Logo
Logo
×
   

Advertisement

ঘরে বাইরে

ভ্রমণ

লামার সুখিয়া পাহাড় এবং মাতামুহুরী নদী

Advertisement

Icon

আবু আফজাল সালেহ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

লামার সুখিয়া পাহাড় এবং মাতামুহুরী নদী

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

‘লামা’ নাম শুনলেই অন্যরকম অনুভূতি হয়! যেখানে পাহাড় অরণ্য, নদী ও আকাশ মিতালি করে মনে দোলা দেয়, শুনিয়ে দেয় কত গল্প-জুমঘর, মাতামুহুরী নদী, পাহাড়ি মানুষ ও সংগ্রাম, নিস্তব্ধতার মধ্যে পাখি ও ঝিঁঝির ডাক। এসব অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে মে ২৬-এর শেষের দিকে।

লামার সুখিয়া পাহাড় ট্র্যাকিং করার মজাই আলাদা। পিচের রাস্তা নেই, মেঠোপথ। মেঠোপথ বারবার হারিয়ে যায় বিভিন্ন বাঁকে-গভীর অরণ্যে-সবুজে। মাঝে-মধ্যে জুমঘর আর কটেজ। এখানে স্থানীয়রা পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। রাত দেবে স্বর্গীয় অনুভূতি-ভয়ংকর রোমাঞ্চ! নিরিবিলির স্বর্গ। সুখিয়া ও দুখিয়া মিলে যমজ পাহাড়-এ দুপাহাড় ও তাদের বিভিন্ন ভাঁজ, উপত্যকা নিয়ে লামা শহর ও আশপাশ। মাতামুহুরী নদী লামার প্রাণ। এ নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা লামার প্রধান বৈচিত্র্য।

প্রাকৃতিক রূপ-বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ নিসর্গ পাহাড়ি কন্যার নাম ‘লামা উপজেলা’ হতে যাচ্ছে অনেক আকর্ষণীয় এবং সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু। হাতে মেঘ ছুঁয়ে দেখা কিংবা পাহাড়ি সৌন্দর্যে বুঁদ হতে চাইলে পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুবান্ধব নিয়ে ঘুরতে যাওয়া হবে বিরাট পাওয়া। মিরিঞ্জা, মারাইংছা হিল, সুখিয়া ভ্যালি, রিভার হিল, বিলছড়ি বৌদ্ধ বিহার, নুনারঝিরি-আইম্যারা ঝিরি-নকশাঝিরিসহ অসংখ্য ঝরনা, মাতামুহুরী নদী ও লামা খালে নৌকাভ্রমণ, দুখিয়া-সুখিয়াসহ অসংখ্য পাহাড় ট্রেকিং, লামা খাল মাস্টারপাড়া সুড়ঙ্গ (গুহা) জালের মতো ছিটিয়ে রয়েছে লামা উপজেলায়। সুখিয়া ভ্যালিতে পৌঁছাতে বাঁকে বাঁকে ও পাহাড়ের বিভিন্ন ভাঁজ থেকে মাতামুহুরী নদীর বিভিন্ন রূপ ও রং কিংবা দৃশ্য ভ্রমণকে করে তুলবে মোহনীয় আরও আদরনীয়।

গত ২০ মে ঢাকা থেকে লামার উদ্দেশে রওয়ানা দিলাম। সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে শ্যামলী ও হানিফ পরিবহণের বাসে সরাসরি আলীকদম ভায়া-লামা-চকোরিয়ায় যাওয়া যায়। তবে আমি গিয়েছিলাম কক্সবাজারগামী বাসে। ভোরে চকোরিয়া নেমে লোকাল বাসে লামা। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য ধীরগতির লোকাল বাসে উঠলাম। লামার ভাড়া ৭০ টাকা। মাতামুহুরী বাস সার্ভিসে চড়ে বাস ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। পাহাড়ের খাঁজে সবুজের সমারোহ। আর আঁকাবাঁকা রাস্তা সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ভয়ের কারণও আছে। এ কারণে লামা পর্যন্ত রোমাঞ্চকর যাত্রা বেশ উপভোগ্য লাগল। ঘণ্টাখানেক সবুজ পাহাড় মাড়িয়ে লামা বাস টার্মিনাল পৌঁছলাম। এরপর লামা শহরে কিছু সময় ঘোরাঘুরি করলাম। শহরের পাশেই খেয়াঘাট। মাতামুহুরী নদীর বয়ে চলা। কী সুন্দর তার বয়ে চলার দৃশ্য। ওপারেই সুউচ্চ সব পাহাড়, সবুজ, অরণ্য। শহর পেরিয়েই চকোরিয়ার কয়েকটি ইউনিয়ন। এরপরই একটি ব্রিজ। ব্রিজ থেকে দুদিকের মাতামুহুরী নদীর আঁকাবাঁকা বয়ে চলা। অসম্ভব সৌন্দর্যে ভরপুর। একটু পেরিয়েই সুখিয়া পাহাড়।

পাহাড়ে একাকী ভ্রমণ খুব আনন্দদায়ক না-ও হতে পারে। পাহাড়ে ট্র্যাকিং করতে হলে জুমঘর কটেজে থাকতে হয়। দল মিলে গেলে থাকা-খাওয়ার খরচ কম হয়। ভয় থাকে কম। কিন্তু রোমাঞ্চকর অনুভূতি কম হয় না। সুখিয়া ভ্যালি যেতে বেশ কিছু জুমঘর, কটেজ, ভ্যালি পার হয়ে যেতে হবে। অনেক বাঁক থেকে মাতামুহুরী নদী দেখা যায়-নদী যেন নারীর মতো কথা কয়। বিভিন্ন ভাঁজে রং-বেরঙের জুমঘর পাহাড় ও নদীর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলেছে-করেছে আরও কমনীয়। প্রতি মুহূর্ত রাঙিয়ে দিচ্ছে সবুজ অরণ্য, পাহাড়ের ভাঁজ আর মাতামুহুরী নদী। রিভারভিউ রিসোর্ট থেকে ‘ইউ আকৃতির’ মাতামুহুরী নদী কী নান্দনিক দৃশ্য সৃষ্টি করেছে। এ রিসোর্টের একধাপ ওপরের শীর্ষবিন্দু সুখিয়া ভ্যালি থেকে এ দৃশ্য আরও চমৎকার।

পাহাড়ের ওপর উঠতে থাকলাম। মাঝপথে একটি চায়ের দোকান। সেখানে বসে চা পান করলাম। নদী নারীর মতো বয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ সেগুনগাছ। পোকামাকড় আর পাখির ডাকে নির্জনতাকে মোহনীয় করছে। এখানেও কিছু কটেজ ও কিছু জুমঘর আছে। কিছুক্ষণ পর হালকা ঝড়, মেঘ। অপেক্ষায় থাকলাম বৃষ্টির। পাহাড়ের অরণ্যে বৃষ্টিবিলাস কী অপূর্ব ও উপভোগ্যময় তা লিখে প্রকাশ করা যায় না। বৃষ্টি শুরু হলো। আবার চায়ের কাপে চুমুক। চুমুকে চুমুকে গভীর পাহাড়ের দৃশ্য। একটু দূরেই নদী। কী সবুজ অরণ্য। বৃষ্টিবিলাস। কী নয়নাভিরাম। অনেক আকাঙ্ক্ষা, বর্ষাকালের বাইরে পাহাড়ে বৃষ্টি দেখব বলে। লামার পাহাড়ে আজ সে আশা পূর্ণতা পেল। ভিড় নেই বললেই চলে। প্রচণ্ড গরমে পর্যটকের সংখ্যা কম। আবার সরকারি ছুটির দিনও নয়। এটিও পর্যটক কম হওয়ার কারণ। দুর্গম পথ পর্যটকের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে; কিন্তু পাহাড়ে গরম নেই, উপভোগ্য আবহাওয়া।

বৃষ্টির পর দুর্গম পথ পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক হয়ে যায়। একটু অপেক্ষা করে ভয় ও রোমাঞ্চ নিয়েই উঠতে থাকলাম। পাহাড়ের শীর্ষস্থান সুখিয়া ভ্যালির দিকে। নির্জন মাটির উঁচু-নিচু ও ভঙ্গুর পথ মাড়িয়ে উঠতে থাকলাম। পাহাড় ভাঁজে মাঝে-মধ্যে জুমঘর। বৃষ্টির পর ঝুঁকি নিয়েই পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকলাম। ঝুঁকি না থাকলে কীসের রোমাঞ্চ। ওই নদী ডাকে, ওই পাহাড় ডাকে, এ অরণ্য হাতছানি দেয়। এ দৃশ্য পর্যটককে প্রলুব্ধ করতে থাকে। কী যে মায়ার টান, কী যে জাদু পাহাড়ের ঝুঁকিময় রাস্তায়। উপভোগ করতে করতে ট্র্যাকিং করতে থাকলাম। ছোট ছোট জুমঘর, অরণ্য পেরিয়ে পাহাড়ের শীর্ষে উঠতে থাকলাম। নির্জনে চলতে চলতে একটি চায়ের দোকানে চা পান করলাম। এরপর দেখা পেলাম রিভারভিউ রিসোর্ট। এখান থেকে মাতামুহুরী নদী দেখতে কতই না সুন্দর! বেশকিছু কটেজ রয়েছে। বসার ব্যবস্থা আছে। কটেজের বেলকুনি থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোহর! নদী আর পাহাড়, সবুজ আর নীল আকাশ মিলেমিশে একাকার। আরও কিছুক্ষণ পাহাড় ট্র্যাকিং শেষে সুখিয়া ভ্যালি পাহাড়। চমৎকার স্পট। প্রকৃতি আরও মোহনীয়। এ নির্জনে প্রকৃতির মধ্যে থাকতে পারলে জীবনের কিছুটা অংশ সার্থকতা পাবে।

বিভিন্ন ভাঁজের জুমঘর দেখলেই নৈসর্গিক আনন্দ পাওয়া যায়। মনে হয়, এখানেই সারা জীবন কাটিয়ে দিই। আসলেই কোলাহলমুক্ত এ পরিবেশ প্রকৃতিপ্রেমী সবার কাম্য। জুমঘর থেকে নদী দেখা কিংবা প্রকৃতি উপভোগ করা দারুণ ব্যাপার। সুখিয়া পাহাড়ের এক জুমঘরের বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে অনন্য অনুভূতি জাগে মনে মনে বলেই ফেলি কবিতার সুর :

‘জুমঘরের বারান্দা থেকে নদী

জুমঘরের বারান্দা থেকে প্রকৃতি

কী যে ভালো লাগে! কী যে ভালো লাগে!

মনীষা এসে দাঁড়ায় চোখের জানালায়

প্রকৃতি এসে দোলে মনের কোণে!

ফিসফিস করে বলে, কবিতা লেখো

কবিতা লেখার সময় এখন।’

যাতায়াত : কক্সবাজারগামী বাসে চকোরিয়া নামতে হবে। এরপর লামা বাসস্টেশন থেকে ৭০ টাকা ভাড়া দিয়ে লামা। আলীকদম যেতে ১০০ টাকা। জিপও পাওয়া যাবে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে শ্যামলী ও হানিফ পরিবহণে আলীকদম ভায়া-লামা যাওয়া যায়। ভাড়া ননএসি ১ হাজার ১০০ টাকা। লামা পার্বত্য এলাকা হওয়ায় বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট রয়েছে। ওইসব চেকপোস্টে কিংবা আবাসিক হোটেলে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি দেওয়া লাগতে পারে।

থাকা ও খাওয়া : লামা বা চকোরিয়ায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া গভীর ও নির্জন পাহাড়ে জুমঘর কিংবা কটেজ পাওয়া যাবে। এখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। নির্জন পাহাড়ে রাত যাপন করতে পারলে পাহাড়, অরণ্য ও মাতামুহুরী নদীর সৌন্দর্য বেশি উপভোগ্য হবে। ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে আবাসিক হোটেল পাওয়া যাবে। লামা বাজারে এসে খেতে পারেন। মানসম্মত খাবার হোটেল হিসাবে লামা বাজারে কুটুমবাড়ি রেস্টুরেন্ট, নিউ মেহমান, আরামবাগ, পানবাজার গলিতে হোটেল আমিরাবাদ, নদীর ঘাটে হোটেল আল-বারাকা ও বাস টার্মিনালে ভাতঘর রয়েছে। যেখানে স্বল্প খরচে খেতে পারবেন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম