Logo
Logo
×
   

Advertisement

দ্বিতীয় সংস্করণ

সশস্ত্র বাহিনীর বঞ্চিতদের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন

স্বজনদের ভিন্নমতই ‘কাল’ হলো ছয় কর্মকর্তার

Advertisement

Icon

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বজনদের ভিন্নমতই ‘কাল’ হলো ছয় কর্মকর্তার

Advertisement

চাকরি করেন সশস্ত্র (সেনা, নৌ, বিমান) বাহিনীতে। কিন্তু আত্মীয়স্বজন সরকারবিরোধী ভিন্নমতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ ধরনের ছয় কর্মকর্তাকে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অপবাদ দিয়ে এক বছর থেকে আট বছর পর্যন্ত গুম করে রাখা হয়। একজন অফিসারকে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। তার স্ত্রীকে এক বছরের শিশুসহ ছয় বছর কারাগারে রাখা হয়। অর্থাৎ স্বজনরা ভিন্নমতের হওয়ায় তাদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। লোমহর্ষক এ তথ্য উঠে এসেছে আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে সশস্ত্র বাহিনীর বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রোববার প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন কমিটির প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্মীয় রীতি পালনের কারণেও চার কর্মকর্তাকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়। ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রীর সামনে উচ্চস্বরে কথা বলে চাকরি হারান পাঁচ কর্মকর্তা। এ ধরনের ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন হিসাবে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে তিন বাহিনীর বঞ্চিত ১৪৫ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে চারজন সেনা কর্মকর্তার চাকরি ফিরে পাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ সময়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যা কল্পনা করেছিলাম তার চেয়ে ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতা নেওয়ার পর ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত ১৬ বছরে সেনা, নৌ এবং বিমানবাহিনীর চাকরিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বঞ্চিত ছিল। এরা বিভিন্নভাবে- বৈষম্য, বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার। গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসব কর্মকর্তা প্রতিকার চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আবেদন করেন। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয়জন অফিসারকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বিভিন্ন মেয়াদে এক থেকে আট বছর পর্যন্ত গুম করে রাখা হয়। তাদের অপরাধ ছিল-আত্মীয়স্বজন ভিন্নমতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। আত্মীয়স্বজনকেও দেওয়া হয় জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অপবাদ। দেশের ইতিহাসে যা নজিরবিহীন।

লেফটেন্যান্ট পদমর্যাদার চারজন অফিসারকে ধর্মীয় আচার-আচরণ অনুসরণের কারণে কোনো একটি দলের অনুসারী হিসাবে ট্যাগ দেওয়া হয়। এরপর তাদের জঙ্গি অপবাদ দিয়ে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আসেন। ওইদিন সামরিক বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দরবার (উন্মুক্ত আলোচনা) অনুষ্ঠিত হয়। ওই দরবারে কয়েকজন কর্মকর্তা নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় সরকারের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে কথা বলেন। এসব অফিসারকে প্রধানমন্ত্রীর দরবারে প্রশ্ন করার জন্য সেনা সদর থেকেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এক পর্যায়ে দরবারে ব্যাপক হৈচৈ ও হট্টগোল হয়। এতে তাদের মধ্যে পাঁচজনকে প্রথমে একটি ভুয়া মামলায় আসামি সাজিয়ে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। মামলাটি ছিল ‘ব্যারিস্টার তাপস হত্যা চেষ্টা’। এরপর তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়। রিপোর্টে আরও বলা হয়, ২০০৭ সালে ১/১১ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পাঁচজন অফিসার প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ে কর্মরত ছিলেন। পরে তাদের মিথ্যা অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।

তদন্ত কমিটির প্রধান আব্দুল হাফিজ জানান, আবেদনপত্র পর্যালোচনার জন্য গঠিত কমিটি গত ১৯ আগস্ট প্রথম সভা আহ্বান করে। এরপর বঞ্চিতদের ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আবেদন জমা দিতে বলা হয়। এ ক্ষেত্রে মোট ৭৩৩টি আবেদন জমা পড়েছে। এগুলো যাচাই বাছাই করে ১৪৫টি আবেদনের ব্যাপারে সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে সেনাবাহিনীতে বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার ১১৪ জন কর্মকর্তা, নৌবাহিনীতে ১৯ জন ও বিমানবাহিনীতে ১২ জন। এর মধ্যে চার সেনা কর্মকর্তাকে চাকরিতে বহালের সুপারিশ করেছে। তিন বাহিনীর বাকি সদস্যদের (যার যা প্রযোজ্য)-স্বাভাবিক অবসর, পদোন্নতি, অবসরপূর্ব পদোন্নতি, বকেয়া বেতন ও ভাতা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। আব্দুল হাফিজ আরও জানান, নিজ নিজ বাহিনী থেকে গঠিত বোর্ড যাদের বিষয়ে সুপারিশ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) কোনো নৈতিক স্খলনজনিত শাস্তি কিংবা অভিযোগের তথ্য মেলেনি। কমিটি নিজ নিজ বাহিনীর সুপারিশ আমলে নিয়েছে। এর বাইরেও প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আবেদনকারীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সুপারিশ করেছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিগত সরকারের আমলে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর অনেক সদস্য অন্যায়ভাবে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের মতো বঞ্চিত সামরিক বাহিনীর এসব সদস্যেরও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে সরকার।

তদন্ত কমিটির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, যেদিন আপনাদের এই কাজটির দায়িত্ব দিয়েছিলাম, তখন মনে হয়েছিল সামান্য কিছু অনিয়ম হয়তো হয়েছে। কিন্তু আপনারা যে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে এনেছেন তা রীতিমতো ভয়াবহ। এটা কল্পনার একেবারে বাইরে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন-মেজর জেনারেল (অব.) মুহম্মদ শামস-উল-হুদা, মেজর জেনারেল (অব.) শেখ পাশা হাবিব উদ্দিন, রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মোহাম্মদ শফিউল আজম ও এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মুহাম্মদ শাফকাত আলী।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম