মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ
কেনাকাটা ও মজুরি পরিশোধে দুর্নীতি
Advertisement
হুমায়ুন কবির
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে কেনাকাটা ও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে ডিআইএ। এতে দেখা যায়, ৫ আগস্টের পর মাত্র দুই মাসে শ্রমিকদের পারিশ্রমিক ও মজুরি খাতে তিন কোটি ১৮ লাখ ৮৯ হাজার ৫৪ টাকা ব্যয় করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মালামাল বাবদ সরাসরি ১ কোটি ২৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকার কেনাকাটা করেছে। এসব ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) পুরোপুরি লঙ্ঘন করা হয়েছে।
সূত্রমতে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত (প্রায় দুই মাস) অবৈধ অ্যাডহক কমিটির নির্দেশে ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার উন্নয়ন কাজ করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর থেকে বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অ্যাডহক কমিটির সদস্য ও প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আখলাক আহম্মদের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিন তদন্ত করে ডিআইএ। চলতি বছর ১৮ মার্চ পর্যন্ত এই তদন্ত চালান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওয়াজকুরনী, অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব ও অডিটর মো. ওয়াহেদুল। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন। এই নির্দেশনা অমান্য করে আগের কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আখলাক আহম্মদ। অবৈধ অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে ২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে নিজে ও ৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। নির্দেশনার প্রায় ৩ মাস পর শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়ন কাজ করা হয় চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এগুলো হলো-১. মেসার্স শিলা এন্টারপ্রাইজ : রাজমিস্ত্রি, কাঠ ও স্যানিটারি (লেবার) বাবদ ব্যয় ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ২. বান্না এন্টারপ্রাইজ : রং করা (লেবার) বাবদ ১ কোটি ৩০ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ৩. তানভীর এন্টারপ্রাইজ : টাইলস, মোজাইক ও ইলেকট্রিক (লেবার) বাবদ ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। ৪. মোল্লা ওয়েল্ড : গ্রিল ও লেবার বাবদ ১২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। এছাড়া মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মালামাল বাবদ সরাসরি ১ কোটি ২৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকার নগদ কেনাকাটা করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পত্রিকায় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মালামাল সংগ্রহ না করে উপকমিটির মাধ্যমে ১ কোটি ২৩ লাখ ৭৪ হাজার ৪৩৭ টাকার মালামাল কেনা হয়। পিপিআর অনুযায়ী টেন্ডার ছাড়া সরাসরি নগদ কেনার ক্ষেত্রে অনধিক ২৫ হাজার টাকা, বছরে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকার মালামাল কেনা যাবে। কিন্তু আখলাক আহম্মদ দুই মাসে প্রায় সোয়া কোটি টাকার মালামাল সরাসরি নগদে কিনেছেন। এছাড়া উন্নয়ন কাজের মজুরির জন্য পত্রিকায় টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি। স্পট কোটেশনের মাধ্যমে কাজ করানো হয়েছে। পিপিআর অনুযায়ী ৬ লাখ টাকার বেশি মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতিযোগিতমূলক দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দিতে হবে। কিন্তু মজুরি বাবদ রাজ, কাঠ, স্যানিটারি খাতে ৬১ লাখ, রং করা খাতে ১ কোটি ৩০ লাখ, টাইলস, মোজাইক ও ইলেকট্রিক খাতে ১৩ লাখ, গ্রিল খাতে ১২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে স্পট কোটেশনের মাধ্যমে। মালামাল কেনা ও মজুরি বাবদ ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৮ হাজার ৪৯১ টাকার মধ্যে তদন্তের দিন পর্যন্ত ৩ কোটি ১২ লাখ ১৮ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। পরিশোধিত টাকার রাজস্ব খাতের ভ্যাট এবং আয়কর প্রদান করা হয়নি। ব্যয়িত টাকার মধ্যে ৩৯ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করে চালান কপি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করার নির্দেশ দিয়েছে ডিআইএ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে বিধিবহির্ভূতভাবে ৯ জনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বা শিফট ইনচার্জ পদে নিয়োগ দেওয়ারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ২৫ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন বন্ধ করে দেওয়া ও ১২ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা বিধিসম্মত হয়নি। এছাড়া ৮ জন শিক্ষককে বিধিবহির্ভূতভাবে পুনরায় চাকরিতে বহাল করা হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে ম্যাগাজিন বাবদ প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা নিয়ে ম্যাগাজিন বের না করারও প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত টিম। উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অফিস সহকারী একেএম ওয়াহেদুজ্জামান ওরফে ইকবাল ও আবদুর রাজ্জাককে আর্থিক অনিয়মের কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়। কিন্তু তাদের পুনরায় নিয়োগ করার প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ পরিদর্শন টিম।
এ বিষয়ে অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব যুগান্তরকে বলেন, দেশের অন্যতম স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের এই ধরনের অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না। আমরা তদন্ত করতে গিয়ে নানা দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছি। সেটি প্রতিবেদন আকারে জমা দিয়েছি। এসব অনিয়মের যথাযথ শাস্তি হওয়া উচিত।
মাধ্যমিক উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ ও প্রশাসনের পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত ডিজি বিএম আব্দুল হান্নান যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তদন্ত প্রতিবেদন আসার পর সেটি আমার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিই। প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে থাকে মন্ত্রণালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সহযোগিতা করব।
রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন অ্যাডহক কমিটি সভাপতি অধ্যাপক তাহমিনা আক্তার যুগান্তরকে বলেন, ডিআইএ রিপোর্ট যথাযথ হয়েছে। সেখানে অনেক অনিয়ম উঠে এসেছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত অর্থ আদায় করতে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। তবে আমরা সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
