উড়ালসড়কেও দাপট
নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তারে বাড়ছে ঝুঁকি * পুরান ঢাকায় এক হাজারের বেশি অবৈধ রিকশা গ্যারেজ
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর উড়ালসড়কেও ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য বেড়েছে। দ্রুতগতির যান চলাচলের জন্য নির্মিত উড়ালসড়কে ধীরগতির তিন চাকার যান ওঠায় তৈরি হচ্ছে নতুন ঝুঁকি। বাস, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসের ফাঁকে ফাঁকে রিকশা চলাচল করায় ঘটছে দুর্ঘটনা। পুলিশি নজরদারি না থাকায় চালক ইচ্ছামতো ফ্লাইওভারে উঠছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও উড়ালসড়কে সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।
শনিবার মালিবাগ ফ্লাইওভারে দেখা যায়, অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে উড়ালসড়কেও পাল্লা দিয়ে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। কোনোটি ধীরগতিতে এক লেনে চলছে, আবার কোনো চালক পেছন থেকে আসা গাড়িকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ লেন পরিবর্তন করছেন। দ্রুতগতির গাড়িগুলোকে তখন বাধ্য হয়ে ব্রেক কষে পাশ কাটাতে হচ্ছে। ফ্লাইওভারে রিকশা নিয়ে ওঠা মিজান নামে এক চালক বলেন, ‘নিচে অনেক জ্যাম থাকে। তাই এদিক দিয়ে আসি। সবসময় আসি না, মাঝেমধ্যে আসি।’
নিয়মের তোয়াক্কা নেই প্রধান সড়কেও : শুধু উড়ালসড়ক নয়, রাজধানীর প্রধান সড়কেও ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল বেড়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, যাত্রী পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক চালক দ্রুতগতিতে রিকশা চালান। কোনো যাত্রী হাত ইশারা দিলেই সড়কের মধ্যে যেখানে-সেখানে থামছেন। কেউ আবার পেছনে গাড়ি আসছে কি না, তা না দেখেই হঠাৎ লেন পরিবর্তন করছেন। বিশেষ করে মোড়, বাসস্ট্যান্ড, বাজার ও গলির মুখে পরিস্থিতি আরও জটিল। যাত্রী ওঠানামার সময় রিকশা রাস্তার বড় অংশ দখল করে রাখায় অন্য যানবাহনকে পাশ কাটিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে সংঘর্ষের আশঙ্কা। রিকশার যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ। হঠাৎ ব্রেক, দ্রুত বাঁক নেওয়া কিংবা অন্য গাড়ির ধাক্কায় যাত্রী ছিটকে পড়ার ঘটনাও ঘটছে। শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
গ্যারেজে রাতভর চার্জ, ভোরেই সড়কে : অটোরিকশার এই বিস্তারের পেছনে রয়েছে পুরান ঢাকাকেন্দি ক বিশাল গ্যারেজ নেটওয়ার্ক। লালবাগ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও চকবাজারের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে, আবাসিক ভবনের নিচে, সরু গলিতে, পরিত্যক্ত ভবনে, বেড়িবাঁধসংলগ্ন জায়গায় এমনকি সরকারি জায়গা দখল করেও গড়ে উঠেছে গ্যারেজ। সরেজমিন লালবাগে অন্তত ১০০, হাজারীবাগে প্রায় ১৫৫, চকবাজারে অন্তত ১০ এবং কামরাঙ্গীরচরে ছোট-বড় প্রায় ৭০০ গ্যারেজের তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয় গ্যারেজ মালিকদের দাবি, শুধু কামরাঙ্গীরচরেই গ্যারেজ ও কারখানার সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। সন্ধ্যার পর সড়ক থেকে রিকশাগুলো ঢুকতে শুরু করে গ্যারেজে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে ব্যাটারি চার্জ। ভোর হলেই আবার রিকশাগুলো বেরিয়ে পড়ে। ফলে রাতের বেলায় গলিতে রিকশার সারি আর দিনের বেলায় প্রধান সড়কে এসব যান-দুই সময়েই বাড়ছে জনভোগান্তি। কামরাঙ্গীরচরের এক গ্যারেজ মালিক আহাদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক জায়গা ম্যানেজ করে রিকশা রাখি। এজন্য মাসে হাজার হাজার টাকা দিতে হয়।’
সরকারি জায়গা দখল করে গ্যারেজ : লালবাগের সেকশন ঢাল থেকে বেড়িবাঁধের রাস্তা ধরে র্যাব-১০ কার্যালয়ের আগপর্যন্ত এলাকায় সরকারি জায়গা দখল করে একাধিক গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো জায়গায় পাশাপাশি এক লাইনে ১২ থেকে ১৫টি পর্যন্ত রিকশা রাখা হয়েছে। নবাবগঞ্জ ক্লাববাড়ি মোড়, শহীদনগর, জেএন সাহা রোড, রাজনারায়ণ ধর রোডসহ আশপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে আছে গ্যারেজ। হাজারীবাগের বরইখালী, বউবাজার, ঝাউচর, বালুর মাঠ ও শাহজাহান মার্কেট এলাকায়ও একই চিত্র। কোথাও সরু গলির দুপাশে রিকশা রাখা, কোথাও পরিত্যক্ত ভবনের ভেতরে সারি করে রাখা হয়েছে ব্যাটারিচালিত যান।
নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার : গ্যারেজকে কেন্দ করে তৈরি হয়েছে আলাদা অর্থনৈতিক বলয়। পার্কিং, চার্জিং, ব্যাটারি মেরামত, যন্ত্রাংশ বিক্রি ও গ্যারেজ ভাড়ার মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল অর্থের লেনদেন হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও কোথাও অননুমোদিত সংযোগ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। এতে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, শুধু সড়কে রিকশা আটকে দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। গ্যারেজগুলো কোথায়, কতটি গাড়ি সেখানে রাখা হচ্ছে, কীভাবে চার্জ দেওয়া হচ্ছে, এসব বিষয় একসঙ্গে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা হচ্ছে। প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার অটোরিকশা আটক করা হয়। কিন্তু সেটা কোনো সমাধান নয়। নীতিমালা হলেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
