Logo
Logo
×
   

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

অধস্তনদের উদ্দেশে এডিসি আক্তারুল ইসলাম

বেতন-রেশন খাস না গুলি করবি না কেন

Advertisement

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আরও তিনজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। জবানবন্দিতে পুলিশের উপপরিদর্শক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, গত বছরের ৫ আগস্ট তিনি অন্যান্য পুলিশ সদস্যের সঙ্গে রাজধানীর চানখাঁরপুলে ডিউটিতে ছিলেন। ওই সময় বংশাল ও চকবাজার থেকে মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির অংশ হিসাবে আসা ছাত্র-জনতার একটি মিছিল শাহবাগের দিকে যেতে চাচ্ছিল। এ সময় রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. আক্তারুল ইসলামের নির্দেশে তাদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড, গ্যাসগান ও শটগানের গুলি ছোড়া হয়। আক্তারুল ইসলাম আমাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের যাদের কাছে পিস্তল ও চায়নিজ রাইফেল আছে তারা আন্দোলনকারীদের গুলি করে মেরে ফেল।’ তখন আমিসহ আরও কয়েকজন তার অবৈধ আদেশ পালন না করলে তিনি আমাদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন। আমাদের হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোরা সরকারের বেতন-রেশন খাস না? গুলি করবি না কেন? তোদের চাকরি খেয়ে নিব।’ তবুও আমি ফায়ার করা থেকে বিরত থাকি। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তাকে জেরার জন্য মঙ্গলবার (আজ) পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।

এদিন সাড়ে এগারোটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। মধ্যখানে এক ঘণ্টার বিরতি দেওয়া হয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে জেরা রেকর্ড করা হয়। ট্রাইব্যুনালের বাকি দুই সদস্য হলেন-বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এদিন আরও দুজন সাক্ষ্য দেন এবং এরা হলেন-চট্টগ্রাম কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ হাসান ও গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকার মো. সোহেল মাহমুদ (৪৫)। পরে তাদের দুজনকে জেরা করেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। এ নিয়ে এ মামলায় সোমবার পর্যন্ত ৩৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হলো। গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের পাঁচটি অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে আসামি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামাল পলাতক। সাবেক আইজিপি মামুন এই মামলায় দোষ স্বীকার করে নিয়ে ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) হয়েছেন। সোমবার তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এদিকে দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালে রংপুরে শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. রাজিবুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সাক্ষ্যে ডা. রাজিবুল ইসলাম বলেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কারণে আবু সাঈদের মৃত্যু হয়েছে-এমন রিপোর্ট দেওয়ায় তা গ্রহণ করা হয়নি। নানামুখী চাপ প্রয়োগ করে সেই রিপোর্ট মোট পাঁচবার বদলানো হয়। কিন্তু ময়নাতদন্তের প্রথম রিপোর্টটিই সঠিক ছিল। মঙ্গলবার (আজ) পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন র্ধায করেছেন ট্রাইব্যুনাল-২। এদিন একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলার পলাতক আসামি সুলতান আহমেদ (৭৫) আত্মসমর্পণ করলে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাগারে পাঠান। প্রসিকিউটর মিজানুল জানান, ২০২৩ সালের এই মামলাটিতে তিনি পলাতক ছিলেন। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানির জন্য রেখেছেন। জবানবন্দিতে আশরাফুল ইসলাম বলেন, সরবরাহ করা অতিরিক্ত গুলি ব্যবহার করতে কনস্টেবল মো. নাসিরুল ইসলামকে নির্দেশে দেন এডিসি আক্তারুল। আক্তারুলের দেখানো মতে, নাসিরুল রাস্তায় বসে চায়না রাইফেলে গুলি লোড করে এবং আন্দোলনকারীদের টার্গেট করে বারবার ফায়ার করতে থাকে। এ সময় এডিসি আক্তারুল ইসলাম এপিবিএন পুলিশের একজন কনস্টেবলের হাত থেকে চায়না রাইফেল কেড়ে নিয়ে এপিবিএন পুলিশের কনস্টেবল সুজন হোসেনের হাতে দেয়। যার হাত থেকে চায়না রাইফেল কেড়ে নেওয়া হয় সে গুলি করা থেকে বিরত ছিল। পরে জেনেছি তার নাম অজয়। এরপর কনস্টেবল সুজন হোসেন চানখাঁরপুল মোড়ে কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো শুয়ে, কখনো হাঁটু গেড়ে বসে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করতে থাকে। তাছাড়া এপিবিএনের সদস্য কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন তার নামে ইস্যুকৃত চায়না রাইফেল দিয়ে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করে। আমি দেখেছি গুলিতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে অন্য আন্দোলনকারীরা তাদের ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর এসি ইমরুল, ইন্সপেক্টর আরশাদ এপিবিএনের ৫-৭ জন সদস্য নিয়ে নাজিমুদ্দিন রোডের বিভিন্ন গলিতে ঢুকে গুলি করতে থাকে। আমরা চায়না রাইফেলের গুলির শব্দ শুনতে পাই। এরপর শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে শুনতে পাই। দুপুর আনুমানিক আড়াইটার দিকে চানখাঁরপুল এলাকার পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তখন এডিসি আক্তারুলের নির্দেশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে শাহবাগ থানার পেছন দিক দিয়ে থানায় প্রবেশ করি। এডিসি আক্তারুলের নির্দেশে নিজ নিজ নামে ইস্যুকৃত অস্ত্রগুলো শাহবাগ থানার অস্ত্রাগারে জমা দিই। আমার সঙ্গে আসা কনস্টেবল নাসিরুল ইসলাম তার নামে ইস্যু করা চায়না রাইফেলের ৪০ রাউন্ড গুলি জমা করে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি-তুমি চানখাঁরপুলে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করার পরও ৪০ রাউন্ড গুলি কীভাবে জমা করলে? উত্তরে সে জানায়, এডিসি আক্তারুল স্যার আমাকে অতিরিক্ত গুলি সরবরাহ করেছে। জবানবন্দিতে মোহাম্মদ হাসান নামের এক ব্যক্তি বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাই আমার বহদ্দারহাটের বাসা থেকে আমিসহ ১০ জন বন্ধু আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য মুরাদপুরে যাই। সেখানে বাস থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে যুবলীগ নেতা নুরুল আজিম রনির নেতৃত্বে যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, শৈবাল দাস সুমন, সাবেক মেয়র আ.জ.ম নাসিরসহ আরও অনেকে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকে। নুরুল আজিম রনির হাতে পিস্তল, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবরের হাতে শটগান ও অন্যদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। আন্দোলনকারীদের একটি গ্রুপ ষোল শহরের দিকে চলে যায়, আমরা কয়েকজন মোহাম্মদপুরের একটি গলিতে আটকা পড়ি। আমরা একটা বাসায় আশ্রয় নিই। তখন জানতে পারি যে, আন্দোলনকারী ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত মুরাদপুর এলাকায় আক্রমণকারীদের গুলিতে নিহত হয়েছে। ফয়সাল আহম্মেদ শান্ত আমার পূর্বপরিচিত। আমি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফয়সাল আহম্মেদ শান্তর লাশ দেখতে যাই। পুলিশ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ দেখতে না দিলে আমরা ফিরে আসি। ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম নতুন ব্রিজ এলাকায় আমিসহ ৫-৬ জন বন্ধু আন্দোলনে অংশগ্রহণ করি। সেখানে অবস্থান কর্মসূচি ছিল। সেখানে আমাদের আন্দোলন চলছিল। পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের সদস্যরা আমাদের লক্ষ্য করে শটগান দিয়ে গুলি করলে আমি পিঠে গুলিবিদ্ধ হই। আমার পিঠে সর্বমোট ১১টি গুলি লেগেছিল। পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসা নিই।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম