’ বইটি তুলে নেয় হাতে। একটা জলন্ত সিগারেট ধরা প্রেভেখের ঠোঁটে। বইটির মলাটে কবির সাদাকালো ছবি। সিগারেটের আগুনটি লাল। ইজাবেল উঠে এসে বসল তার পাশে। পোশাকের দূরত্ব রেখে। ‘তুমি কি কখনো সিরিয়াস হবে না জীবনে?’ ইজাবেল হাত বোলায় পার্থিবের চুলে।
বইটির পাতা উলটে লাইনগুলো পড়ে যায় পার্থিব। ইজাবেল ওর ঠোঁটে আলতো করে আঙুল চাপে। ‘তুমি কি ইচ্ছে করেই আমাকে কষ্ট দিতে পছন্দ করো?’
পার্থিব মুখ তুলে তাকায় ওর দিকে। ‘ছন্নছাড়া জীবনে পিছুটান রাখতে নেই ইজা।’
‘তার মানে ইচ্ছে করেই আমাকে তুমি এড়িয়ে চলো ইদানীং?’ ইজাবেলের কণ্ঠে মৃদু অনুযোগ।
‘আমি চাই না আমার এই মুক্ত জীবন বিলিন হোক।’ নরম গলায় বলে পার্থিব। পেছনের ঘরের ঘুলঘুলি থেকে তাকিয়ে আছে অন্ধকার। সে সেদিকে তাকায়।
ইজাবেল দুহাতে ওর মুখটা নিজের দিকে ফেরায়। ‘চাকচিক্যের মাঝেও তোমার এই অতিসাধারণ মুক্ত জীবনটাই আমাকে তোমার দিকে টেনে ধরে।’
‘এসব আবেগের অভিব্যক্তি ইজা।’ পার্থিব ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে বলতে থাকে। ‘অতি স্বাধীনতা মানুষকে যেমন আবেগী করে, তেমনি আত্মঘাতী করে তোলে। তুমি আছ দ্বিতীয় দলে।’
ইজাবেলের কণ্ঠে চমকে ওঠে বিদ্যুৎ, হঠাৎ। ‘যদি বলি আমি আত্মঘাতীই হতে চাই। তাহলে?’
জানালার ওপাশে আলোর লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। পথ ভুলে ঢুকে পড়া আভাও বেরিয়ে গেছে পেছনের ঘুলঘুলি গলে। উঠে যাচ্ছিল পার্থিব। ইজাবেল টেনে ধরল। লকলকে লাউ ডগার মতো ওর হাত দুটো বেয়ে উঠছে পার্থিবের বুকে। ইজাবেলের ঘাড়ে হাত রাখে পার্থিব। ‘আলোটা জ্বালতে দাও ইজা।’ নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে পার্থিব।
ইজাবেলের নিশ্বাস উষ্ণতা ছড়াচ্ছে পার্থিবের বুকের পশমে। অস্ফূট স্বর বেরিয়ে এলো, ‘না।’
ইজাবেলের ঠোঁট দুটো চঞ্চল হয়ে উঠল মাছের মতো। পার্থিবের ঠোঁটের সন্ধান পেতেই, অন্ধকারেই হাতড়ে ওর হাত দুটো নিজের বুকের ওপর ঠেসে ধরল ইজা। অবাধ্য সন্তানের মতো, ইচ্ছার বিরুদ্ধে পার্থিবের হাত দুটোও আকড়ে ধরল ওইটুকু উন্নত স্থূলতা। পার্থিব হাত দুটোকে শাসন করতে নামিয়ে আনতে চাইলেও খামচে ধরল ইজাবেল। কিছুক্ষণ আগেও ওদের পোশাক ভেদ করে শরীরে যে কাঁপন ধরাচ্ছিল দমকা হিমবায়ু, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে প্রতিটি লোমকূপ। তীব্র উষ্ণতায় পুড়ে খাক হচ্ছে দুটো মানুষ। রাস্তা বেয়ে শাঁই করে পেরিয়ে যাওয়া গাড়িটির আলো, কাচের জানালা গলে আছড়ে পড়ল দেওয়ালে। পার্থিব চকিতেই দেখল, ওদের দিকে তাকিয়ে আছে দুটো চোখ। দেওয়ালে ঝুলে থাকা মেরিলিন মনরো। সেইরাতে ইজাবেল কখন বেরিয়ে গেছে বলতে পারবে না পার্থিব। কিছু বলে যায়নি। পরদিন যখন তার ঘুম ভাঙল তখন বাইরে আলো। পথে মানুষের আনাগোনা। দরজা ভেজানো বাইরে থেকে। দুয়ার থেকে পত্রিকাটি তুলে নিয়ে সে লক করল দরজাটা। সোফার সামনের টি পয়ের ওপরে রাখতেই চোখ আটকে গেল ‘ল্য পারিজিয়ানের’ প্রথম পাতায়। ‘এল আ এতে ত্রে-নে স্যুর ভ্যাঁ মেত্র’: ইজাবেল, মরতেলমঁ ফোশে পার আঁ স্কুতের আ পারি।’
বাংলায়-‘তাকে বিশ মিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল: প্যারিসে স্কুটারের ধাক্কায় ইজাবেলের মর্মান্তিক মৃত্যু।’ ইনসার্টে নিহতের ছবি। ঘটনাটি গতকাল দুপুরের।
