Logo
Logo
×
   

খবর

মাদকের নেশায় ‘পশু’তে রূপ

জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মাদকের নেশায় ‘পশু’তে রূপ

সমাজে ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর এই নিষিদ্ধ পণ্য সেবনকারীরা প্রায়ই বিবেকবর্জিত ও ঘৃণিত কাজে লিপ্ত হচ্ছে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে পাশবিক নির্যাতন করে হত্যাকারী সোহেল রানা ইয়াবাসহ নিয়মিত মাদক সেবন করত বলে জানা গেছে।

শুধু শিশু রামিসার হত্যাকারীই নয়, সারা দেশেই খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতিসহ নৃশংস ও বর্বোরোচিত বেশির ভাগ ঘটনার পেছনেই উঠে আসছে মাদকের ভয়াল প্রভাব। মাদকের নেশাই যেন মানুষকে ‘পশু’ বানিয়ে ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেশাজাতীয় অ্যালকোহল পণ্য থেকে শুরু করে সমাজে যত ধরনের মাদকদ্রব্য রয়েছে সেগুলো সেবনে মস্তিষ্কের বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটায়। মাদকাসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, রোগাক্রান্ত হৃদপিণ্ড যেমন সুস্থ হৃদপিণ্ড থেকে ভিন্ন, তেমনি আসক্তি-মুক্ত মস্তিষ্কের থেকে আসক্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কও বায়োলজিক্যালি ভিন্ন। ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স ইমেজিং, পজিট্রন ইমিশন টোমোগ্রাফি স্ক্যান, সিঙ্গেল ফোটন ইমিশন কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি প্রভৃতি ইমেজিং পরীক্ষায় এ ভিন্নতা স্পষ্ট হয়।

এছাড়া অন্যান্য শারীরিক দীর্ঘমেয়াদি রোগে যেমন ব্যক্তির বংশগতি, পরিবেশ ও বিকাশে ভূমিকা পালন করে, তেমনটি ঘটে মাদকাসক্তিতেও। গবেষণায় আরও দেখা যায়, নিকোটিন, মদ ও অন্যান্য মাদকে ব্যক্তির আসক্ত হওয়ার ঝুঁকির প্রায় ৫০ শতাংশই নির্ভর করে তার জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর। এসব কারণে মাদকাসক্তি একটি ‘রোগ’ বলে স্বীকৃত।

‘ইন্টারন্যাশনাল ক্ল্যাসিফিকেশন অব ডিজিজেজ’ (আইসিডি) এবং আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক মানসিক রোগের শ্রেণিবিভাগ ‘ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজঅর্ডারস’-এর সর্বশেষ সংস্করণ অনুযায়ী, যে কোনো মাদকাসক্তিই এক ধরনের মানসিক রোগ।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক (সাইকিয়াট্রি) ডা. মুনতাসীর মারুফ যুগান্তরকে বলেন, একজন ব্যক্তি যখন আসক্ত থাকে, সে সময় ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, লাভ-ক্ষতি বোঝার মতো অবস্থায় সে থাকে না। মাদক তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিচার-বিবেচনা বোধ কেড়ে নেয়। তখন সে হত্যা, ধর্ষণ, রাহাজানির মতো গুরুতর অপরাধ করতে কুণ্ঠাবোধ করে না। এ কারণে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে কাউন্সেলিং করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘ইয়াবার আনন্দ আর উত্তেজনা আসক্তদের সাময়িকভাবে সব যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়। তারা বাস করে স্বপ্নের এক জগতে। ইয়াবার প্রচণ্ড উত্তেজক ক্ষমতা আছে বলে যৌন-উত্তেজক হিসেবে অনেকে ব্যবহার করে এটি। ক্ষুধা কমিয়ে দেয় বলে স্লিম হওয়ার ওষুধ হিসেবে অনেকে ইয়াবা সেবন করে। কিন্তু এই সাময়িক আনন্দের ট্যাবলেটটি যে তাদের ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে তা টের পাওয়ারও অবকাশ সে সময় তাদের থাকে না।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. তৈয়বুর রহমান বলেন, ইয়াবা সেবনে প্রথম দিকে বেশ কিছু শারীরিক লক্ষণ পরীলক্ষিত হয়। যেমন-শরীরে যথেষ্ট এনার্জি অনুভব করা, ঘুম কমে যাওয়া, ক্ষুধামান্দ্যের কারণে ওজন কমে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া ইত্যাদি। দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক অপুষ্টি, হার্ট অ্যাটাক, ব্রেন স্ট্রোক, খিঁচুনি ইত্যাদি হতে পারে। নিয়মিত ব্যবহারে অস্থিরতা, হতাশা, বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা, রাগ, সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা, হ্যালুসিনেশন, আগ্রাসী ও মারমুখী আচরণ, এমনকি আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক অধ্যাপক মো. তাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তির দৃঢ় মোটিভেশন চিকিৎসার ফলাফলকে ত্বরান্বিত করে। মাদকাসক্তি থেকে ‘রিকভারি’ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ওষুধ, কাউন্সেলিং (একক বা দলগত), আচরণগত থেরাপি-প্রভৃতি কার্যকর চিকিৎসার অন্যতম উপাদান।

রিকভারি প্রক্রিয়ায় একাধিকবার বিচ্যুতি ও পুনরায় মাদকে আসক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে। এজন্য চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। তিনি আরও বলেন, মাদকাসক্তদের জন্য বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .