সদর দপ্তরে প্রস্তাব
চট্টগ্রামে অপরাধ দমনে ৪ ক্যাম্প, ড্রোন চায় পুলিশ
আড়াই বছরে ৪০ খুন * নিয়োজিত হবে এপিবিএন * নজরদারিতে থাকবে এআই ক্যামেরা, থার্মাল ড্রোন
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উত্তর চট্টগ্রামের তিন উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। রাঙ্গুনিয়া, রাউজান ও ফটিকছড়িতে আড়াই বছরে অন্তত ৪০ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এগুলোর বেশির ভাগই টার্গেট কিলিং। এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে পুলিশ অভিযান চালালেও দৃশ্যমান সফলতা আসেনি। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই তিন উপজেলার চার স্থানে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ডিআইজির কার্যালয় একটি প্রস্তাব পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে।
এছাড়া রাউজানের স্থানীয় সংসদ-সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে রাজানগরের ঠান্ডাছড়ি ও পদুয়ার দ্বারিকোপে দুটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠিও দিয়েছেন বলে জানা গেছে। পুলিশের প্রস্তাবে প্রতিটি ক্যাম্পে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্যদের মোতায়েনের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। অপরাধী শনাক্তে এসব ক্যাম্পে থাকবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) ফেস ডিটেক্টর ক্যামেরা, ব্যবহার করা হবে থার্মাল ড্রোন; যাতে অপরাধীদের তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চট্টগ্রামের ডিআইজি কার্যালয় রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উপায় নিয়ে কাজ করছে। এর অংশ হিসাবে একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসব এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর গত মাসে সদর দপ্তরে একটি চিঠি পাঠানো হয়।
ডিআইজির স্বাক্ষর করা চিঠিতে বলা হয়, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ ও দুর্গম এলাকায় নিয়মিত টহল চালাতে থানা পুলিশকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়। এই তিন উপজেলায় পাঁচটি থানা ও ১০টি ফাঁড়ি রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে নতুন করে চার ক্যাম্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রতিটি ক্যাম্পে সিভিল স্টাফসহ ৫৫ এপিবিএন সদস্য কর্মরত থাকবেন। সেই হিসাবে চার ক্যাম্পে ২২০ জনবলের চাহিদার কথা বলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এ ক্যাম্পগুলো হলে এসব এলাকায় ২৪ ঘণ্টা চেকপোস্ট থাকবে। এতে এআই ক্যামেরায় মানুষের ছবি রেকর্ড থাকবে, চলাচল করা যানবাহনগুলো ট্র্যাকিংয়ের আওতায় থাকবে। এছাড়া বিস্ফোরকজাতীয় এসব এলাকায় ঢুকলে থার্মাল ড্রোনের সাহায্যে এর বাহককে চিহ্নিত করা যাবে।
ডিআইজির প্রস্তাবে বলা হয়, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির অধিকাংশ এলাকা দুর্গম ও বিস্তীর্ণ পাহাড়ি বনাঞ্চল হওয়ায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম, রাজনৈতিক সহিংসতা, অস্ত্রের ব্যবহার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের রেকর্ড রয়েছে। এসব এলাকায় ১৯টি চা-বাগান রয়েছে। এগুলোর ভেতরে সন্ত্রাসীরা কার্যকলাপ চালায়। এসব এলাকায় আরও চারটি এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপন করা হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাস দমন, দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনিব্যবস্থা নেওয়া ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি এসব উপজেলার মধ্যে রাউজানে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো এসব ঘটাচ্ছে। চট্টগ্রামে টার্গেট কিলিংয়ে একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘এইট মার্ডার’ মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাজ্জাদ আলী খান। বিদেশে বসে এই সন্ত্রাসী তার অনুসারীদের দিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে।
সবশেষ ৩ সেপ্টেম্বর রাতে রাউজানের কেরানীহাট এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে যুবদল কর্মী মোহাম্মদ করিমকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তিনি উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
১৩ জুন এই সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে নির্মমভাবে খুন হন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী। রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় জোড়া খুন হয়। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুইজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। এভাবে আড়াই বছরে সন্ত্রাসীদের হাতে অন্তত ৪০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, উত্তর চট্টগ্রামের তিন উপজেলায় চারটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়ে একটি প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সদর দপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি।
