ফিলিস্তিন ও ইসলাম প্রসঙ্গে: সাঈদ-বুভোয়া-সার্ত বিতর্ক
Advertisement
ওয়াহিদ কায়সার
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯৭৯ সালে জাঁ-পল সার্ত্র আর সিমঁ দ্য বুভোয়া এডওয়ার্ড সাঈদকে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর একটা শান্তি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ফ্রান্সে আসার নিমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সময়টা ছিল ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি সম্পাদনের পর, যেটার মাধ্যমে ইসরাইল আর মিশরের মধ্যেকার যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছিল। বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ওরিয়েন্টালিজম-এর লেখককে সে শান্তি সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল যাতে মধ্যপ্রাচ্যে কীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় সে ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনা করার জন্য, সঙ্গে সঙ্গে সমকালীন অন্য চিন্তকদের সঙ্গে নিজের চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগও ছিল আমন্ত্রিত সবার জন্য। সাঈদের বইটি মাত্র এক বছর আগে বের হলেও খুব তাড়াতাড়ি সারা বিশ্বের একাডেমিশিয়ান আর বুদ্ধিজীবীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল, তাই সে নিমন্ত্রণ পাওয়া তরুণ সাইদের জন্য সম্মানের না হয়ে বরং প্রাপ্যই ছিল।
সার্তের ব্যাপারে সাইদের সব সময়ই খুব উচ্চ ধারণা ছিল। সার্তের সঙ্গে দেখা করার আগে লন্ডন রিভিউ অব বুকসে তার ব্যাপারে সাঈদ লিখেছিলেন যে সার্র্ত্র উপনিবেশবাদী দেশের অধিবাসী হয়েও কখনো উপনিবেশবাদের প্রতি সহমর্মী হননি অথবা নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করেননি। আলজেরিয়া থেকে শুরু করে কিউবা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া সামাজিক আন্দোলনে সার্তের প্রভাব ছিল অপরিসীম। বিউপনিবেশায়নের আন্দোলনে যুক্ত মধ্যেপ্রাচ্যের অনেক আরব ছিল অস্তিত্ববাদ ও মুক্তির ওপর রচনা করা সার্তের দার্শনিক লেখার ভক্ত। তিনি যা লিখেছেন তার সবই বয়সে তরুণ সাইদের কাছে আকর্ষণীয় লেগেছিল। কারণ, সার্তের লেখার মধ্যে এক ধরনের দুঃসাহস দেখতে পেতেন তিনি। তাই আমন্ত্রণ পাওয়ার পর তরুণ সাঈদ আর দ্বিতীয়বার ভাবেননি, সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি ফ্রান্সে গেলেন।
সার্ত্র আর বুভোয়ার প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা থাকলেও নিজের পছন্দের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সাঈদ খুব হতাশ হন। ফ্রান্সে আসার পর তার কাছে পাঠানো একটা রহস্যময় নোটের মাধ্যমে সাঈদকে জানানো হয় যে, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে তার মোলাকাত সার্ত্র-বুভোয়ার ফ্ল্যাটে না, বরং মিশেল ফুকোর বাসায় হবে।
সেখানে যাওয়ার পর সাঈদ দেখতে পান বুভোয়া চাদরের বিপক্ষে লেকচার দিচ্ছেন। চাদর এমন একটা পোশাক, যেটা ইরানের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের পর পাশ্চাত্যের প্রায় সব বুদ্ধিজীবী ভেবেছিলেন ইরানে নারীদের স্বাধীনতা সব দিক দিয়ে ক্ষুণ্ন করা হবে। আর সেটার একটা মাধ্যম হবে এ চাদর। তবে বিপ্লবের আগে স্বাধীনতা পাওয়ার বদলে ইরানের নারীরা যে নির্যাতন সহ্য করেছেন সেটার ব্যাপারে পাশ্চাত্যের মিডিয়া সব সময় চুপ থেকেছে। কওম থেকে তেহরান, পূর্ব আজারবাইজান থেকে ইসফাহান, ইরানে এমন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে শাহের সময়ে নারীদের ওপর অত্যাচার করা হতো না। সাভাকের লোকেরা আয়াতুল্লাহদের দমানোর জন্য সবচেয়ে নিকৃষ্ট পন্থাও অবলম্বন করেছিল, আয়াতুল্লাহদের সামনেই তাদের কন্যাদের ধর্ষণ করা হয়েছিল। পোলিশ সাংবাদিক আর লেখক রিশার্ত কাপুসচিন্সকির বই শাহেদের শাহ (১৯৮২)-এ এমন অনেক নির্যাতনের বর্ণনা দেওয়া আছে। পাশ্চাত্য শাহের গোপন গোয়েন্দা পুলিশ বাহিনী সাভাকের এ রকম নির্যাতনের কথা জানত, কিন্তু তারপরও তারা চুপ ছিল। কারণ, ইরানে তখন নতুন নতুন তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়ে চলছিল।
ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোসাদ্দেঘ ইরানের তেলের জাতীয়করণ করেছিলেন, যার জন্য তিনি কিছুদিনের মধ্যেই পাশ্চাত্যের দেশগুলোর চক্ষুশূল হয়ে পড়েন। শাহের মাধ্যমেই মোসাদ্দেঘকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টা ভেস্তে গেলে শাহ দেশ থেকে পালিয়ে যান। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোসাদ্দেঘকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে অনির্বাচিত রেজা শাহ পাহলভিকে সিংহাসনে আর দেশে ফেরত নিয়ে আসে সিআইএ। এরপর বিভিন্নভাবে শাহকে সন্তুষ্ট করে তেল থেকে অর্জিত অর্থ নিজেদের দেশে নিয়ে যাওয়ার একটা মরিয়া প্রচেষ্টা ছিল পাশ্চাত্যের দেশগুলোর। মধ্যেপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোতেও তেলের খনি আবিষ্কৃত হচ্ছিল, কিন্তু ইরানের মতো কোনো দেশই তখন এতটা উদার ছিল না; শাহের উদারতার ফাঁক গলে ইরানে প্রবেশ করা সহজ ছিল যে কোনো পাশ্চাত্যের বহুজাতিক কোম্পানির কাছে।
যার সঙ্গেই সেদিন বুভোয়ার কথা হচ্ছিল তাকেই কেইট মিলেটকে সঙ্গে নিয়ে আসন্ন তেহরান ভ্রমণের কথা জানাচ্ছিলেন তিনি। কেইট মিলেট আর সিমঁ দ্য বুভোয়া দুজনেই চাচ্ছিলেন তেহরানে গিয়ে চাদরের বিপক্ষে একটা বিক্ষোভ করতে। বুভোয়ার এ চিন্তা সাইদের কাছে অর্থহীন বলে মনে হলো। কিন্তু সাঈদ সেখানে তার সঙ্গে কোনো ধরনের বিরোধিতায় গেলেন না। এক ঘণ্টা পর বুভোয়া সেখানে থেকে চলে গেলেন এবং তার আর দেখা মিলল না।
হিজাব, নিকাব, বোরকাসহ মুসলিম নারীদের পোশাক নিয়ে পশ্চিমের আক্রমণ আর সমালোচনার মাঝখানে সাঈদ আর বুভোয়া এখনো আলোচনায় আছেন সে কথা না বললেই নয়। এসব পোশাকের পক্ষে সাবা মাহমুদ, লাইলা আবু-লুঘোদ নিয়মিত বলেছেন, লিখেছেন। তারা নিজেরা সব সময় পশ্চিমের বর্ণবাদী ধারণার বিরুদ্ধে সাঈদের লেখা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
বুভোয়া সম্পর্কে সাঈদ আরও লিখেছিলেন যে, মুসলিম নারীদের পর্দা আর ইসলামের ব্যাপারে বুভোয়ার ধারণা একপেশে ছিল। তাই তিনি সেখানে চলে যাওয়াতে সাঈদ খানিকটা স্বস্তি পাচ্ছিলেন। তবে সে সম্মেলনে সার্ত্রকে তিনি খুঁজে পেলেন বুভোয়ার একদম বিপরীত মানুষ হিসেবে : নিরুত্তর এবং আকর্ষণহীন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেল, কিন্তু তিনি প্রায় কিছুই বললেন না। একদম চুপ করেই ছিলেন। সাঈদ তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাদের মধ্যেকার আলোচনা এগোল না। সাঈদের মনে হলো সার্ত্র হয়তো কানে শোনেন না। কিন্তু সে রকম হয়ে থাকলে সেটা তার আগে থেকেই জানার কথা ছিল।
ফুকোর সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা ছিল সাঈদের। কিন্তু ফুকো তাকে বলেই ফেললেন যে সে সেমিনারে যোগ করার মতো আর কিছু তার জন্য নেই এবং তিনি বিবলিওতেক নাসিওনালে গবেষণা করতে যাবেন। এটা শুনে সাঈদ হতাশ হলেও তার লেখা বিগিনিংস বইটি ফুকোর বুকশলফে দেখে খানিকটা খুশি হলেন।
তবে সাঈদের কাছে সবচেয়ে কষ্টকর ব্যাপার ছিল ইসরাইলের প্রতি সার্ত্র, বুভোয়া এবং ফুকোর অটল সমর্থন। সাঈদ খুব অবাক হয়েছিলেন এটা দেখে, যে সার্তের আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল, সেই সার্ত্র’ই ফিলিস্তিনিদের সমর্থন দিতে অস্বীকার করলেন। সাঈদের বর্ণনা অনুসারে সেদিন সার্ত্র আগে থেকে টাইপ করা দুই পৃষ্ঠার একটা লেখা নিয়ে পড়ে শুনিয়েছিলেন। ফিলিস্তিনের কথা সেখানে অল্প করে বলা হলেও ইসরাইলের উপনিবেশবাদী আচরণের ব্যাপারে কিছুই ছিল না। সাংবাদিকরা যেভাবে কোনো রাষ্ট্রনায়কের প্রশংসা করে সেভাবে আনোয়ার সাদাতের ব্যাপারে প্রশংসাই ছিল বেশি। পাঠ করা শেষ হলে সার্ত্র আগের মতোই চুপ করে রইলেন, সারা দিন কারও সঙ্গে আর খুব বেশি কথা বললেন না। সাঈদের তখন ২০ বছর আগের একটা গল্পের কথা মনে এলো, সার্ত্র একবার রোমে গিয়েছিলেন ফ্রঁৎস ফানোঁর সঙ্গে দেখা করতে (ফানোঁর তখন লিউকোমিয়া ধরা পড়েছিল, তার আয়ু আর খুব বেশি দিন ছিল না)। টানা ১৬ ঘণ্টা ধরে তারা আলজেরিয়ার স্বাধিকারের ব্যাপারে আলাপ করেছিলেন, পরে সিমঁ দ্য বুভোয়ার হস্তক্ষেপে সেই আলাপে ছেদ পড়ে।
ফানোঁ সার্ত্র আর সিমঁ দ্য বুভোয়া। দুজনেরই বন্ধু ছিলেন। এমনকি সার্ত্র ফানোঁর দ্য রেচেড অব দ্য আর্থ-এর ভূমিকাও লিখে দিয়েছিলেন। সাঈদের বারবার এ গল্পটার কথাই মনে পড়ছিল তখন। আলজেরিয়ার স্বাধিকার আন্দোলনের পক্ষের মানুষ ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে এতটা নির্লিপ্ত থাকতে পারেন কীভাবে!
অন্যদিকে, বিংশ শতাব্দীতে আরব বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই সার্তের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন। সার্তের অস্তিত্ববাদী লেখা থেকে উদ্দীপ্ত হয়ে তারা নিয়েছিলেন এমন এক নীতিবিদ্যা, যেটা তাদের নিজের ক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে সচেষ্ট করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক প্রয়োজনকে চিহ্নিত করা, যেটা বিউপনিবেশায়নে এবং উত্তর-উপনিবেশিক সময়ে নিজেদের আবার আবিষ্কার করতে সহায়তা করেছিল।
আরবের এ বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে সার্তের সম্পর্ক ইতিবাচকই ছিল। তবে বিশেষ করে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর সার্ত্র ফিলিস্তিন-ইসরাইল প্রসঙ্গে নিজের অবস্থানকে খুব বেশি নিরপেক্ষ করে তোলেন। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ হয়েছিল জুনের ৫ তারিখ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত। ইসরাইলের সমর্থকরা পাশ্চাত্য মিডিয়ায় এই বলে বিশ্বকে বুঝিয়েছিল যে, ইসরাইলের আরব প্রতিবেশীরা, মিসর, জর্দান ও সিরিয়া, যে পরিমাণ সৈন্য ইসরাইলের আশপাশে মোতায়েন করেছিল তাতে বোঝাই যায় যে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ইসরাইলকে মুছে ফেলা। নিজেদের অস্তিত্বের ব্যাপারে শঙ্কায় ইসরাইল নিজেদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবেশীদের মোকাবিলা করে আর ছয় দিনের ভেতর যুদ্ধটি জিতে যায়। যুদ্ধ জয়ের পর ইসরাইলি আগ্রাসন বহুগুণে বৃদ্ধি পায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যেটা এখনো চলমান।
ফিলিস্তিনকে সমর্থন করার ব্যাপারে কি সার্তের মনোভাব আগে ইতিবাচক ছিল, পরে সে ইতিবাচক মনোভাব পালটে যায়, নাকি ইসরাইলের প্রসঙ্গে তিনি নিরপেক্ষ থেকে আরও বেশি নিরপেক্ষ হওয়ার ভান করে গেছেন সেটা এখন এ মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে ইসরাইলি ইতিহাসবিদ ইয়োভ দি-কাপুয়া’র নো এক্সিট : আরাব এক্সিসটেনশিয়ালিজম, জাঁ-পল সার্ত্র অ্যান্ড ডিকলোনাইজেশন (২০১৮) বইয়ে তিনি বলেছেন যে, ইসরাইলের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কিছু বলার বদলে সার্ত্র আশ্চর্যজনকভাবে চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। আরবের বুদ্ধিজীবীরা এ বিষয়টা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে উঠতে পারেননি, কারণ তারা সার্ত্রকে দারুণ শ্রদ্ধা করতেন। ফিলিস্তিনি ‘আদার’-এর চেয়ে সার্তের কাছে তখনো ইহুদি ‘আদার’ বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ঠেকেছিল, যদিও ইহুদিদেরকে ‘আদার’ করার পেছনে দায়ী হলোকস্ট হয়েছিল ২২ বছর আগে, আর সে-হলোকস্ট ঘটার জন্য ফিলিস্তিনিরা কোনোভাবেই দায়ী ছিল না।
দুই সময়ে নিপীড়িত মানুষের পক্ষেই বলতে পারতেন সার্ত্র। কিন্তু তিনি ১৯৬৭ সালে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসনের ব্যাপারে যেমন নিশ্চুপ ছিলেন, নিশ্চুপ ছিলেন পরবর্তী সময়েও, আর তাই বয়সে যুবক সাঈদের আশা সেদিন দুরাশায় পরিণত হয়েছিল।
